ঢাকা | রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধান মন্ত্রীর চায়না সফর ও ভূ-মানচিত্রে নতুন মাত্রা

author
শাহীন রাজা

প্রকাশিত : ১ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ৩:৫৫
ad003
সময়টা ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। এমন এক দিনে সাবেক প্রয়াত প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া চায়নার উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। প্লেনটি মাঝ আকাশে মেঘের ভেতর দিয়ে গন্তব্যের পথে। ঠিক এমন সময় তাকে জানানো হয়, দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। এই খবর পেয়ে সাবেক প্রধান মন্ত্রী দোটানায় পড়ে যান! চায়না  সফর বাতিল করবেন। না, যাবেন। এই নিয়ে ক্ষণিক ভাবনার পর সিদ্ধান্ত নেন, না যাত্রা ঠিক থাকবে। কেননা তার চরিত্রে, পিছিয়ে যাওয় নেই। অবশেষে তিনি চায়নার যাত্রা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। 

২০০৫ সালের আগস্ট ৬৩টি জেলার ৪৩৪টি স্থানে প্রায় ৫০০টি বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এই ঘটনার পর নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এই হামলার দায় স্বীকার করে নেয়। যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে এবং দেশের ভেতর থেকে একটি গোষ্ঠী প্রচার করতে দেশ জঙ্গিদের কবলে চলে যাচ্ছে। বিএনপি সরকার বিরোধী ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয় এবং এক/এগারোর অবৈধ সরকার তাদের ক্ষমতা গ্রহণে এই ইসুটি ব্যবহার করেছিল। 

এবারো প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের চায়না সফরকালে ‘তাওহিদী জনতা’ নামে একটা গোষ্ঠী ‘কালেমা’ পতাকা নিয়ে শোভা মিছিল করে। পতাকার ডিজাইন একেবারে আইএসের পতাকার অনুরূপ। সাধারণ জনগণ বিস্মিত হয়। আবারো কোন অশনি সংকেত! দেশের ভেতর কোন ষড়যন্ত্র হতে যাচ্ছে।  তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসলেই কেন এমনটা ঘটে। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ও চায়না সফরকালে এমনটা ঘটেছে। এবারো একই ঘটনা। চায়নার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগ নিলেই কেন এমনটা হয়! কোনো অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী কি এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত? না কি বাইরের কোনো ইঙ্গিতে কি এ ধরনের কার্যক্রম ঘটানো হয়ে থাকে। তবে এই অশুভ শক্তি যেই হোক না কেন এবার কিন্তু চায়না সফরের কর্মকাণ্ডে কোনো ব্যত্যয় ঘটাতে পারেনি। কিন্তু আগের বার খালেদা জিয়াকে সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। 

চায়না  সরকারের, বিএনপির প্রতি দীর্ঘ সময় একটা নেতিবাচক মনোভাব ছিল। কেননা গত বিএনপি সরকার আমলে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায়, তাইওয়ানের ট্রেড সেন্টার খোলা হয়। এই সিদ্ধান্তে চায়না সরকার মেনে নিতে পারেনি। এ কারণে সেই সময়কার বিএনপি সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। চায়না, তাইওয়ানকে মনে করে তাদের মানচিত্রের অভিন্ন অংশ। এই ইসুতে চায়না আপসহীন। তাইওয়ান ট্রেড সেন্টার খোলার পর চায়না অলিখিতভাবে বিএনপির ওপর থেকে সমর্থন এক প্রকার প্রত্যাহার করে নেয়। বিএনপি এক পরীক্ষিত বন্ধু হারায়।

বর্তমান প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের চায়না সফরের বড় অর্জন হচ্ছে, চায়নার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন। দীর্ঘ সময় নেতিবাচক মনোভাবের বরফ, তারেক রহমান ভেঙে দিয়েছেন। চায়না বিএনপির পরীক্ষিত বন্ধু। ১৯৭৭ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট শহিদ জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে বন্ধুত্বের সূচনা হয় তা ছিল চায়না-বাংলাদেশ সম্পর্কের মাইলফলক। এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় হয়তো অমসৃণ ছিল আবার নতুন করে নতুন যাত্রা শুরু। এই সফরে এটাই হচ্ছে বড় গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। 

চায়না  হচ্ছে ঐতিহাসিক ভাবে অন্তর্মুখী। বাইরের কেউ যাতে চায়নায় প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য তারা সীমান্তে প্রাচীর দিয়েছিল। এটা আজ থেকে পাচ হাজার বছর আগের কথা। বহির্বিশ্বের সঙ্গে কোনো সময়ই তারা তেমন সম্পর্ক রেখে চলার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। দুটি বিশ্বযুদ্ধ এই পৃথিবীতে সব থেকে বড় ঘটনা। যে যুদ্ধে বিশ্বের ছোট-বড় সকল দেশ কোনো না কোনো ভাবে জড়িয়ে পড়ে। অথচ চায়নার মতো একটা বড় দেশ, একটি যুদ্ধেও তারা অংশ নেয়নি। এতবড় দেশ অথচ বিশ্বযুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখা এটা এক বিস্ময়। বর্তমান অবস্থায়ও চায়না, একই নীতি মেনে চলছে। এই চায়নার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন মুখে বলা যতটা সহজ কার্যত তত সহজ নয়। তবে চায়না যার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে তা অব্যাহত রাখে। এর অন্যতম উদাহরণ চায়না-পাকিস্তান সম্পর্ক। 

চায়না কোন রাষ্ট্র বা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পূর্বে বিশ্বস্ততা পরখ করে। এ ছাড়া বড় ধরনের চুক্তি করার আগে নিরীক্ষা চালায়। চুক্তির মধ্য দিয়ে, তারা আর্থিক বা ভৌগোলিকভাবে কতটা সুবিধা পাবে। এইসব পর্যবেক্ষণের পরই তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। প্রধান মন্ত্রীর সফরের ক্ষেত্রেও তাই হবে। সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন কেমন হবে। তবে প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যাপারে পরিলক্ষিত হচ্ছে, এই ধারণার অনেকটাই ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে। 

প্রধান মন্ত্রীর চায়না সফর ইতিবাচক মনে হওয়ার কারণ হচ্ছে, চায়না সরকারের আতিথেয়তা এবং  তারেক রহমানকে  যেভাবে সম্মান ও সংবর্ধনা দিয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করে মনে হয়েছে।  চায়নার সংস্কৃতিতে একটা বিষয় বেশ প্রচলিত। তা হচ্ছে,  ‘অতিথি’র আগমন যদি পছন্দ না হয়, তা হলে দেশের সাধারণ কর্মচারি থেকে সরকার প্রধান সকলেই মুখ গোমড়া করে থাকবে। আর পছন্দের হলে সকলেই উল্লসিত এবং হাস্যোজ্জ্ব¡ল মুখে থাকবে।’ তারেক রহমানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে চায়নার প্রেসিডেন্ট থেকে সব কর্মকর্তা হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তারেক রহমানের চায়না সফর কতটা সফল। 

ভূ-রাজনৈতিক ভাবে তারেক রহমানের চায়না সফর অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক এবং ভৌগোলিক স্বাধীন, সার্বভৌম মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করতে হলে একটা পরাশক্তির বন্ধুত্ব খুুবই জরুরি। বাংলাদেশের সঙ্গে চায়নার আর্থিক সহযোগিতার বর্তমান অবস্থা ছিল, নিছক অবকাঠামো উন্নয়নে ঋণ গ্রহণ। এই সফরের মধ্য দিয়ে বহুমুখী অংশীদারত্ব ও কৌশলগত সম্পর্কের রূপ নিতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশ বাণিজ্য, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে একযোগে কাজ করার ব্যাপারে একমত হয়েছে দুই দেশের সরকার। এ ছাড়া বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) : চায়না-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর উন্নয়নে আলোচনা হয়েছে এবং নীতিগতভাবে দুই দেশের সরকার একটা সিদ্ধান্তেও পৌছেছে। বিশেষ করে এই তিন দেশের মধ্যে একটা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা। 

চায়না সফরকালে তিন দেশের সমন্বয়ে একটা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়ে  আলোচনা হয় প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে।  আলোচনার সূত্র ধরে এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা ইতিবাচক প্ল্যান। আর যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালচিত্র পুরোটাই পাল্টে যাবে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত ভাবে বাংলাদেশ ‘আসিয়ান’ এবং ‘সার্ক’ সদস্যভুক্ত দেশের সংযোগ স্থল। এই তিন দেশের  সমন্বয়ে একটা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশ সব থেকে লাভবান হবে। এটা কার্যকর বা বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইনডিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কেননা সারভুক্ত অন্যান্য দেশের সঙ্গে  যোগাযোগ করতে হলে ইনডিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার জরুরি। বর্তমান বিশ্বে সবাই বাস্তবতা এবং দেশের মানুষের স্বার্থ চিন্তা করে পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করে। উন্নয়ন ঘটাতে হলে আবেগ নির্ভর হলে চলবে না। বাস্তবতার নিরিখে চলা বাঞ্ছনীয়। বাস্তবতা হচ্ছে চায়নার সহযোগিতায়, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং ইনডিয়া-পাকিস্তানকে নিয়ে সার্ককে আরো কার্যকর করে তোলা। এই দুই ফোরামের মধ্যে সেতু বন্ধন ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ একটি অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ হিসেবে দাড়িয়ে যাবে। আমাদের প্রধান মন্ত্রীর চায়না সফর বাংলাদেশের জন্য এই নতুন দিগন্ত উন্মোচন ঘটাতে পারবে বলে আশা ব্যক্ত করা যায়। 

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখন বৈরিতা বা যুদ্ধের পরিবর্তে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রধান। তাই ইনডিয়াও উপলব্ধি করছে বৈরী চায়নার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন। গত ২৬ জুন ইনডিয়ার দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ ইনডিয়া-চায়না সম্পর্ক নিয়ে একটি নিবন্ধন প্রকাশ করেছে। নিবন্ধনে বলা হয়েছে, বিশ্ব এক অস্থির সন্ধিক্ষণে, চায়না-ইনডিয়া এক সঙ্গে কাজ করলে বদলে যেতে পারে বৈশ্বিক বাস্তবতা। বিশ্ব বর্তমানে এক অস্থির সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে আছে। আধিপত্যবাদ, একতরফা নীতি এবং সংরক্ষণবাদ বিশ্বে শান্তি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সুশাসনের ঘাটতিকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্বের একমাত্র দুই দেশ, যাদের জনসংখ্যা তিনশ কোটিরও বেশি। ফলে এই দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতা এবং গুরুত্ব অন্য যে কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্ব এক অস্থির সন্ধিক্ষণে, চায়না-ইনডিয়া এক সঙ্গে কাজ করলে বদলে যেতে পারে বৈশ্বিক বাস্তবতা।

এমন এক পরিস্থিতিতে প্রধান মন্ত্রীর চায়না সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নগদ কি পেল না পেল এই হিসাব করলে চলবে না। আগামীর জন্য এই সফর কতটা সফলতা নিয়ে আসতে যাচ্ছে তা বিবেচনা করতে হবে। আমরা আশাবাদী। তাই আমাদের প্রত্যাশা, প্রধান মন্ত্রীর এই সফর নতুন সুবাতাস নিয়ে আসছে।  

লেখক-


শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT