ঢাকা | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুস্তাফা মনোয়ার : শিশুর বন্ধু, শিল্পের বন্ধু

author
ফারহানা তানিয়া

প্রকাশিত : ৩০ জুন, ২০২৬ দুপুর ২:০৬
ad003
দেশের খ্যাতিমান শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার শুধু এক জন চিত্রশিল্পী বা পাপেট শিল্পের পথিকৃৎই নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। শিশুদের জন্য তার কাজ, শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌছে দিয়েছে। চিত্রশিল্পে তার স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণা, বাংলাদেশে নতুন শিল্প আঙ্গিক পাপেটের বিকাশ, টেলিভিশন নাটকে অতুলনীয় কৃতিত্ব প্রদর্শন, শিল্পকলার উদার ও মহৎ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে মেলে ধরা, দ্বিতীয় সাফ গেমসের মিশুক নির্মাণ এবং কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পেছনের লাল রঙের সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনাসহ শিল্পের বিভিন্ন পরিকল্পনায় তিনি তার সৃজনী ও উদ্ভাবনী প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।

শৈশব
মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা (তৎকালীন যশোর জেলা) শ্রীপুর থানার অন্তর্গত নাকোল গ্রামে নানির বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তার বাবা প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা এবং মায়ের নাম জমিলা খাতুন। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সবার ছোট। ১৯৬৫ সালে তিনি চট্টগ্রামের মেয়ে মেরীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলে সাদাত মনোয়ার বাংলাদেশ বিমানের পাইলট, আর মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার চাকরিজীবী। একমাত্র বাংলাদেশি অস্কারজয়ী এনিমেটর নাফিস বিন জাফর (আমেরিকা প্রবাসী) তার বোনের নাতি।

মুস্তাফা মনোয়ারের শিশুকাল কেটেছে কলকাতায়। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাটৃক পাস করেন। এরপর আবার কলকাতায় গিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে তিনি পড়াশোনা শেষ না করে কলকাতা চারু ও কারুকলা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে এখান থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন তিনি।

মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতিভা সম্পর্কে তার শিশুকাল থেকেই অনেকে অবহিত  ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাদ্যযন্ত্রের প্রতি তার আগ্রহ দেখে পিতা গোলাম মোস্তফা পুলকিত হতেন। বাবা রেকর্ড বাজালেই শিশু ম্স্তুাফা মনোয়ার যেখানেই থাকুক ছুটে চলে আসতেন। আগ্রহ নিয়ে বাজনা শুনতেন। গোলাম মোস্তফা একবার তাকে নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং গানের প্রতি তার সন্তানের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। রীতিমতো ওস্তাদ রেখে মুস্তাফা মনোয়ারকে গান শেখানো হয়েছিল। কলেজে এক গান প্রতিযোগিতায় প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী বশির আহমেদের সঙ্গে আধুনিক গানে যৌথভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কর্মজীবনে ব্যস্ত হয়ে পরায় সেভাবে আর গানের চর্চা করেননি। 


কর্মজীবন
রঙ, রেখা আর সুরের জাদুকর মুস্তাফা মনোয়ার। বিটিভির সেই সোনালি দিনগুলোতে ‘মনের কথা’ নামক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যিনি আমাদের উপহার দিয়েছিলেন এক মায়াবি জগৎ। পারুল, বাউল,  চেনা ষাড়, দাদু ভাই বা শিল্পী ভাই এরা শুধু পাপেট না, ছিল আমাদের অন্তরের মানুষ। তার পাপেট শো জুড়ে থাকত আমাদের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি। মুস্তাফা মনোয়ারের প্ল্যানে শিশুদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে এটা নিয়মিত প্রচারের নির্দেশ দিয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট শহিদ জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের আগ্রহের বিটিভি থেকে প্রতি বছর সারা দেশের ক্ষুদে প্রতিভাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের শিল্পী তৈরি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এখানে তিনটি বয়সসীমার ছেলে-মেয়ের মধ্যে গান (রবীন্দ্র, নজরুল, আধুনিক, পল্লী), আবৃত্তি, নাচ, অভিনয় শাখায় পুরস্কার প্রদান করা হতো। সার্কভুক্ত দেশের টেলিভিশনের জন্য নির্মিত শিশুদের শিক্ষামূলক ‘মিনা কার্টুন’ এর অন্যতম পরিকল্পক ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

মুস্তাফা মনোয়ার প্রভাষক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আর্টস কলেজে কর্ম জীবন শুরু করেন। শিক্ষকতা ছেড়ে পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আশির দশকে সার্ক সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত স্পোর্টস টুর্নামেন্টে মটো নির্বাচন করেন মুস্তাফা মনোয়ার। এই মটোর নামকরণ করা হয় ‘মিশুক’। আমাদের সুন্দরবনের হরিণ শাবককে মিশুক হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং এর ভাস্কর্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় স্থাপন করা হয়েছিল। 


ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ
অনেকেই জানেন না, ভাষা আন্দোলনের সময় মুস্তাফা মনোয়ার জেলে গিয়েছিলেন। সেসময় তিনি নারায়ণগঞ্জে ক্লাস নাইনে পড়তেন। ভাষার জন্য ঢাকায় গুলি হয়েছে, মানুষ শহিদ হয়েছে- এই প্রেক্ষাপটে তিনি বন্ধুদের নিয়ে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে গ্রাফিটি একেছিলেন। এ অপরাধে পুলিশ তাকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সেসময়ের প্রখ্যাত কবি হিসেবে পরিচিত তার বাবা কবি গোলাম মোস্তফা তেমন কোনো ভূমিকা রাখেননি। কিন্তু পিতার কিশোর সন্তান ঠিকই ভাষার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। এ থেকে বোঝা যায়, তার রাজনৈতিক সচেতনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাড়ানোর স্পৃহা। এ থেকে আমাদের চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কথা মনে হয়। এ আন্দোলনেও বহু আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে পুলিশের গুলির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। 

একাত্তরেও পরিণত বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছিলেন। আমার শ্বশুর কবি ফজল এ খোদার সঙ্গে মুস্তাফা মনোয়ারের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমার শ্বশুর উনাকে মন্টু ভাই (মুস্তাফা মনোয়ারের ডাকনাম মন্টু) বলে ডাকতেন। আমার শ্বশুরের কাছে মুস্তাফা মনোয়ারের কথা অনেক শুনেছি। উনি সহজে কারো বইয়ের প্রচ্ছদ করতেন না। তবে আমার শ্বশুরের একটি কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ উনি করেছিলেন। বইটির নাম ‘মন্দিরা’। আমার শ্বশুরের লেখা গান ‘সংগ্রাম, সংগ্রাম, সংগ্রাম, চলবে দিন রাত অবিরাম’ গানটি ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে ঢাকা টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। এই গানটি সুর করেছিলেন আজাদ রহমান। তবে সে সময় টেলিভিশন থেকে প্রচারিত এই গানটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল মুস্তাফা মনোয়ারে পরিচালনার জন্য। শহিদ জননী জাহানারা ইমাম তার রচিত ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে এ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন এভাবে-
‘১৮ মার্চ ১৯৭১ বৃহস্পতিবার 
ঢাকা টেলিভিশন স্বাধিকার আন্দোলনকে তুঙ্গে তুলে দিয়েছে তার অভিনব গানের অনুষ্ঠান দিয়ে। এমন অনুষ্ঠান দেখি নাই কভু। ঢাকার যত প্রথম সারির নামকরা সংগীত শিল্পী- ফেরদৌসী রহমান, সাবিনা ইয়াসমিন, শাহনাজ বেগম, আঞ্জুমান আরা বেগম, সৈয়দ আবদুল হাদী, খোন্দকার ফারুক আহমদ, রথীন্দ্রনাথ রায় এবং আরো অনেকে মিলে যখন গাইতে থাকেন- ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম। চলবেই দিনরাত অবিরাম’- আর তাদের কয়েকটা চেহারা হাজার চেহারা হয়ে যায়; তখন মনে হয় বুকের মধ্যে, ঘরের মধ্যে ঝড় উঠে গেছে, সে ঝড়ের মাতামাতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
মাসুমাকে জিজ্ঞেস করি ‘কি করে এমন অবাক কাণ্ড সম্ভব হলো? কে করেছে?’
মাসুমা বলে, ‘এসব মন্টু মামার কীর্তি।’
মন্টু অর্থাৎ মোস্তফা মনোয়ারকে ধরলাম এক দিন, ‘মন্টু বল না, কি কায়দায় শিল্পীদের একটা মাথা হাজার মাথা হয়ে যায়? দু’তিন সার দাড়ানো মানুষ হাজার মানুষ হয়ে যায়?’
মুস্তাফা মনোয়ার তার স্বভাবসিদ্ধ বিনীত লাজুক হাসি হেসে মাথা চুলকে বলল, ‘এই আর কি। যন্ত্রপাতি বিশেষ নেই তো আমাদের। এই আয়না-টায়না দিয়ে অনেক কসরত করে- এই আর কি।’
মন্টুটা এই রকমই। নিজের কোনো কৃতিত্বের কথা নিজের মুখে বলতে হলে এই রকমই তো তো করে!
মন্টুর কীর্তি এ রকম অভিনব পদ্ধতিতে আরো কয়েকটা গানের টিভি চিত্রায়ন- ‘আমার ঘরে আগুন জ্বেলেছে, শান্তি নিয়েছে কেড়ে,’ ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে আমায় বল।’ এসব গান টিভিতে যত দেখানো হয়, ঢাকার ঘরের ভেতরে সোফায় বসে থাকা শান্ত, নিরীহ মানুষের বুকেও তত ঝড়ের দোলা লাগে, বাইরে পথে-প্রান্তরে-বন্দরে-জংশনে যারা রক্তাক্ত সংঘর্ষে নেমেছে, তাদের মাঝে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছা করে।’
এ প্রসঙ্গে পরবর্তীতে সুরকার আজাদ রহমান বলেছিলেন যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর ক্রাকডাউনের পর ঢাকার টেলিভিশন সেন্টার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তারা সে সময়ের কয়েক জন বাঙালি টিভি কর্মকর্তার সহায়তায় উল্লেখিত গানের প্রোগ্রামের সঙ্গে জড়িতদের ঠিকানা জোগাড় করেছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পরই কবি ফজল-এ-খোদা এবং চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। তারা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কবি ফজল-এ-খোদার লেখা ‘সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে’ গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বহুল প্রচারিত একটি দেশাত্ববোধন গান। মুস্তাফা মনোয়ার সে সময় কলকাতার সীমান্তে শরণার্থী শিবিরে ঘুরে ছবি তুলতেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতেন। তবে আজাদ রহমানকে পাকিস্তানি বাহিনী ধরতে সক্ষম হয়েছিল। আজাদ রহমান ভালো উর্দু বলতে পারতেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছিলেন যে, তিনি এক জন সাচ্চা পাকিস্তানি। তিনি বাংলাও বলতে পারেন না। টিভির নিজস্ব বেতনভুক্ত সুরকার হিসেবে তিনি শুধু ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম’ গানটিতে সুর দিয়েছেন। এই গানের কথার অর্থ তিনি ভালো বোঝেননি। এভাবেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন বলে আজাদ রহমান স্মৃতিচারণ করেছেন।

মুস্তাফা মনোয়ার এ ধরনের কাজ ভালো পারতেন। একবার ঢাকায় ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভারতীয় শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক সংগীত আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে মঞ্চসজ্জার দায়িত্ব পালন করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় গান শুরুর আগে দর্শকদের উদ্দেশে বলেছিলেন যে, ‘মুস্তাফা মনোয়ার ভাই তো দেখি আমার পেছনে গুরুদেবকে (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) দাড় করিয়ে দিয়েছেন।’ 

মুস্তাফা মনোয়ারের পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। কুষ্টিয়ার কাছে  ঝিনাইদহ। আমার আব্বার কাছে শুনেছিলাম বহুদিন আগে আব্বা তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। আব্বা এক সময় শিক্ষা অফিসার হিসেবে ঝিনাইদহে চাকরি করতেন। মুস্তাফা মনোয়ারের মেজ ভাই মুস্তাফা আজিজও খুব ভালো ছবি আকতেন। শিল্পীসত্তা ছিল তাদের রক্তে প্রবাহিত জানা যায়, প্রখ্যাত সাহিত্যিক  সৈয়দ মুজতবা আলীর পরামর্শে তিনি কলকাতা সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। মুস্তাফা মনোয়ার তখন সায়েন্সে পড়েন। সৈয়দ মুজতবা আলী তার ছবি আকার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাদের পরিবারকে এই ছেলেকে আর্ট কলেজে ভর্তি করাতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।


পাপেটের প্রতি বিশেষ আগ্রহ
মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পাস করার পর ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়ার পর থেকে পাপেট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, গ্রাম বাংলার পুতুল নাচ ছোট বেলাতেই তাকে আকৃষ্ট করেছিল। বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনী সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের তিনিই মূল ও প্রথম উদ্যোক্তা। কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম ইনডিয়ার বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেছিলেন। পাপেট নিয়ে বহু দেশ সফর করেছেন তিনি। প্রথমবার তিনি তার নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল নিয়ে মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। মুস্তাফা মনোয়ার তার সফল শিল্পকর্মের মধ্যে বাংলাদেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে গেথে দিতে পারদর্শী ছিলেন। যে কারণে তার পাপেটের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয় পারুল। ‘পারুল’ নামটির সঙ্গে সঙ্গে সেই সাত ভাই লোককথার কথা মনে পড়ে যায়। পারুল বোনই তো এক দিন সাত ভাইকে জাগিয়েছিল। বাংলাদেশে আবার নবজাগরণের ঘটনাটা সম্ভবত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সেই পারুল বোনটির মাধ্যমেই ঘটাতে চেয়েছিলেন। কেননা, তিনি সব সময় তার পাপেটকে আনন্দময় শিক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলতেন।  
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৫৭ সালে কলকাতার একাডেমি অফ ফাইন আর্টস আয়োজিত নিখিল ভারত চারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় শ্রেষ্ঠ কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। এটি ছিল তার প্রথম পুরস্কার। ১৯৫৮ সালে কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে চারুকলা প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ও জলরঙ শাখার শ্রেষ্ঠ কর্মের জন্য স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৯০ সালে টিভি নাটকের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য টেনাশিনাস পদক লাভ করেন। ২০০২ সালে চিত্রশিল্প, নাট্য নির্দেশক এবং পাপেট নির্মাণে অবদানের জন্য শিশু কেন্দ্র থেকে বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন। ২০১১ সালে পাক্ষিক ম্যাগাজিন সিনে তারকার পক্ষ থেকে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার দেয়া হয়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে ‘সুলতান স্বর্ণ পদক’ এবং ২০০৪ সালে তাকে শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
মুস্তাফা মনোয়ার সব সময় চেয়েছেন, শিশুরা আনন্দের সঙ্গে শিক্ষাগ্রহণ করুক। তিনি চাইতেন, শিশু মনে কল্পনা শক্তির বিকাশ ঘটাতে। মূলত তার পাপেট নিয়ে কাজ করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এটাই।  মুস্তাফা মনোয়ার কোনো দিন নিজেকে কোনো দলীয় পরিচয়ে দাড়াননি। কিন্তু দেশের প্রয়োজনে ভাষা আন্দোলনের সময় ভাষার পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে ঠিকই তিনি দাড়িয়েছিলেন, কাজ করেছিলেন। তিনি সবার কাছে সমাদৃত হতেন তার বিনয় ও গুণের জন্য। যত দিন বেচে ছিলেন শিল্পের মধ্যেই ছিলেন। মাঝে কয়েক বছর অসুস্থ থাকার পর তিনি সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন পরপারে, অনন্তলোকে। তার মৃত্যুতে জাতি এক গুণী সন্তানকে চিরতরে হারাল। কামনা করি, শান্তিময় হোক আপনার অনন্তযাত্রা। অমৃতলোকে শান্তিতে থাকুন আপনি।
তার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। 

লেখিকা- 


ফারহানা তানিয়া : কবি, লেখক ও সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT