ঢাকা | শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টানা বর্ষণে ডুবছে পেকুয়া, ঝুঁকিতে বেড়িবাঁধ ও জনজীবন

author
পেকুয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ৮ জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:৩৭
ad003
টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, বিভিন্ন স্লুইসগেট বন্ধ থাকা এবং খাল-নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে চরম দুর্ভোগ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ।

সাত ইউনিয়নের বেশিরভাগ নিম্নাঞ্চল ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, পেকুয়া পৌরসভার শেখের কিল্লাঘোনা, হরিণাফাঁড়ি, গোঁয়াখালী, জালিয়াখালী-মগকাটা, মেহেরনামার ছড়াপাড়া, বলীরপাড়া-মোরারপাড়া, পূর্ব মেহেরনামা ও বাগগুজারা বাজার এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। এছাড়া শিলখালী ইউনিয়নের মুন্সিমোড়া, রাজাখালীর পালাকাটা, মগনামা ইউনিয়নের শরৎঘোনা, টৈটং ইউনিয়নের মিত্যান্তঘোনা, বারবাকিয়া ইউনিয়নের জালিয়াকাটা এবং উজানটিয়া ইউনিয়নের করিমদাদ মিয়ার ঘাটসহ আরও বেশ কয়েকটি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এসব এলাকার অধিকাংশ পরিবার বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। গবাদিপশু নিয়েও চরম সংকটে পড়েছেন বাসিন্দারা। গোয়ালঘর ও খামারে পানি ঢুকে পড়ায় পশুগুলোকে উঁচু স্থানে সরিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মালিকদের।

অন্যদিকে, পেকুয়া উপজেলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি মৎস্য খাতও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। উপজেলার অধিকাংশ মাছ ও চিংড়ি চাষের প্রকল্প ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। হঠাৎ পানি বৃদ্ধি ও বেড়িবাঁধের ঝুঁকির কারণে মাছ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন প্রকল্প মালিকরা। এতে কোটি টাকার ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে উজানটিয়া ইউনিয়নের টেকপাড়া বেড়িবাঁধ এবং পেকুয়া পৌরসভার কাটাফাড়ি বেড়িবাঁধ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের পিপি মীর মোশারফ হোসেন টিটু বলেন, উজানটিয়ার মানুষ একদিকে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে টেকপাড়া বেড়িবাঁধ নিয়ে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জলাবদ্ধতার কারণে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটি স্কুল ও মাদ্রাসার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিবন্দি হয়ে পড়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

অবিরাম বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন সড়কে গাছ উপড়ে পড়েছে। ফলে অনেক স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা আংশিক কিংবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম এখনও বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে। এতে দুর্ভোগ বেড়েছে সাধারণ মানুষের।

টৈটং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি সদস্য শাহাদাত হোসেন বলেন, এমনিতেই পাহাড়ধসের আশঙ্কায় মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। তার ওপর জলাবদ্ধতায় অনেক গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিবৃষ্টির কারণে উপজেলার বেশিরভাগ হাট-বাজারে পানি ঢুকে পড়েছে। ক্রেতাদের যাতায়াত কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

মৎস্য প্রকল্পের মালিক ও সাবেক ইউপি সদস্য মমতাজুল ইসলাম বলেন, যা পুঁজি ছিল তার বেশিরভাগই মৎস্য প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছি। প্রকল্পে পানি ঢুকে পড়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি। আজ রাতেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে সবকিছু তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠপর্যায়ে কাজ করার কথা জানিয়ে এম বাহাদুর শাহ বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে খাল-নালা পরিষ্কার এবং পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কহলখালী খালের স্লুইসগেটের জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলার বেশিরভাগ স্লুইসগেট উন্মুক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে, যাতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হয়।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে খাল-নালা পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার এবং স্লুইসগেটগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পেকুয়ার মানুষকে একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT