বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে এক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল, রাষ্ট্র সংস্কারের বিতর্ক, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠনের প্রশ্ন এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। এই প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ঘোষণা নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঘোষণা কতটুকু বাস্তব রাজনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে, আর কতটুকু রাজনৈতিক স্ট্যান্ট?
একসময় বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি ছিলেন শেখ হাসিনা। টানা প্রায় দেড় দশক রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পর তাঁর সরকার এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছিল, যেখানে কার্যকর বিরোধী রাজনীতি প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন। সংসদ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলোকে কেন্দ্র করে গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গভীর বিতর্ক তৈরি হয়।
আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে আওয়ামী লীগ একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেই দল এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। দলের বহু শীর্ষ নেতা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়, অনেকে আইনি জটিলতায় জড়িত, আবার অনেকে দেশ ছেড়েছেন। মাঠপর্যায়ে সংগঠনও আগের অবস্থানে নেই। ফলে শেখ হাসিনার ফিরে আসার ঘোষণাকে কেবল ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে ভেঙে পড়া একটি শিবিরকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে উজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনার সামনে এখন সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক নয়, আইনি। তাঁর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কিত একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা আদালত নির্ধারণ করবে। কিন্তু মামলাগুলোর অস্তিত্বই তাঁর প্রত্যাবর্তনের পথকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। দেশে ফিরলেই তাঁকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে—এমন সম্ভাবনা প্রবল।
আরও বড় প্রশ্ন হলো জনমত। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে যে কোনো শাসকের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই জনঅসন্তোষ তৈরি হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গভীর। তাঁর শাসনামলের শেষ দিকে গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গুম, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রশক্তির ব্যবহার নিয়ে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো এখনো জনআলোচনার অংশ। বহু মানুষের কাছে তাঁর শাসনামল উন্নয়নের পাশাপাশি ভয়ের রাজনীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
এ কারণেই দেশে ফিরে আসার ঘোষণা দিলেই জনগণ তাঁকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করবে—এমন ধারণার পক্ষে দৃশ্যমান বাস্তবতা খুব শক্তিশালী নয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের একটি বড় অংশ অতীতের রাজনৈতিক আবেগের চেয়ে জবাবদিহি, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে এটাও সত্য যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এখনও একটি বড় নাম। তাঁর সমর্থকগোষ্ঠী পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। আওয়ামী লীগের একটি অংশ এখনও বিশ্বাস করে, দলকে পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দলীয় কর্মীদের কাছে আশা ও প্রতিরোধের বার্তা হিসেবেও কাজ করতে পারে।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় আবেগের চেয়ে কঠিন। একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, জনমতের পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে শেখ হাসিনার সামনে যে বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে, তা তাঁর ক্ষমতায় থাকার সময়কার বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
ফলে এই মুহূর্তে তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণাকে অনেক বিশ্লেষক রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকার কৌশল হিসেবেই দেখছেন। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে ক্ষমতাচ্যুত নেতারা প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিয়ে নিজেদের সমর্থকদের সংগঠিত রাখার চেষ্টা করেছেন। শেখ হাসিনার ঘোষণার মধ্যেও সেই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই মূল প্রশ্ন শেখ হাসিনা ফিরবেন কি না, সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, তিনি ফিরে এলে দেশের জনগণ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিচারব্যবস্থা তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করবে। কারণ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শেষ কথা কোনো ব্যক্তি বলেন না; শেষ কথা বলে জনগণ এবং ইতিহাস।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা তাই নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় এটি যতটা রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার প্রচেষ্টা বলেই মনে হয়। ভবিষ্যৎই বলে দেবে এটি সত্যিকারের প্রত্যাবর্তনের সূচনা, নাকি ইতিহাসের প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেওয়া আরেকটি রাজনৈতিক ঘোষণা।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে আওয়ামী লীগ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাস ও একটি নির্দিষ্ট নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এক বিষয় নয়। বিশ্বের বহু দেশে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কোনো নেতা বা শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর দলটি টিকে থাকলেও নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে—আওয়ামী লীগ কি শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই পুনর্গঠিত হবে, নাকি দলটি নতুন নেতৃত্ব ও নতুন রাজনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে নিজেকে পুনর্নির্মাণ করবে?
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার মধ্যে সেই প্রশ্নেরও একটি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। তিনি যেন বোঝাতে চেয়েছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এখনও তিনিই শেষ কথা। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে যে নেতারা রাষ্ট্র ও দলের মধ্যে পার্থক্য মুছে ফেলেন, ক্ষমতা হারানোর পর তাদের রাজনৈতিক পুনরুত্থান সাধারণত সহজ হয় না। কারণ তখন কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নয়, নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডেরও জবাব দিতে হয়।
বাংলাদেশে গত দেড় দশকে যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার বিরুদ্ধে জনমনে একটি প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিরোধী মতকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা, সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানো, প্রশাসনিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত করার অভিযোগগুলো শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতার অংশ নয়; এগুলো এখন গবেষণা, গণমাধ্যম বিশ্লেষণ এবং জনআলোচনার বিষয়। ফলে শেখ হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফিরতে চান এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে চান, তাহলে তাঁকে শুধু আইনি প্রশ্নের নয়, রাজনৈতিক জবাবদিহিরও মুখোমুখি হতে হবে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো প্রজন্মগত পরিবর্তন। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার এমন একটি সময়ে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়েছে, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন শেখ হাসিনা। তাদের একটি বড় অংশের কাছে আওয়ামী লীগের অতীতের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যের চেয়ে সাম্প্রতিক শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বেশি প্রাসঙ্গিক। এ ছাড়াও দেশে ঘটে যাওয়া ৫ আগষ্টের রক্তাক্ত স্মৃতি এখনও জনমনে তাজা। ফলে রাজনৈতিক বৈধতা পুনরুদ্ধার করতে হলে অতীতের অর্জনের পাশাপাশি সাম্প্রতিক ব্যর্থতা ও বিতর্ক নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
শেখ হাসিনার সমর্থকেরা প্রায়ই উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার কথা বলেন। নিঃসন্দেহে এসব বিষয় তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে উন্নয়ন কখনো গণতন্ত্র, জবাবদিহি এবং মানবাধিকারের বিকল্প হতে পারে না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সাফল্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার।
সেখানেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সংকট সবচেয়ে গভীর। কারণ তাঁর সমালোচকেরা মনে করেন, উন্নয়নের ভাষ্যের আড়ালে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যদি জনগণের একটি বড় অংশ সত্যিই এমনটি বিশ্বাস করে, তাহলে কেবল দেশে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়ে সেই আস্থার সংকট দূর করা সম্ভব নয়।
রাজনীতিতে প্রতীকী ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ফিরে আসার ঘোষণা একটি সংবাদ হতে পারে, কিন্তু জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়া একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার প্রথম শর্ত হলো সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস এবং জবাবদিহি গ্রহণের মানসিকতা। শেখ হাসিনা সেই পথ বেছে নেবেন, নাকি অতীতের রাজনৈতিক অবস্থানেই অনড় থাকবেন—সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাজনীতির দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। জনগণ এখন শুধু নেতা নয়, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন নির্বাচন, জবাবদিহিমূলক সরকার এবং আইনের সমান প্রয়োগ দেখতে চায়। এই বাস্তবতায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা যতটা না ভবিষ্যতের রাজনীতির রূপরেখা, তার চেয়ে বেশি অতীতের একটি অধ্যায়কে পুনরায় আলোচনায় নিয়ে আসার চেষ্টা বলেই প্রতীয়মান হয়।
ইতিহাসের বিচারে কোনো নেতার প্রকৃত শক্তি ক্ষমতায় থাকার সময় নয়, ক্ষমতা হারানোর পর জনগণের স্মৃতিতে তাঁর অবস্থান দ্বারা নির্ধারিত হয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেই বিচার এখন শুরু হয়েছে। তিনি দেশে ফিরবেন কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের জনগণ কি তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে পুনরায় গ্রহণ করতে প্রস্তুত? বর্তমান বাস্তবতায় সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব