ঢাকা | বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিপ্লব দ্বৈরথের রথে

author
শাহীন রাজা

প্রকাশিত : ২৪ জুন, ২০২৬ দুপুর ৩:২৩
ad003
বিপ্লব হবে। দেশে না কি আবারো বিপ্লব হবে। আগামীতে নতুন এক বিপ্লব করার পথে হাটছে, প্রধান বিরোধী দল। এ বিপ্লব কি শ্রমজীবী মানুষের জন্য। না, কি ধর্মীয় বিপ্লব। বিপ্লব আকাক্সক্ষীরা মুখে বললেও তা স্পষ্ট করেননি। তবে যারা  বিপ্লবের কথা বলছে, বিপ্লবও করতে চায়। আবার পার্লামেন্টে বসে, সব সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করার পক্ষে। এই সব অদ্ভুত এক দ্বিচারিতার মধ্যে বসবাস করছেন! তাহলে বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিপ্লবের কথা বলে, প্রতিবিপ্লবের প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছেন না তো?
  
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বিপ্লবকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। যা মূলত একাধিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই। রাষ্ট্র বিজ্ঞানী  টিলির মতে, বিদ্যমান সরকারের কর্মকাণ্ডে অনেক সময় কিছু সংকট দেখা দেয়। এটাকে পুজি করে ভিন্ন কোনো গোষ্ঠী ক্ষমতা দখলে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। এটা মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার প্রচেষ্টা। ভিন্নমতের রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিপ্লবের কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করা ছাড়া আর কিছুই না। 

আর বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতি বিপ্লব হচ্ছে, বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সংঘটিত একটি প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন। যখন কোনো বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেই শাসন ব্যবস্থার বিরোধিতাকারী দল বা জনগোষ্ঠী আবার ক্ষমতার জন্য লড়াই করে। এটাই প্রতি বিপ্লব। প্রতি বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য হলো পূর্বের শাসন ব্যবস্থা বা তার কোনো অংশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এটি সাধারণত রাজনৈতিক, সামরিক বা সামাজিকভাবে সংঘটিত হয় এবং সহিংসতাও ঘটতে পারে। প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য ফেরানোর কথা বলা হয়। কিন্তু দেখা গেছে, এই প্রচেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।। এই ধরনের আন্দোলন দেশের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে এবং সমাজকে বিভাজনের দিকে নিয়ে যায়।

গণতান্ত্রিক সমাজে বিপ্লব  এবং প্রতিবিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাবগুলো কখনো ইতিবাচক, আবার কখনো নেতিবাচক। বিপ্লবের মাধ্যমে অনেক সময় সমাজের অব্যবস্থাপনা বা অত্যাচারের অবসান ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্সে সামন্তবাদী শাসনের অবসান ঘটেছিল। এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা হয়। তবে বিপ্লবের ফলে অনেক সময় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সহিংস বিপ্লবের কারণে সমাজে বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক ধ্বংস এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। বিপ্লবের পর নতুন শাসন ব্যবস্থা স্থাপিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয় না। এতে মানুষের মধ্যে দেখা দেয় হতাশা।

অন্যদিকে, প্রতিবিপ্লব গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে প্রতিবিপ্লবী হয়ে ওঠে, তখন তা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। সমাজে বিভাজন, হিংসা এবং অনাস্থা সৃষ্টি হয়। প্রতি বিপ্লবের মাধ্যমে একদল ক্ষমতায় এসে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করতে পারে। যা দেশকে একনায়ক বা স্বৈরশাসনের দিকে ঠেলে দেয়া হয়।

