ঢাকা | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
খুলনার মানুষ এখন চরম নিরাপত্তাহীনতা

খুলনায় পাঁচ মাসে ৩৫ খুন, মুল পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকারীরা অধরা

author
মোঃ আ‌তিয়ার রহমান, খুলনা

প্রকাশিত : ২৯ জুন, ২০২৬ সকাল ৭:৫০
ad003
খুলনা নগরীর গল্লামারী এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে রফিকুল ইসলাম মানিক নামে এক ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী আহত হয়েছেন।গত রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে সোনাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ মো রফিকুল ইসলাম জানান, গল্লামারী এলাকার আইডিয়াল নার্সিংহোমের সামনে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে করে আসা একদল যুবক হঠাৎ রফিকুল ইসলাম মানিককে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।

 এতে একটি গুলি তার পেটে বিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

স্থানীয়রা আহত মানিককে দ্রুত উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

গুলির ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে হামলার কারণ এবং হামলাকারীদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
এ বিষয়ে সোনাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ মো রফিকুল ইসলাম জানান, এই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে সনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।              

আগে সন্ধ্যা হলেই আতঙ্ক বাড়তে থাকতো খুলনায়। খুলনায় ২৪ সালের  ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে সন্ধ্যা নামলেই ঘটতো খুনের ঘটনা। আতঙ্কের নগরী ও জেলার বাসিন্দারা থাকতেন শংকিত। কিন্তু ২৬ সালের গত পাঁচ মাসে এখন প্রকাশ্যদিবালোকে ঘটছে গুলি করে এবং  কুপিয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা।

 গত পাঁচ মাসে খুলনা জেলায় ৩৫ জনকে গুলি করে এবং  কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা নগরীতে ১৫ জনকে এবং  জেলার বিভিন্ন  উপজেলায় ২০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। অধিকাংশ খুনের ঘটনা ঘটেছে  মাদককান্ডে এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। শুধু নির্বাচন পরবর্তীতে খুলনা নগরীতেই ১০ টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। 

পুলিশ ও স্থানীয়দের সুত্রে জানাযায়, প্রায় প্রতি রাতেই খুলনা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ও নগরীর কোথাও না কোথাও সন্ত্রাসী হামলার খবর পাওয়া যায়। গুলি করে অথবা কুপিয়ে ফেলে যাওয়া হচ্ছে ছাত্র, রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ীকে। গত ৫ মাসে খুলনা নগরী ও জেলায় শতাধিক ছোটবড় সন্ত্রাসী হামলায় খুন হয়েছেন ৩৫ জন। সর্বশেষ খুলনা মহানগরীর লবনচরা থানার বটিয়াঘাটার কাজিপাড়া মাথাভাঙা এলাকায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম রফিক ওরফে ঢাকাইয়া রফিককে প্রকাশ্যদিবালোকে দুপুর সাড়ে ১২ টায় হেলমেট পরিহিত তিন অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেল যোগে এসে টার্গেট করে পেটে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়।

তার আগে খালিশপুর থানার নয়াবাটি এলাকায় তাতীদলের ওয়ার্ড সভাপতি ও মুদি দোকানদার সোনা মিয়াকে কুপিয়ে খুন করে প্রতিপক্ষের দুর্বৃত্তরা। এর আগে নগরীর দৌলতপুর থানার কেডিএ মার্কেটে ব্যবসা প্রতিষ্টানে থানা যুবদল নেতা রাশিদুল ইসলাম রাশুকে মটরসাইকেল যোগে এসে একদল ৪/৫ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী উপুর্যুপরি তিন/ চারটি গুলি করে হত্যা করে চলে যায়।

 তার আগে রোজার প্রায় শেষে ঈদের কয়েকদিন আগে নগরীর ডাকবাংলা এলাকায় সন্ধ্যায় রুপসা উপজেলা শ্রমিকদল নেতা মাসুম বিল্লাহকে  গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে খুলনার  চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। 

পুলিশ ও বিভিন্ন সুত্রে জানাগেছে, এর আগে দৌলতপুরের আরেক যুবদলের সাবেক নেতা মাহাবুবুর রহমান মাহাবুবকে তার নিজ বাড়ির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে ও গুলি করে নৃশংস্য ভাবে খুন করে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা।

 খুলনার বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা এই সকল হত্যাকান্ডের এখনো কোন সঠিক তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় হতাশ ও উদ্বিগ্ন রয়েছে বলে খুলনার একাধিক নেতাও কর্মীরা জানিয়েছেন। 

তবে তারা নাম প্রকাশ করতে অনিহা প্রকাশ করেন। তার আগে অর্ণব কুমার সরকার নামের খুলনাবিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এক শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এখন পর্যন্ত এ সকল  হত্যা গুলোর সঠিক কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ।

 তবে কেএমপি পুলিশ তিনটি সম্ভাব্য কারণকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।  তা হচ্ছে  মাদক বেচাকেনা ও ভাগবাটোয়ারা,  স্থানীয় আধিপত্য এবং  দলীয় কোন্দলের কারনে এ সকল হত্যাকান্ড গুলো ঘটছে বলে কেএমপির  মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার মো: আব্দুর রাজ্জাক জানান। 

কেএমপির এডিশনাল পুলিশ কমিশনার বলেন, খুলনা নগরীতে চার-পাঁচটি সন্ত্রাসী গ্রুপ এ সকল হত্যা ও সন্ত্রাসের সাথে জড়িত রয়েছে। 

তাদের অনেক সদস্যকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরন করা হয়েছে।  কিন্ত কিছুদিন পর আবারো তারা জামিনে বের হয়ে এসে আবারো জড়িয়ে পড়ছে অপরাধের সাথে।

 খুলনার এই সকল হত্যা মিশনে খুলনার তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় ভাবে অংশ নিচ্ছে। খুলনা জেলা পুলিশের  সহকারী পুলিশ সুপার আবির হোসেন শুভ জানান, অধিকাংশ হত্যার সাথে স্থানীয় ও পারিবারিক দন্দ, জমি-জমা সংক্রান্ত ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে। 

প্রায় সব গুলো হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের মধ্যে থেকে অধিকাংশ জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। 

খুলনার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হত্যাকান্ডের ঘটনায় স্থানীয়রা এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মোটরসাইকেলে আসা সন্ত্রাসীরা নিখুঁত ভাবে ও টার্গেটের ব্যাক্তিদের  লক্ষ্য করে গুলি করে এবং  কুপিয়ে হত্যা করে নির্বিঘ্নে চলে যায়।  পুলিশ এ সকল হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে প্রায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে কেএমপি বিভিন্ন থানার পুলিশ।

 তবে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত মুল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা এবং মুল হত্যাকারীরা রয়েগেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ নিয়ে খুলনার জনমানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

 কেএমপি পুলিশ এই পাঁচ মাসে দেশী-বিদেশী প্রায় ১৫ টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। কেএমপির মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী খুলনা মহানগরীতে খুন হয়েছে ১০ টি বলে পুলিশের অপরাধ শাখা থেকে জানাগেছে।

খুবি'র ছাত্র অর্ণব হত্যার আগের দিন কৃষকদল এক নেতার দুই চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টার ঘটনায় ঘটেছে। তার মাত্র ৯ ঘন্টা পর সেদিনই পৃথক তিনটি স্থানে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। নগরীতে ২১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মানিক হাওলাদার   নামে যুবদলের এক নেতাকে খুন করা হয়েছে। একই রাতে নগরীর বয়রা শ্মশানঘাট এলাকায় সজীব শিকদার নামে আরেক যুবককে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। 

একজনের আঙুল ও আর একজনের কবজি কেটে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। এছাড়াও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীনকে লক্ষ্য করে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য বলছে, গত পাঁচ মাসে খুলনা জেলা ও মহানগরীতে ৩৫ টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গুরুতর জখম হয়েছে প্রায় অর্ধ শত। প্রতিটি ঘটনার পেছনে মাদক কারবারি ও আধিপত্য বিস্তার ও দলীয় কোন্দল এর ঘটনায় এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

 তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জেলা পুলিশ ও কেএমপি জানান,গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ে। এ সুযোগে পুরোনো সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিরা এলাকায় ফিরে এসেছে। অনেকে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছে।

 এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে তারা সংঘাতে জড়াচ্ছে। বেশিরভাগ থানায় পুলিশের নতুন কর্মকর্তা যোগ দিয়েছেন। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের চিনতে তাদের সময় লাগছে।

এর মধ্যে খুলনা মহানগরীর সদর থানায় ৩টি হত্যাকান্ড, সোনাডাঙ্গা থানায় ১ টি, লবনচরা থানায় ৩ টি, হরিনটানা থানায় ১ টি, খালিশপুর থানায় ২ টি, দৌলতপুর থানায় ৩টি, খানজাহান আলী থানায় ১ টি, আড়ংঘাটা থানায় ১ টি হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। ৮ টি হত্যাকাণ্ড গুলি করে, পারিবারিক কলহে ৪ টি ও আধিপত্য কারনে কুপিয়ে ৩টি হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে।  এর মধ্যে ১৩টি হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন হয়েছে বলে কেএমপি সুত্রে জানাগেছে।

 ১২ টি মামলা কেএমপিতে, পিবিআইতে ১ টি ও নৌপুলিশের নিকট ১ মামলা তদন্ততাধীন রয়েছে বলে কেএমপির অপরাধ শাখার সুত্রে জানাগেছে। 

এদিকে খুলনা জেলার রুপসা থানায় ৭ টি, দিঘলিয়ায় ৩ টি, ফুলতলায় ১ টি, তেরোখাদায় ২ টি, ডুমুরিয়ায় ২ টি, বটিয়াঘাটায় ১টি, পাইকগাছায় ২ টি, কয়রায় ৩ টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।  তার মধ্যে গুলি করে ৩ টি, কুপিয়ে ৬ টি, মাদককান্ডে ১ টি শ্বাসরোধ করে ২ টি, পারিবারিক কলহে ৪ টি, আধিপত্য বিস্তারে ২ টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।  

এর মধ্যে  ১৫ টির রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে বলে জেলা পুলিশ সুত্রে দাবি করা হয়েছে। ১৬ টি জেলা পুলিশের কাছে, ১ টি সিআইডিতে ও ৩ টি মামলা পিবিআইতে তদন্ততাধীন রয়েছে। 

খুলনার নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এতে অস্ত্রের মহড়া ও হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। খুলনার ৮ থানা এলাকায় মাদকের চরম বিস্তার লাভ করেছে। এখন তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। 

মাদক কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এক কথায় খুলনা এখন মাদকে ভাসছে বলে এই নাগরিক নেতা দাবি করেন। তিনি বলেন খুলনাজুড়ে এখন সকল শ্রেনী-পেশার মানুষ রয়েছে চরম আতংকে। শিঘ্রই খুলনাবাসী এ থেকে  পরিত্রানের দাবি জানান।

খুলনা মহানগর পুলিশের কমিশনার জাহিদুর রহমান  বলেন, ১২ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা তৈরি করে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে চারজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

তিনি বলেন গত ২৫ সালে নগরীতে ৩৭ হত্যাকান্ড ঘটেছে।  চলতি বছরের পাঁচ মাসে ১৫ টি হত্যার বেশিরভাগই মাদককান্ডে এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। এছাড়াও নদীতে ভাসমান লাশও রয়েছে। সব মিলিয়ে নগরীর আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে পুলিশের কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে। 

ইতিমধ্যে নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রভাবশালী কয়েকজনকে আটককরা হয়েছে। বাকিদের আটকের চেষ্টা চলছে। 

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার তাজুল ইসলাম জানান জেলার বিভিন্ন থানা এলাকায় যে ২০ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে তা তার যোগদানের পূর্বে। তবে এর অধিকাংশই ডিটেক্ট (সনাক্ত) করা হয়েছে। অধিকাংশ হত্যাকান্ডই মাদককান্ডে, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক। যার বেশির ভাগই গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরন করা হয়েছে। কিছু ঘটনার তদন্ত চলছে।

শিগগিরই বাকিদের আটকের জন্য পুলিশের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। 
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT