একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, শোষণমুক্ত এবং বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন এদেশের মানুষ একবার নয়, বারবার দেখেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যার মূল ভিত্তি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। একটি সুশাসিত, দুর্নীতিমুক্ত এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়ে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত হয়েছিল আমাদের প্রথম স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি মেলেনি। রাজনীতির পরতে পরতে যুক্ত হয়েছে বঞ্চনা, শোষণ আর ‘চেতনা ব্যবসা’র এক নিকৃষ্ট সংস্কৃতি।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার যে অভূতপূর্ব রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা ছিল একাত্তরের সেই অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণেরই দ্বিতীয় অধ্যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, চব্বিশের সেই মহান জুলাই চেতনার ভাগ্যাকাশেও আজ দুর্যোগের মেঘ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুঁজি করে যেমন একটি দল দীর্ঘদিন ধরে মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বেইমানি, ভণ্ডামি ও প্রতারণা করেছে, ঠিক তেমনি ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে বাজারজাত করে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ‘জুলাই ব্যবসা’য় মেতে উঠেছে আরেকটি নব্য স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। জাতি হিসেবে এটি আমাদের চরম দুর্ভাগ্য যে, যখনই আমরা ভালো কিছুর আশায় বুক বেঁধে রাজপথে রক্ত দিই, তখনই আমাদের কপালে জোটে এক নতুন স্বৈরাচার ও লুণ্ঠনের নির্মম বাস্তবতা।
একাত্তরের মূল চেতনা এবং আওয়ামী লীগের ‘চেতনা ব্যবসা’
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য কেবল একটি নতুন মানচিত্র বা জাতীয় সংগীত লাভ ছিল না। এর অন্তর্নিহিত দর্শন ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শক্তিগুলো সাধারণ মানুষের এই স্বপ্নকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিবাদী কায়দায় ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের একক সম্পত্তি ও রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছিল।
মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও শহীদদের রক্তকে পুঁজি করে গড়ে তোলা হয়েছিল একচেটিয়া ক্ষমতার ‘চেতনা ব্যবসা’। এই ব্যবসার আড়ালে চলেছে দেদারসে লুণ্ঠন, অর্থ পাচার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ভিন্নমতের ওপর নির্মম দমন-পীড়ন। সাধারণ মানুষ যখনই তাদের মৌলিক অধিকারের কথা বলেছে, তখনই তাদের ওপর লেপ্টে দেওয়া হয়েছে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘রাজাকার’ তকমা। যুগের পর যুগ ধরে মানুষের এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের সঙ্গে প্রতারণা করে একটি দল যেভাবে রামরাজত্ব কায়েম করেছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই দীর্ঘস্থায়ী পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বঞ্চনাই মূলত ২০২৪ সালের জুলাই গণবিস্ফোরণের পটভূমি তৈরি করেছিল।
২০২৪-এর জুলাই: একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের লোকগাথা ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিনশ্বর অধ্যায়। ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন দেখতে দেখতে ৫ আগস্টের এক অবিস্মরণীয় গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কোটা সংস্কার আন্দোলনটি ছিল আসলে একটি উপলক্ষ মাত্র। এর অন্তরালে ছিল বিগত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে জনগণের মনে জমে থাকা তীব্র ক্ষোভ, ভোটাধিকার হরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সীমাহীন অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
এই আন্দোলনের বীজ কিন্তু হঠাৎ করে ২০২৪ সালে রোপিত হয়নি; এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বহু আগে। যখন দেশের মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করা হয়েছিল, তখনই এই দীর্ঘ সংগ্রামের সূচনা করেছিলেন তৎকালীন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন প্রহসন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ‘আমি আর ডামী’র নির্বাচন দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনাকে চরমভাবে আঘাত করেছিল। বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলকভাবে গ্রেপ্তার, লাখো রাজনৈতিক নেতাকর্মীর নামে লাখ লাখ গায়েবি মামলা, নির্যাতন এবং গুম-খুনের এক অবর্ণনীয় পরিবেশ এই আন্দোলনের চূড়ান্ত পটভূমি ও আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।
ফলস্বরূপ, জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণের সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমুক্তির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি রূপ নিয়েছিল সর্বস্তরের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। এই আন্দোলন তখনই সফল হয়েছিল, যখন মায়েরা তাদের ঘর ছেড়ে সন্তানদের বাঁচাতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। এই আন্দোলন পূর্ণতা পেয়েছিল যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, এমনকি স্কুলের অবুঝ শিশু-কিশোররা বুক চিতিয়ে স্বৈরাচারের গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল। রাজপথে শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক থেকে শুরু করে আপামর জনতা যখন একাত্ম হয়েছিল, তখনই স্বৈরাচারের তখত-ই-তাউস কেঁপে উঠেছিল। এবং এই বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তটি এসেছিল তখন, যখন বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সাধারণ জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে জনতার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল।
ড. ইউনূসের প্রবেশ এবং আন্দোলনের ফসল হাইজ্যাকের নীলনকশা
৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর দেশের মানুষ একটি নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জুলাই আন্দোলনের পরপরই এক বিশেষ গোষ্ঠী এই ঐতিহাসিক বিজয়কে নিজেদের পকেটে পুরে ফেলার সুনিপুণ ষড়যন্ত্র শুরু করে। পুরো আন্দোলনের কৃতিত্বকে সংকীর্ণ করে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষার্থীর নিজস্ব সম্পত্তি বানানোর এক অপচেষ্টা দৃশ্যমান হয়। আর এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও চরম বৈষম্যমূলক উদ্যোগের মূল হোতা ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বাংলাদেশের জনগণের, বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোর দীর্ঘ ১৫ বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন-সংগ্রাম, অসীম ত্যাগ এবং হাজারো মানুষের আত্মাহুতিকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা ও আমলে না নিয়েই ড. ইউনূস পুরো আন্দোলনের ফসল একটি বিশেষ ছাত্রগোষ্ঠীর হাতে তুলে দেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট প্যারিস থেকে দেশে ফিরেই তিনি কতিপয় ছাত্রকে তাঁর ‘নিয়োগকর্তা’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি ছিল দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের বিজয়ের ওপর প্রথম বড় আঘাত। এর মাধ্যমে কার্যত জনগণের আন্দোলনকে ছিনতাই করা হয়। ড. ইউনূস রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বজনীনতা বজায় রাখার বদলে কতিপয় ছাত্রনেতাকে নিয়ে সিন্ডিকেট মেতে ওঠেন এবং তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ উদ্ধার করতে থাকেন। কেউ ড. ইউনূসের বা তাঁর সরকারের কোনো ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেই সেই ছাত্রদের লেলিয়ে দেওয়া হতো। এভাবেই একটি চমৎকার ও সম্ভাবনাময় গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা পথ হারাতে শুরু করে এবং এর স্বপ্নগুলো বিবর্ণ রূপ নেয়।
উপদেষ্টা নিয়োগের ভুল কৌশল ও বৈষম্যের নতুন রূপ
ড. ইউনূস তাঁর সরকারে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার দাবিদার তিনজনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন, যাঁদের সবাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের সরাসরি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী বা উপদেষ্টার পদে বসানোর সিদ্ধান্তটি ছিল একটি মারাত্মক এবং নীতিগত ভুল। শিক্ষার্থীরা রাজপথে আন্দোলন করে দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পথ উন্মুক্ত করেছে—সেজন্য তারা জাতির অহংকার। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা আর রাজপথের স্লোগান এক জিনিস নয়।
ইউনূস যদি একজন দূরদর্শী ও দায়িত্বশীল অভিভাবক হতেন, তবে তিনি এই তরুণদের বলতেন, "তোমরা আমাদের গর্ব। এখন তোমরা শিক্ষাঙ্গনে ফিরে যাও, তোমাদের অসমাপ্ত শিক্ষাজীবন শেষ করো এবং দেশ গঠনের জন্য নিজেদের জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত করো।" কিন্তু ড. ইউনূস তা না করে নিজের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং একটি অনুগত বাহিনী তৈরি করতে এই তরুণদের ব্যবহার করলেন। শিক্ষাজীবন শেষ করার আগেই তাদের মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা বানিয়ে দেওয়া হলো, যা ছিল জুলাই চেতনার সঙ্গে এক প্রকার তামাশা।
এর চেয়েও বড় দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, শুধু একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনজনকে উপদেষ্টা করে ইউনূস জুলাই আন্দোলনের সামগ্রিক ও জাতীয় তাৎপর্যকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করলেন। এই আন্দোলনে ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান ছিল অসামান্য, ঢাকার বাইরের রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ত্যাগ ছিল অতুলনীয়। এমনকি স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারাও জীবন দিয়েছে। কিন্তু ড. ইউনূসের সরকার তাদের সবাইকে একপাশে ঠেলে দিয়ে পুরো বিজয়কে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করে দিল। ফলে এই তরুণরা ক্ষমতার মধু ও স্বাদ খুব দ্রুত পেয়ে গেল, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা কী জিনিস—তা বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। ফলে অচিরেই তারা লাইনচ্যুত ও বিপথগামী হয়ে পড়ল।
ক্ষমতার অপব্যবহার: লুণ্ঠন, চাঁদাবাজি ও ‘মব কালচার’
ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর এই নব্য ‘জুলাই ব্যবসায়ী’রা বুঝতে পারল যে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে টাকা বানানো কত সহজ। এরপরই শুরু হলো জুলাইয়ের পবিত্র চেতনাকে পুঁজি করে ব্যবসার এক মহোৎসব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীরা যে যার মতো টাকার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠল। তারা দল বেঁধে সচিবালয়ে গিয়ে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য শুরু করল। পড়ার টেবিলে ফেরার বদলে অনেকে মেতে উঠল বড় বড় সরকারি টেন্ডার বাণিজ্যে।
সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিল চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্য। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, এমনকি গণমাধ্যমকর্মীদের পর্যন্ত জুলাই হত্যাকাণ্ডের ঢালাও মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হলো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে এই নব্য ফ্যাসিবাদের প্রবক্তারা বিভিন্ন কর্পোরেট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে 'মব' সৃষ্টি করত এবং মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করত। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে মব জাস্টিসের নামে মানুষ পিটিয়ে মারা হলো, যার ফলে দেশে এক চরম নৈরাজ্যকর ও আইনহীন পরিস্থিতি তৈরি হলো।
নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন: ড. ইউনূস ও জামায়াতের ভূমিকা
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—উভয় পক্ষই নিজেদের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থীদের এই সব অগ্রহণযোগ্য ও উগ্র কর্মকাণ্ডকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়েছিল। ড. ইউনূসের মূল এজেন্ডা ছিল নিজের আখের গোছানো ও আন্তর্জাতিক লবিং রক্ষা করা। ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে তিনি নিজের পূর্বের কর মওকুফ করালেন, নিজের বিরুদ্ধে থাকা সব আইনি মামলা এক রাতেই প্রত্যাহার করালেন। নিজের ঘনিষ্ঠদের নামে বিশ্ববিদ্যালয়, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের লাইসেন্স পাইয়ে দিলেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করে নিজের ব্যক্তিগত জনসংযোগের জন্য একের পর এক বিদেশ সফরের উৎসব করলেন। আর অন্যদিকে জাতির বিবেক বলে পরিচিত ছাত্রসমাজের একটি অংশকে ‘শর্টকাটে’ বড়লোক হওয়ার নেশায় বুঁদ করে রাখা হলো।
পুরো বিষয়টি ছিল কোনো সিনেমার ক্রাইম থ্রিলারের মতো—যেখানে বাড়ির প্রহরীদের নেশাগ্রস্ত বা ব্যস্ত রেখে পেছনের দরজা দিয়ে ডাকাতি করা হয়। শিক্ষার্থীদের এই লুটপাটের দরজা খুলে দিয়ে ড. ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টারা দেশ লুটপাটের এক অঘোষিত প্রতিযোগিতায় নামলেন। দেশ সংস্কারের নামে কতিপয় মানুষের দুর্নীতির এই মহোৎসব একটি গোটা সম্ভাবনাময় প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিল।
শিক্ষার্থীদের চিরতরে বিপথে পরিচালিত করতে এবং নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে ড. ইউনূস এই গুটিকয়েক শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করে ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ বা এনসিপি (NCP) গঠন করালেন, যা ছিল মূলত একটি ‘কিংস পার্টি’। এই কিংস পার্টি এবং জামায়াত মিলে ড. ইউনূসকে সামনে রেখে শুরু করল জুলাই চেতনা ধ্বংসের চূড়ান্ত আয়োজন। ইউনূসের এই দেশবিনাশী অপকর্মের বিরুদ্ধে দেশের কোনো সচেতন নাগরিক, রাজনৈতিক দল বা গণমাধ্যম প্রতিবাদ করলেই তাদের ওপর নব্য ফ্যাসিবাদের ‘মব’ লেলিয়ে দেওয়া হতো অথবা মিথ্যা মামলায় জেলে পুরে দেওয়া হতো।
জামায়াতও তাদের নিজস্ব দীর্ঘমেয়াদি এজেন্ডা
বাস্তবায়নের জন্য এই নৈরাজ্যের উৎসবের অংশীদার হয়েছিল। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করা এবং নেপথ্যে থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। এ কারণেই শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জামায়াত সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সব ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনা, ভাস্কর্য ও স্মারক ভাঙচুর ও ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত হয়।
প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারের সব স্তরে নিজেদের দলীয় ক্যাডারদের বসানোর এক গোপন মিশন বাস্তবায়ন করে তারা। অন্তর্বর্তী সরকারকে সামনে রেখে জামায়াত মূলত দেশ দখলের এক নীল নকশা এঁকেছিল, আর এই কারণেই জামায়াত ও এনসিপি দেশে দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার ঘোর বিরোধিতা করছিল। এই কুৎসিত রাজনৈতিক কূটকৌশলের আবর্তে পড়ে জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে তার পথ হারিয়ে ফেলে।
জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের নিয়ে তামাশা এবং হঠাৎ ধনকুবেরদের উত্থান
ড. ইউনূসের শাসনামলের দীর্ঘ দেড়-দুই বছরেও জুলাই আন্দোলনে নিহত প্রকৃত শহীদদের একটি সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা পর্যন্ত প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। উল্টো রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য অনেক জীবিত মানুষকে জুলাই শহীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এই পবিত্র ত্যাগকে রসিকতার বিষয়ে পরিণত করা হয়। জুলাইয়ের বীর আহতদের চিকিৎসা নিয়ে যে তেলেসমাতি কারবার চলেছে, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। অন্য কোনো সাধারণ রোগে বা দুর্ঘটনায় অসুস্থ ব্যক্তিদের জুলাইয়ের ‘আহত যোদ্ধা’ সাজিয়ে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে মোটা অঙ্কের ভাতা দেওয়ার খবর দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে বারবার প্রকাশিত হয়েছে।
এসব সীমাহীন দুর্নীতি, জালিয়াতি আর অনিয়মের কারণে সাধারণ জনগণের মন থেকে জুলাইয়ের প্রতি যে আবেগ ও শ্রদ্ধা ছিল, তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অথচ অন্যদিকে, জুলাই যোদ্ধা নামধারী কতিপয় ইউনূস-ঘনিষ্ঠ তরুণ যেন হঠাৎ করেই আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান। তাদের রাতারাতি বিত্তবান হয়ে ওঠার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও কুরুচিপূর্ণ। যারা কিছুদিন আগেও টিউশনি করে বা কষ্ট করে মেসের ভাড়া জোগাত, তারা হঠাৎ করেই কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেল। মেসের স্যাঁতসেঁতে ঘরে থাকা তরুণরা গুলশান, বারিধারার মতো অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক হলেন। পায়ে হেঁটে বা বাসে চলাচল করা শিক্ষার্থীরা প্রাডো ও হ্যারিয়ারের মতো দামি গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন। হঠাৎ অর্জিত এই বিত্তের উৎকট ও নোংরা রূপ দেখে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ক্ষুব্ধ, বিরক্ত এবং মানসিকভাবে চরম আহত হয়। মূলত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে একটি নতুন সুবিধাবাদী লুটেরা গোষ্ঠীর জন্ম হয়, যাদের একমাত্র উপার্জনের পথ ও পুঁজি হলো ‘জুলাই চেতনা বিক্রি করা’। জুলাই চেতনার এই নিকৃষ্ট ব্যবসা করে দেশে এক নতুন নব্য-ফ্যাসিবাদী লুটেরা শ্রেণির আবির্ভাব ঘটেছিল।
স্বপ্নভঙ্গ ও প্রতারিত জনতা
জুলাই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীনতা ও সবার সমান অধিকার। কিন্তু আন্দোলনের দুই বছরের মাথায় এসে আজ দেশজুড়ে কেবলই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা এবং প্রতারিত হওয়ার করুণ গল্প।চারদিকে কান পাতলে কেবলই আশাহত মানুষের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসেও দেশের মানুষকে আবার সেই একই শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছে।
জনতার ঘুরে দাঁড়ানো এবং বর্তমানের প্রত্যাশা
তবে এদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই পলল ভূমির মানুষ কখনো চিরতরে হারতে জানে না। তারা সাময়িকভাবে প্রতারিত হলেও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কখনও ভুল করে না। তাই বাংলাদেশের সচেতন জনগণ ড. ইউনূস ও তাঁর দোসরদের মব-ফ্যাসিবাদ ও কিংস পার্টির ষড়যন্ত্র সফল হতে দেয়নি। তারা রাজপথে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের পছন্দের গণতান্ত্রিক সরকার বেছে নেওয়ার জন্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করে ছেড়েছে। দেশের আপামর জনতার ভোটে আজ তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করেছে। আর এর মাধ্যমেই জুলাই চেতনার সেই নোংরা ব্যবসায় অবশেষে ভাটার টান লেগেছে।
নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত চার মাসের মধ্যে দেশকে একটি নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। আর এই কারণেই জুলাই নিয়ে যারা এতদিন কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করছিল, সুবিধাভোগী সেই নব্য গোষ্ঠীর মনে আজ বড় অভিমান ও ক্ষোভ। তারা তাদের লুণ্ঠনের সাম্রাজ্য হারানোর ভয়ে সুযোগ পেলেই সরকারকে নানারকম হুমকি-ধমকি দিচ্ছে এবং দেশে পুনরায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার এই সব সস্তা ধমক এবং ব্ল্যাকমেইলে বিন্দুমাত্র ভয় পায়নি।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের ওপর দেশের সতেরো কোটি মানুষের পাহাড়সম প্রত্যাশা। এই সরকারকে যেকোনো মূল্যে দেশে প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিগত স্বৈরাচার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মাঝে একটি আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনা—অর্থাৎ একটি বৈষম্যমুক্ত, সুশাসিত ও সাম্যের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কোনো আপস ছাড়াই কাজ করে যেতে হবে।
একটি বিষয় মনে রাখতে হবে: জুলাই আন্দোলন কতিপয় শিক্ষার্থীর ভাগ্যবদল, প্রাডো গাড়ি বা গুলশানের ফ্ল্যাট কেনার জন্য হয়নি; এই আন্দোলন হয়েছিল এদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার আপামর খেটে খাওয়া মানুষের একটু সুন্দর, নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের প্রত্যাশায়।
তাই যারা জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত বিক্রি করে দেশের নতুন মালিক বনে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। একাত্তর কিংবা চব্বিশ—কোনো চেতনা নিয়েই আর কোনো ব্যবসা এই দেশের মাটিতে চলতে দেওয়া হবে না। চেতনা ব্যবসার অবসান ঘটিয়ে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, স্বনির্ভর ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক এই মুহূর্তের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]