সম্প্রতি কিছু রাজনৈতিক দল, যারা তাদের দলীয় সমাবেশে ১০ জন থেকে ১০ হাজার লোকের সমাবেশ ঘটাতে পারে না। অথচ তারাই আগামী বিপ্লবের জয়গান গেয়ে চলছেন। তারা আবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকে বিপ্লব  বলতে ভালোবাসেন। অভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লব যে নামেই বলি না কেন, ৫ আগস্ট উত্তর দেশে বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। দেশ ও জাতির ওপর দীর্ঘ সময় চেপে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে। যার মধ্যে অন্যতম, স্বৈরশাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে সাধারণ জনগণ ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছে। যার জন্য  দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণকে দীর্ঘদিন আন্দোলন করতে হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটা অবাধ এবং নিরপেক্ষ ইলেকশন অনুষ্ঠিত হয়। এই ইলেকশনে একদল নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে। আরেক দল পার্লামেন্টে বিরোধী দলের আসনে বসেছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এটাই হয়ে আসছে। কিন্তু ইলেকশনে বিরোধী দল হওয়ায় এখন বলছেন, আগামীতে আরেকটা বিপ্লব ঘটানো হবে। তাহলে কি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বিশ্বাস করেন না? 

সাধারণ জনগণ হিসেবে আমারও জিজ্ঞাসা, প্রেসিডেন্ট ভবনে অন্তর্র্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে আপনারা কেন গেলেন। স্বৈরাচারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের কাছে নেয়া শপথ অনুষ্ঠানে যাওয়া কি আপনাদের ঠিক হয়েছে। সেই শপথ অনুষ্ঠান, আপনারা বয়কট করলেন না কেন। ৫ আগস্ট উত্তর, আপনাদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা শহিদ মিনারে বিপ্লবী সরকার গঠনের ছিল। তা করলেন না কেন? স্বৈরাচারী সরকারের মনোনীত প্রেসিডেন্টের কাছে নেয়া শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। আবার জোটের কেউ, কেউ শপথও নিয়েছেন।  এখন ইওলকশনে বিরোধী দল হওয়ায়, আপনাদের আবার নতুন করে বিপ্লবের হুমকি দিচ্ছেন! 

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিপ্লব চরিত্র নেই। মুখে যে যা-ই বলুক না কেন, বড় দলগুলোর সবকয়টিই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনায় গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক চরিত্রগতভাবেই আপনার বিপ্লবী দল নয়। আপনাদের একটাই লক্ষ্য ক্ষমতা লাভ করা। এই ক্ষমতা লাভে একমাত্র সঠিক পথ হচ্ছে ইলেকশন। আগামী বিপ্লবের কথা না আগামীর ইলেকশনের প্রস্তুতি নিতে পারেন। জনগণ যদি আপনাদের পছন্দ করে, তাহলে অবশ্যই আপনারা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবেন। তবে একটা কথা মাথায় রাখা বাঞ্ছনীয়, ৫ আগস্ট পর আর বাকা পথে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। 

প্রধান বিরোধী দলের নেতাদের বিনয়ের সঙ্গে বলছি, আপনাদের রাজনীতিতে ৭১ একটা ফ্যাক্টর। এটা ওভারকাম করতে হলে, আপনাদের আরো বিনয়ী হতে হবে। এদেশের মানুষের মাথায় সব সময় এটা থাকবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দলের থেকে দেশকে বড় করে দেখে। ৭১ ফ্যাক্টর ওভারকাম করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই হুমকি-ধমকি না দিয়ে বিনয়ী হওয়ার চেষ্টা করুন। কিন্তু আপনাদের সেই পথে চলার ইচ্ছে নেই। যার স্পষ্ট উদাহরণ, গত ২৩ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে এক সাংবাদিককে মারধর। সাংবাদিক প্রশ্ন করা মাত্রই আপনাদের নেতা-কর্মীরা তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। 

৭১-এর কারণে আপনারা এমনিতেই রাজনৈতিকভাবে নেগেটিভ পর্যায়ে আছেন। তার ওপর সন্ত্রাসী আচরণ! মানুষ যদি ক্ষেপে যায় সামাল দিতে পারবেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিনয়ের কোনো বিকল্প নেই। বিপ্লব  বলেন আর সৎ লোক বা আইনের শাসনই বলেন। জনগণের মধ্যে আপনাদের প্রতি ইতিবাচক ভাবনা সৃষ্টি করতে হবে। নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোট ব্যাঙ্কের হিসাব নিয়ে বড় বিজয় সম্ভব নয়। 

এবারের ইলেকশনে অধিক সংখ্যক আসন লাভ দেখে আপনারা আগামীতে ক্ষমতা গ্রহণের প্ল্যান করছেন। আপনাদের ধারণা, অল্পের জন্য সরকারে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। গত অন্তর্র্বর্তী সরকারের অনেকেই আপনাদের ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিল। তারা চেষ্টা কম করেননি। এটা এদেশের মানুষ  জানে। তারপরও আপনারা বিজয়ী হতে পারেননি। এর অন্যতম কারণ, জনগণ আপনাদের সঙ্গে ছিল না। ডিপ-স্টেটের ভরসা মাথা থেকে ত্যাগ করেন। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ পরবর্তীতে বিশ্ব রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসছে। এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে যাচ্ছে। যা আপনাদের জন্য সুখকর হবে মনে হচ্ছে না। ফলে আগামীতে আপনাদের একলাই চলতে হবে। এই একলা চলা বড়ই কষ্টের। রাজনৈতিক সংকটে পড়ারও সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। গত ১৫ বছর বর্তমান সরকারি দল বিএনপি তা উপলব্ধি করেছে। বিএনপি ‘একাধিক মতাদর্শে’ ঐক্যবদ্ধ একটা জাতীয় রাজনৈতিক দল। এ কারণে সব ঝড়ঝাপটা ডিঙিয়ে আজ এ পর্যায়ে আসতে পেড়েছে। আপনারা কি সেই চাপ সামলাতে পারবেন? 

আর একটা বিষয় মাথায় রাখা আপনাদের জন্য জরুরি। পচাত্তর পরবর্তী রাজনীতির ইতিহাস হচ্ছে, শুরু থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিএনপি আপনাদের বন্ধুপ্রতিম রাজনৈতিক সংগঠন। এই বন্ধু বলয় থেকে বের হয়ে গেলে সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আপনারা। হয়তো আমার ধারণা ভুলও হতে পারে। আমার সাংবাদিকতা ও জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যা মনে হয়েছে, তা-ই বললাম। ভুল বললে, ক্ষমা প্রার্থী।

সরকারকেও মাথায় রাখতে হবে, সরকার পরিচালনায় জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সাধারণ জনগণের ভেতর একটা রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা থাকে। এর কোনো রাজনৈতিক নাম নেই। নাম হচ্ছে, আকাক্সক্ষা। যা সে ভেতরে পোষণ করে। এতে থাকে, কি ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা সে চায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোতে ইলেকশন হচ্ছে, বৃহৎ রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটানোর একমাত্র মাধ্যম। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই ইলেকশনে তারা, তাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলকে বেছে নেয়। এবারের ইলেকশনেও তাই হয়েছে। সুতরাং কোন দল কি বলল তার থেকে বেশি জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতি নজর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। 

এ প্রসঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, এক জন শাসকের নৈতিকতার চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা বেশি থাকতে হবে। রাষ্ট্রের অখণ্ডতায় শাসকের প্রধান কাজ হলো, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা। লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাকে যেকোনো কঠিন বা কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছপা হওয়া যাবে না। আরেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, জনকল্যাণ ও জবাবদিহিতা আধুনিক গণতন্ত্রে শাসকের মূল ভিত্তি হলো জনসমর্থন। এ ছাড়া ওয়েবার মনে করেন, যোগ্য শাসককে অবশ্যই আইনি বৈধতা ও জনগণের আস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। 

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার শেষ কথা হচ্ছে, জনগণই হচ্ছে সব ক্ষমতার উৎস। জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলে, বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের হুমকি কিছুই করতে পারবে না। আর যদি জনগণের আস্থা হারান, তাহলে কোনো শক্তিই কোনো কাজে আসবে না। 

শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT