যে সময়টার কথা বলব তখনো যোগাযোগ মাধ্যমের এত ব্যাপ্তি ঘটেনি। ওই সময়ে ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম কিংবা এক্স বাজারে নেটের জগত আসেনি। এসেছে অনেক পরে। ওই সময়ে সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেলই ছিল প্রচারের প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের জয়জয়কার। দর্শকদের কাছে একটা জায়গা করে নিয়েছে। দর্শকদের কাছে মনে হয়, সরকার নিয়ন্ত্রিত টিভি চ্যানেল শুধুমাত্র সরকারের কেত্তন গায়। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এটাই বাস্তবতা। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতেই দর্শকদের কাছে ক্রমশই বেসরকারী টিভি চ্যানেল জনপ্রিয় প্রচার মাধ্যম হয়ে যায়। কিন্তু এর আরেকটি বিপরীত চিত্র স্পষ্ট হয়ে প্রকাশ পায়। জনগণ বা দর্শকদের কাছে কিছুদিনের মধ্যেই স্পষ্ট রূপ লাভ করে। বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো কারো না কারো উদ্দেশ্য প্রচার করে। তা পৃথিবীর দেশে দেখা যায়। এমনটাই ঘটেছিল ল্যাটিন আমেরিকার তেল সমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলায়।
যে সময়টার কথা বলতে যাচ্ছি তা দুই হাজার সালের গোড়ার দিকের। আমেরিকান আর্থিক অনুদানে প্রায় একশটি টিভি চ্যানেল স্থাপিত হয়েছিল ভেনিজুয়েলায়। এই টিভি চ্যানেলগুলোর কাজই ছিল, প্রেসিডেন্ট শ্যাভেজ হুগোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নির্যাতন এবং অপশাসনের কল্পকাহিনী প্রচার করা হতো এইসব চ্যানেল থেকে। এই টিভি চ্যানেল গুলোর মালিকানা ছিল, সামাজিক এলিটদের হাতে। যাদের কাছে জনগণের সরকার বা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পছন্দের নয়। এরা জনগণের শাসন ভয় পায়। কেননা জনগণের সরকার থাকলে ইচ্ছেমতো লুটপাট সম্ভব নয়। তাদের স্বার্থে একটা অগণতান্ত্রিক সরকার প্রয়োজন। তাই তারা করতে চেয়েছে।
সুবিধাবাদী সামাজিক গোষ্ঠী হুগোর বিরুদ্ধে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়। এর মধ্যে রয়েছে, কিছু অলিগার্ক ব্যবসায়ী। বুদ্ধিজীবী। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং ধর্মের নামে জিকির তোলা কিছু ধর্মীয় পুরোহিত। বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর অবিরাম অপপ্রচারে শহরের মধ্যবিত্ত সমাজও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু হুগোর ওপর শ্রমজীবী এবং গ্রামের মানুষদের আস্থা ছিল অবিচল। শ্যাভেজ রাষ্ট্র কাথাময়, বিশেষ করে কৃষি ব্যবস্থায় যে সংস্কার আনে তাদের জীবনের চালচিত্র পাল্টে যায়। জীবনে আসে স্বাচ্ছন্দ্য। যার জন্য ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অপপ্রচার শ্রমজীবী মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি।
তারপরও আমেরিকান প্ররোচনায় ভেনিজুয়েলার সুবিধাবাদী এলিট গোষ্ঠী ২০০২ সালে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলে। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই গণবিরোধী সরকারের পতন ঘটে। এই অশুভ শক্তির পতনের নায়ক ছিল ভেনিজুয়েলার শ্রমজীবী মানুষ। গ্রামগঞ্জ থেকে লাখ, লাখ মানুষ ভেনিজুয়েলার রাজধানী, ‘কারাকাস’-এ জড়ো হতে থাকে। লক্ষ, কোটি জনতার ভয়ে অশুভ গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট ভবনের পেছনের দরজা দিয়ে পালাতে বাধ্য হয়!
এই ঘটনার সত্য চিত্র ধারণ করে আয়ারল্যান্ডের দুই চলচ্চিত্র নির্মাতা। তারা ভেনিজুয়েলায় ২০০২ সালের অভ্যুত্থান নিয়ে ‘দি রিভলিউশন উইল নট বি টেলিকাস্ট’ নামে একটা প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন। নির্মাতারা হলেন, আইরিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা জুটি কিম বার্টলি এবং ডোনাচা ও ব্রায়ান। এরা মূলত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ওপর একটি ব্যক্তিগত বায়োগ্রাফি তৈরির জন্য ভেনিজুয়েলায় গিয়েছিলেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে তারা ২০০২ সালের ১১ এপৃলের সামরিক অভ্যুত্থানের একেবারে কেন্দ্রে আটকা পড়ে যান। প্রেসিডেন্ট ভবনে আটকা পড়া অবস্থায় সেখানে কি ঘটেছে তা চিত্রে তুলে ধরেন, তারা। মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে, ৪৮ ঘণ্টার অভ্যুত্থানের সময় প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসের ভেতরের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি এবং কিভাবে ভেনিজুয়েলার বেসরকারি মিডিয়াগুলো অপপ্রচার চালিয়েছিল, তা সরাসরি ফুটে উঠেছে।
বর্তমান বাংলাদেশে এমনই চিত্র। সামাজিক মাধ্যমে প্রচার, অপপ্রচার সমানে চলছে। যেসব প্রচার মাধ্যমগুলোর সামাজিক ভিত্তি আছে, তারাও একই কাজ করছে। সব ধরনের অপকর্ম বা অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার করবে এটা সব মানুষের কাম্য। কিন্তু দল, মত, ধর্ম এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে প্রচার চালানো এটা কিন্তু সাধারণ জনগণের কাছে পছন্দ নয়। কিন্তু এখন তাই হচ্ছে। সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে, প্রচার মাধ্যম যা প্রচার করেছে তা কি খুব সুখকর? এক জন কিশোর উত্তীর্ণ যুবতী শিক্ষা মন্ত্রীর নাম ধরে জ্ঞান দিতে দেখা যায়। তার ইচরে পাকামো মন্তব্য প্রচারও করা হয়। প্রচারের সময় টিভি সাংবাদিকদের তাকে উৎসাহিত করতে দেখা গিয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অবশ্যই প্রচারিত হবে। যেমন, সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন করা হয়েছে কি না। প্রশ্নপত্র সরবরাহে বিলম্ব কিংবা পরীক্ষা হলে অনিয়ম। কিন্তু প্রশ্নপত্র কঠিন হয়েছে, এই নিয়ে মন্ত্রীকে ব্যাঙ্গ করা এবং তা প্রচার এটা কি ঠিক হয়েছে? এই ধরনের প্রচার আজকাল অহরহ হচ্ছে। দর্শক বা পাঠক সত্য যত কঠিনই হোক না কেন তা দেখতে এবং শুনতে বিরক্ত হয় না। কিন্তু কোনো সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত মিথ্যা প্রচার করলে, শ্রোতা সংবাদমাধ্যমের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সত্য ঘটনা প্রচারের পরিবর্তে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে আংশিক প্রচার করা হলে, তা রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ঘটায়। এর পেছনে নিশ্চয় কোনো অপশক্তির ইন্ধন থাকে। এই অপশক্তি চায় রাষ্ট্রে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হোক।
মানব সভ্যতার শুরু থেকেই শাসকরা ক্ষমতা ধরে রাখতে বা প্রতিপক্ষকে কাবু করতে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যের প্রচার করে আসছে।
সম্রাট অগাস্টাস তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মার্ক এন্টনিকে হেয় করতে এবং নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে মুদ্রা ও কবিতার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ : বিংশ শতাব্দীতে এসে নেতিবাচক প্রচার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আধুনিক ইন্টারনেটের যুগে সোশাল মিডিয়ার বিস্তার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ভুল তথ্য ও নেতিবাচক প্রচারণার ব্যাপকতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরনের প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের আবেগ কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।
এছাড়া প্রোপাগান্ডা হলো এমন ধরনের পক্ষপাতমূলক ও ভ্রান্ত তথ্য যা একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা উদ্দেশ্যের প্রচারণায় ব্যবহৃত হয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা সাধারণত আংশিক সত্য বা আংশিক মিথ্যাকে বা সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যকে প্রচার করে। জনগণের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গীর কাক্সিক্ষত পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয় এবং সব ধরনের প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। বক্তৃতা, প্রচারপত্র, পোস্টার, সংবাদপত্রে বিবৃতি, চলচ্চিত্র, ব্যক্তিগত ক্যানভাসিং, সংবাদ সম্মেলন, রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার, সেমিনার, সোশাল মিডিয়া, অনলাইন রেডিও, ব্লগ, ক্ষুদে বার্তা ইত্যাদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বিস্তারের অন্যতম মাধ্যম।
পরিশেষে সব রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় এবং সামাজিক সংগঠনের কাছে অনুরোধ মিথ্যা বা অসত্য প্রচার করবেন না। বিশেষ করে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আবহমান সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ভুল তথ্য প্রচার করবেন না। প্রত্যেক দেশ বা জাতির নিজস্ব রীতিনীতি, আচার-আচরণ আছে তা বিনষ্ট হোক এমন কিছু না করার জন্য অনুরোধ করছি। এগুলোর বিরুদ্ধে বলা মানেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবং ২০২৪ সালের আগষ্ট আবারও প্রমাণিত হয়েছে জনগণই হচ্ছে শক্তি! দেশের বিরুদ্ধে বলা। অপপ্রচারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে, দেশের শান্তি শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে। এগুলো দেশের মানুষের পছন্দ নয়। দেশের নাগরিককে সিদ্ধান্ত দিতে দেন কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ তা বিবেচনার। এই দেশের জনগণ কখনোই ভুল করে না। তারা দেশের ক্রান্তিকাল একাত্তর, নব্বই এবং ২০২৪-এর ৫ আগস্ট সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামীতেও এর ভুল হবে না।
শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক।