ঢাকা | রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষ: হাসিনার হ্যালুসিনেশন ছাড়া অনেক কিছুই বদলে গেছে!

author
আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত : ৪ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৮
ad003
ইতিহাস বদলে দেওয়া এক নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি আজ। ২৪ এর ঠিক এই দিনে রাজপথে নেমে আসা লাখো-কোটি মানুষের ইস্পাতকঠিন সংকল্পের মুখে অবসান ঘটেছিল দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের এক নৃশংস, নির্মম ও কর্তৃত্বপরায়ণ স্বৈরশাসনের। পতন হয়েছিল শাসকের মোড়কে লুকিয়ে থাকা এক স্বৈরাচারী দানবের। আজ আমরা যখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছি, তখন চারদিকের রাজনৈতিক ও সামাজিক আবহাওয়া জানান দিচ্ছে—এই ২ বছরে বাংলাদেশে অনেক কিছুই বদলে গেছে। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ফিরে এসেছে একটি গণতান্ত্রিক ও উৎসবমুখর পরিবেশ, সম্পন্ন হয়েছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। 

রাষ্ট্রব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে সংস্কারের সুবাতাস বইছে। কিন্তু এত সব পরিবর্তনের মাঝেও কেবল একটি জিনিস বিন্দুমাত্র বদলায়নি—তা হলো শেখ হাসিনার চিরচেনা দম্ভ, অহংকার এবং রাজনৈতিক হ্যালুসিনেশন বা মারাত্মক এক মানসিক ভ্রম।

দম্ভ ও ভ্রমের ঘোরে বন্দি এক অবাস্তব চরিত্র

সাড়ে ১৫ বছর ধরে দেশের মানুষের কণ্ঠরোধ করে, ভোটাধিকার হরণ করে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি কায়েম করে যে ক্ষমতার প্রাসাদ শেখ হাসিনা গড়ে তুলেছিলেন, তার পতন হয়েছে তাসের ঘরের মতো। কিন্তু ভারতের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকেও তাঁর ভেতরের সেই ঔদ্ধত্য হ্রাস পায়নি। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘সেরা শাসক’ এবং তাঁর আমলের তথাকথিত নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রই ছিল ‘বিশ্বসেরা’। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ১১৪ শিশুসহ অন্তত ১,৪০০ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার দাবি—এই ১৪০০ মানুষকে তাঁর সরকার হত্যা করেনি, বরং এক ‘দেশি-বিদেশি চক্রের ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে তাঁর মতো ‘দেশপ্রেমিক শাসককে’ হঠাতে এই অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছে।

অনুশোচনা কিংবা আত্মসমালোচনা শব্দ দুটি সম্ভবত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অভিধানে কখনোই ছিল না, এখনো নেই। একটি দলের প্রধান হয়ে, কোটি সমর্থক এবং হাজার হাজার নেতাকর্মীকে চরম বিপদের মুখে, আইনি ও সামাজিক বৈরিতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে যিনি ৫ আগস্ট দুপুরে অলৌকিকভাবে শুধু নিজের জীবন বাঁচাতে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে গেলেন, তাঁর মুখে এমন বড়াই শুধু নীতি-নৈতিকতাবর্জিত রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি একটি গভীর মানসিক বিকারের লক্ষণ। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের তৃণমূলের সাধারণ সমর্থক ও কর্মীরাও বুঝতে পেরেছেন, নেত্রী তাঁদের ব্যবহার করেছেন কেবল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ঢাল হিসেবে। ফলে, আজ তৃণমূলের সিংহভাগ সমর্থকও অবজ্ঞা ও ক্ষোভে শেখ হাসিনাকে মনে মনে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ ভারতে বসে তিনি নিয়মিত বিরতিতে দেশে ফেরার অসার ঘোষণা দিচ্ছেন; যার সর্বশেষটি হলো—চলতি বছরই নাকি তিনি বাংলাদেশে পা রাখবেন!

প্রত্যাবর্তনের রাজনীতি বনাম নির্মম বাস্তবতা

বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফিরে আসার জন্য বর্তমান সরকার এবং এ দেশের সাধারণ জনগণ সত্যিই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তবে সেই অপেক্ষা কোনো বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য নয়, বরং তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিটি) শেখ হাসিনা আজ একজন পরোয়ানাভুক্ত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার—সবাই ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে।

কিন্তু একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবাদকর্মী হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং ভূ-রাজনীতি বিবেচনা করে আমি আগেও বলেছি, আজও বলছি—জীবিত শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা আমি দেখছি না। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই—এই বহুল প্রচলিত প্রবাদটি সম্ভবত শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে মিথ্যে হতে চলেছে। শেখ হাসিনা যদি নিজে দেশে ফিরতে চানও, ভারত সরকার তাঁকে কখনো মুক্ত করে বাংলাদেশে পাঠাবে না। 

প্রিয় পাঠকবৃন্দ আপনারা আজকের তারিখ দিয়ে ডায়েরিতে লিখে রাখতে পারেন, ভারত শেখ হাসিনাকে কিছুতেই ছাড়বে না। কারণ, আমরা বাংলাদেশি হিসেবে শেখ হাসিনাকে যতটা চিনেছি, ভারত রাষ্ট্র তাঁকে চিনেছে তার চেয়েও অনেক বেশি গভীরভাবে। ভারত খুব ভালো করেই জানে যে, হাসিনা দেশে ফিরলে ফ্রুটিকা আক্রান্ত হতে পারেন। অর্থাৎ সব সত্য গরগর করে বলে দিতে পারেন। তখন ভারত বাংলাদেশের মানুষকে মুখ দেখাবে কেমন করে?

 ‘ ভারতকে যা দিয়েছি...’ এবং সেই গোপন সত্যের উন্মোচন

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কিছুদিন আগে শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে দম্ভভরে বলেছিলেন, “আমি ভারতকে যা দিয়েছি, ভারত তা কখনো ভুলতে পারবে না।”সময়ের পথপরিক্রমায় অত্যন্ত নির্মমভাবে তাঁর সেই কথাটির অন্তর্নিহিত সত্য আজ জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, নিজের অবৈধ ও একতরফা ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে এবং দিল্লির নিঃশর্ত সমর্থন ধরে রাখতে শেখ হাসিনা বঙ্গোপসাগরের তলদেশের এক বিশাল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে এভাবে বিকিয়ে দেওয়ার যে চরম দেশবিরোধী চুক্তি তিনি আড়ালে করেছিলেন, তার মুখোশ আজ খসে পড়েছে। ভারত ভালো করেই জানে, শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে ফিরে এসে সুষ্ঠু বিচার ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন, তবে দুই দেশের মধ্যকার এমন বহু গোপন ও স্পর্শকাতর অধ্যায় আন্তর্জাতিক মহলে ফাঁস হয়ে যাবে, যা দিল্লির জন্য চরম অস্বস্তিকর। তাই নিজেদের স্বার্থেই ভারতকে আজীবন শেখ হাসিনার ‘রক্ষাকর্তা’ হয়ে থাকতে হবে, তাকে আটকে রাখতে হবে সোনার খাঁচায়।

সত্যের উন্মোচন এবং বিচারের প্রয়োজনীয়তা

তবুও, তর্কের খাতিরে যদি শেখ হাসিনা কোনোদিন বাংলাদেশে ফিরে আসেন বা ভারত তাকে ফেরত দেয়, তবে তা হবে বাংলাদেশের আইন, বিচারব্যবস্থা এবং সামগ্রিক গণতন্ত্রের জন্য এক মস্ত বড় ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। শেখ হাসিনার পনেরো বছরের শাসনামল কেবল জুলাই অভ্যুত্থানের ১৪০০ হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডিতে ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তা হত্যা, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের গণহত্যা, গণজাগরণ মঞ্চের নেপথ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণ, এবং বিগত দেড় দশকে হাজার হাজার মানুষকে গুম ও আয়নাঘরে বন্দি রাখার মতো গা শিউরে ওঠা সব অপরাধের নেপথ্য সত্য উন্মোচিত হওয়া দেশের সার্বভৌমত্বের স্বার্থেই প্রয়োজন। শেখ হাসিনা কাঠগড়ায় দাঁড়ালে দেশবাসী জানতে পারবে—কারা, কী উদ্দেশ্যে, কোন বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চেয়েছিল।

পরিশেষে বলতে চাই,শত শত শহীদ আর হাজারো পঙ্গুত্ব বরণকারী তরুণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই ‘নতুন বাংলাদেশ’কে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। পতিত স্বৈরাচার ও তার সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এখনো দূরদেশ থেকে নানা ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। তবে এই দেশের সচেতন জনতা আর কখনো কোনো স্বৈরাচারকে এ দেশের মাটিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেবে না। শেখ হাসিনার দম্ভ রয়ে গেছে তাঁর অবাস্তব কল্পনার জগতে, আর বাংলাদেশের মানুষ এগিয়ে চলেছে এক সাম্য, ন্যায়বিচার ও প্রকৃত স্বাধীনতার বাস্তব সোপানে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। 
ই-মেইল: [email protected] 

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT