ঢাকা | শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশু সুরক্ষা আইনি কাঠামো বাস্তবায়নে কক্সবাজারে মতবিনিময়

author
জাবেদ আবেদীন শাহীন, কক্সবাজার

প্রকাশিত : ২৪ জুন, ২০২৬ বিকেল ৫:৫২
ad003
বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, সাইবার বুলিং এবং শিক্ষার ম‚লধারা থেকে শিশু কিশোরদের বিচ্যুতির মতো বহুমাত্রিক সামাজিক অভিঘাত মোকাবিলায় আইনি কাঠামোর কার্যকর প্রযোগ সামাজিক প্রতিরোধ সুসংহতকরণ এবং জনসম্পৃক্ত সচেতনতার বিকাশকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক ব্যতিক্রমধর্মী বিশ্লেষণম‚লক কর্মশালা ও মতবিনিময় সভা।
           
বুধবার (২৪ জুন) সকাল ১১টায় কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদ মসজিদ সংলগ্ন সম্মেলন কক্ষে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উদ্যোগে এবং চাইল্ড সেইফটি নেট প্রজেক্ট, কক্সবাজারের আয়োজনে “আইনি কাঠামো বাস্তবায়ন সহায়তা বিশ্লেষণ কর্মশালা” অনুষ্ঠিত হয়। প্রান্তিক জনপদে জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিহতকরণ, ক্ষয়িষ্ণু শিশুশ্রম নির্ম‚লকরণ এবং সাইবার বুলিংয়ের করাল গ্রাস থেকে উদীয়মান কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনি বিধিমালা ও মাঠপর্যায়ের প্রায়োগিক দ‚রত্বের মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করাই ছিল এই প্রাতিষ্ঠানিক সমাবিষ্টের মূল অভীষ্ট।

উক্ত সভায় জেলা পর্যায়ের প্রাজ্ঞ সুশীল সমাজ, আইনবিদ, ক্ষুরধার গণমাধ্যমকর্মী, জিও-এনজিও প্রতিনিধি, ইউনিয়ন পরিষদের 'চাইল্ড ম্যারেজ প্রিভেনশন কমিটি'র সদস্যবৃন্দ এবং চাইল্ড ও ইয়ুথ ফোরামের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এক বহুমাত্রিক ও তাত্তি¡ক আলোচনার সূত্রপাত হয়।

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এক অনিবার্য মনস্তাত্তি¡ক রূপান্তর"অনুষ্ঠানের প্রারম্ভেই স্বাগত ভাষণে বিষয়ের অবতারণা এবং স‚চারু সঞ্চালনা করে ওয়ার্ল্ড ভিশনের মোবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেন্থেনিং অফিসার লুইজা মন্ডল বলেন, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই এখন কেবল আইনি কাঠামোর বিষয় নয় এটি একটি মানসিক বিপ্লবের নাম। তিনি আরো বলেন,  তরুণ প্রজন্মের সাহসী ও সচেতন অংশগ্রহণ সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী অনুঘটক হতে পারে। মনে রাখবেন, বাল্যবিবাহ শুধু কন্যাশিশুর জীবনকেই বিপন্ন করে না, ছেলেদের ওপরও অকাল মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপের নির্মম বোঝা চাপিয়ে দেয়। তাই শিশু সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতার দীপশিখা প্রজ্বলিত করতে হবে।

আইনি কঠোরতার প্রায়োগিক নিশ্চয়ন ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ মতবিনিময় সভায় শিশু অধিকার সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনি কাঠামোর জটিলতা ও তার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবিধান নিয়ে তাত্তি¡ক ও ব্যবহারিক আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ পেশ করেন বিশিষ্ট আইনবিদ অ্যাডভোকেট সাকীয়া কাওসার সাকী। তিনি শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, সাইবার স্পেসের অবক্ষয় এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতো সমকালীন সামাজিক ব্যাধিগুলোর আইনি প্রতিষেধক ব্যাখ্যা করেন। একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন এবং সুরক্ষিত সমাজ বিনির্মাণে আমাদের সংবিধানে এবং বিশেষ ফৌজদারি আইনে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেন। 

তিনি আরো বলেন,একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও সুরক্ষিত সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে বিদ্যমান আইনসম‚হের যথাযথ প্রয়োগ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিকাশ অপরিহার্য। শিশুদের অধিকার ক্ষুন্নকারী যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত ও কার্যকর করতে হবে।

বিশেষ অতিথি কক্সবাজার সদর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মো: ইউসুফ বলেন, পুলিশ প্রশাসন বাল্যবিয়ে ও সাইবার অপরাধ দমনে শ‚ন্য সহনশীলতা নীতিতে অটল। তবে সামাজিক স্তরে তথ্যের আদান-প্রদান গতিশীল না হলে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা দাপ্তরিকভাবে দ‚রূহ হয়ে পড়ে। 

সভার সমাপনী বক্তব্যে সভাপতির আসন থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশন কক্সবাজারের উপজেলা কোঅর্ডিনেটর জগন্ময় প্রজেস বিশ্বাস দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের রূপরেখা টেনে বলেন, আলোচনার টেবিলের প্রফুল্লতা তখনই সার্থক হবে যখন তা মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতায় দৃশ্যমান হবে।
 
শিশু অধিকার সংরক্ষণ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ কখনোই কাঙ্খিত ফল বয়ে আনতে পারে না। পরিবার, সমাজ, প্রশাসন এবং উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানসম‚হের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও শিশুবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এখন কেবল নৈতিক দায়বদ্ধতা নয়, এটি জাতীয় উন্নয়নেরও অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আলোকবর্তিকা সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রজ্বলিত করতে হবে।

চাইল্ড ফোরামের সদস্যরা তাদের বক্তব্যে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, আমরা এমন একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই, যেখানে কোনো শিশুর স্বপ্ন, শৈশব কিংবা সম্ভাবনা অকাল বিবাহের নির্মম বলি হবে না। শিশুদের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তাদের নিরাপদ বিকাশের অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
        
সভায় বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন, শিশু সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে কেবল আইনি কাঠামো প্রণয়ন যথেষ্ট নয় প্রয়োজন তার কার্যকর বাস্তবায়ন, সামাজিক প্রতিরোধ শক্তির বিকাশ এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। সম্মিলিত প্রয়াস, সামাজিক জাগরণ এবং মানবিক ম‚ল্যবোধের পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে নির্মিত হতে পারে বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও বাল্যবিবাহমুক্ত একটি আলোকিত বাংলাদেশ।
 
ওয়ার্ল্ড ভিশনের এই আইনি বিশ্লেষণ কর্মশালা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি স্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা স্বপ্রবৃত্ত হয়ে বা আগে বাড়িয়ে নিজ নিজ দায়বদ্ধতা স্বীকার করছেন, ততক্ষণ কাগজের আইনি প্রাবাল্য শিশুদের জন্য সম্প‚র্ণ নিরাপদ ও বৈষম্যহীন সমাজ উপহার দিতে পারবে না। তরুণদের এই কণ্ঠস্বরই হোক আগামীর পরিবর্তনের দিশারী।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT