ঢাকা | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলনায় ‘নীরব চাঁদাবাজি’র শিকার ১২৬ প্রাথমিক বিদ্যালয়

author
খুলনা ব‌্যু‌রো

প্রকাশিত : ২৭ জুন, ২০২৬ সকাল ১০:৫৬
ad003
দ্রুত জমা দিন। কারণ জুন ক্লোজিং। অন্যান্য ক্লাস্টার আজ জমা দিবে। সব ক্লাস্টারের একত্র করে আমাদের বিল-ভাউচার পাশ করাতে হবে। প্রতি বছর আমরা দিয়ে থাকি, এটা সবাই অবগত।”এভাবেই ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ম্যাসেজ পাঠিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে।

এ ম্যাসেজ দিচ্ছেন খুলনা নগরীর গগন বাবু রোডস্থ খানজাহান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত রায়।

প্রশান্ত রায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সোনাপোতা ক্লাস্টারের চাঁদাবাজির দায়িত্বে নিয়োজিত। তিনি যার বিকাশে টাকা পাঠাতে বলছেন, তিনি হলেন আব্দুল গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুজিবুর রহমান।

এভাবে কতিপয় শিক্ষক নেতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন খুলনা নগরীর ১২৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। পুরো থানা নিয়ন্ত্রণ করছেন নগরীর মহেশ্বরপাশা কেএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনিসুজ্জামান এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে আছেন মহেশ্বরপাশা বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এস কে জামান।

সাধারণ শিক্ষকরা শিকার হচ্ছেন এ নীরব চাঁদাবাজির। বছরের পর বছর ধরে মুখ বুজে তারা চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। চাঁদার ভাগ পৌঁছে যাচ্ছে কতিপয় শিক্ষক নেতা থেকে শুরু করে নগরীর ৭টি ক্লাস্টারের দায়িত্বে থেকে সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার (এটিইও) এবং থানা শিক্ষা অফিসারের (টিইও) পকেটে। সাধারণ শিক্ষকরা মুখ খোলার সাহস পর্যন্ত পাচ্ছেন না। 

চাঁদা আদায়কারীরা কর্মকর্তাদের ‘খাস লোক’ বনে যাচ্ছেন। যথাসময়ে তাদের শ্রেণিকক্ষে দেখা না গেলেও টিইও-এটিইওদের পিছনে ঘুরঘুর এবং নিয়মিত তাদের অফিসে যাতায়াতের অভিযোগ আছে এসব শিক্ষক নেতার বিরুদ্ধে।

ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষকদের অভিযোগ, খুলনা সদরে ১২৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে। এখন জুন ক্লোজিং, তাই চলছে বার্ষিক চাঁদাবাজি। এছাড়া, গোল্ডকাপ ফুটবল, আন্তঃবিদ্যালয় খেলাধুলা, বিদায় অনুষ্ঠান; এমনকি পাঠ্যবই পরিবহনসহ নানা অজুহাতে বছরজুড়েই চলে চাঁদাবাজি। 

এসবের নেপথ্যে আছেন সহকারী শিক্ষক সমিতির কিছু নেতা। মূলত, থানা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তার ম্যানেজ করতে এবং নিজেদের পকেট ভারী করতেই কিছু শিক্ষক চাঁদা আদায় করে যাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো খুলনা নগরীজুড়ে (প্রাথমিকের দলিলে সদর থানা) ৭টি ক্লাস্টার রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে— সোনাপোতা ক্লাস্টার, সোনাডাঙা ক্লাস্টার, বীনাপানি ক্লাস্টার, ফুলবাড়ী বিকে ক্লাস্টার, আব্দুল বারী ক্লাস্টার, স্যাটেলাইট টাউন ক্লাস্টার এবং দক্ষিণ টুটপাড়া ক্লাস্টার। 

এর মধ্যে সোনাপোতা ক্লাস্টারের দায়িত্বে আছেন এটিইও নজরুল ইসলাম, সোনাডাঙা ক্লাস্টারে রত্না দেবনাথ, দক্ষিণ টুটপাড়া ক্লাস্টারে শর্মিষ্ঠা মন্ডল, আব্দুল বারী ক্লাস্টারে আফরোজা সুলতানা, বীনাপানি ক্লাস্টারে কামরুন্নাহার, বিকে ক্লাস্টারে ফেরদৌসী আরা রেইনি। 

সোনাপোতা ক্লাস্টারে চাঁদা তোলার দায়িত্বে আছেন খানজাহান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত রায় এবং আব্দুল গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুজিবুর রহমান। এভাবে অন্যান্য ক্লাস্টারেও কয়েকজন শিক্ষক বীরদর্পে চাঁদাবাজি করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, থানা শিক্ষা অফিসে খেলাধুলার (গোল্ডকাপ) ঘাটতি এবং এজির (হিসাবরক্ষণ অফিস) ঘুষ বাবদ ১২৬টি বিদ্যালয়কে ৫০০ টাকা করে দিতে হয়। সে টাকা সোমবার (২২ জুন) আদায় করা হয়েছে। অথচ, একই খেলা বাবদ গত ৮ এপ্রিল ২০০ টাকা করে ১২৬টি স্কুল থেকে আদায় করা হয়। এর আগে ক্লাস্টার পর্যায়ে এ খেলার জন্য প্রথম দফায় চাঁদা নেওয়া হয় প্রতিটি স্কুল থেকে ৪০০ টাকা করে।

 যদিও এসব ইভেন্ট বাবদ প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থ বরাদ্দ থাকে। তবে, ছোট-খাটো বিষয়ে থানা শিক্ষা দপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে স্কুলগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া হলেও এসব অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রমাণ না রাখতে কোনো ধরনের চিঠি ইস্যু করা হয় না।

এ চাঁদা আদায়ের জন্য অন্যান্য ক্লাস্টারের মতো সোনাপোতা ক্লাস্টারে ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে দ্রুত চাঁদা জমা দেওয়ার তাগাদা দিয়ে শিক্ষকদের ম্যাসেজ দেন শিক্ষক প্রশান্ত রায়। একই গ্রুপে টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে অপর শিক্ষক মুজিবুর রহমান লেখেন, ‘এজি ও খেলাধুলা ঘাটতি বাবদ (৫০০/-) টাকা দিয়েছে। যেখানে খানজাহান আলী, বাংলাদেশ ব্যাংক, ডি-আলী, পূর্ব বানিয়া খামার, হ্যানে রেলওয়ে, প্রভাতী রেলওয়ে, রহিমা, বাগমারা, আব্দুল গণি, জাহানাবাদ, কয়লাঘাট, ভিক্টোরিয়া, নতুন বাজার, শিশু কল্যাণ, এপিসি, টুটপাড়া মডেলসহ এ ক্লাস্টারের অন্যান্য স্কুলগুলোর কাছ থেকে অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এসব স্কুলের টাকা তার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মুজিবুর।

শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুজিবুর রহমান প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “কোনো চাঁদা নেওয়া হচ্ছে না।

চাঁদাবাজির প্রমাণ আছে, জানালে মুজিবুর রহমান বলেন, “খেলার ঘাটতি এবং এজি অফিস বাবদ চাঁদা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, একটু ঝামেলা হওয়ার কারণে আর নেওয়া হচ্ছে না। ” 

কী ঝামেলা, জানতে চাইলে বলেন, “কেউ দেয়, কেউ দিতে চায় না। এসব কারণে নেওয়া হচ্ছে না।

চাঁদার পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, ‘প্রশান্ত স্যার জানে’।

আরো অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, খুলনা নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং নতুনবাজার স্কুলের প্রধান শিক্ষক অবসর গ্রহণ করেছেন। তাদের বিদায় অনুষ্ঠান করার জন্য এটিইও নজরুল ইসলাম কতিপয় শিক্ষক নেতার উস্কানিতে ক্লাস্টারের ১৬০ জনেরও বেশি শিক্ষকের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ৩০০ টাকা ধার্য করেন।

 এই অর্ধলক্ষ টাকা প্রতিটি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে তুলে এটিইওকে দিতে হবে বলা হয়। এজন্য গত ১১ মে নগরীর টুটপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি মিটিং করেও নির্দেশনা দেন।

গত ১৩ জুন আব্দুল গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১১টি বই আনা বাবদ ২০টি স্কুল থেকে ৪০ টাকা করে চাঁদা তোলেন এটিইও নজরুল। একই বই ৪ জুন থানা শিক্ষা অফিস থেকে আনতে ১০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। এভাবেই নানা অজুহাতে চাঁদা আদায় চলছে।

এই চাঁদাবাজি অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় দিন দিন চাঁদাবাজির হারও বেড়ে যাচ্ছে।

চাঁদা তোলার বিষয়টি যথারীতি সোনাপোতা ক্লাস্টারের এটিইও নজরুল ইসলামও অস্বীকার করেছেন। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেছেন, “ক্লাস্টারে খেলার জন্য ৪ হাজার টাকা করে বরাদ্দ ছিল। ওই টাকা দিয়ে খেলা সম্পন্ন করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে থানা শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও) মো. শাহজাহান বলেন, “এ বিষয়টি আমার জানা নেই। ” চাঁদাবাজির প্রমাণ আছে, জানালে বলেন, বিষয়টি তিনি দেখছেন।

এ বিষয়ে খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম বলেন, “জেলা অফিসে কোনো ঘুষ বা চাঁদার কারবার নেই। ফলে, অন্য কারো এ ধরনের অনৈতিক কাজ করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT