আষাঢ়ের বৃষ্টি প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ সঞ্চালনের কথা থাকলেও এ বছরের কক্সবাজারবাসীর জন্য নিয়ে এসেছে এক গভীর মানবিক বিপর্যয়। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর জোড়া আঘাতে কক্সবাজার এখন বিপর্যস্ত জনপদ। টানা পাঁচ দিনের অবিরাম বর্ষণে পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে কয়েক শতাধিক গ্রামের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে, অন্যদিকে উত্তাল সাগরের অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি উপকূলীয় জনপদকে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। এই নিয়ে অন্তত ১০টি উপজেলার ৫০টি ইউনিয়ন নিম্নাঞ্চাল প্লাবিত হয়ে পড়ায় পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন লক্ষাধিক মানুষ। তাছাড়া সাগরপৃষ্ঠ থেকে জোয়ারের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৬ ফুট বেড়ে যাওয়ায় সৈকত তীরবর্তী এবং দ্বীপ অঞ্চলের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সমুদের প্রচণ্ড ঢেউ ও উত্তাল পরিস্থিতির কারণে কক্সবাজারের উপকূল এখন চরম ঝুঁকিতে।
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসের কারণে কক্সবাজার জেলায় বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত মোট ২৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ ৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) চকরিয়ার বরইতলীতে পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে নিহত হয়েছে দুই শিশু। নিহত দুই শিশু হলো মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে রুমি আকতার (১৫) এবং আবদুল মজিদের ছেলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। এর আগে,নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে নারী ও শিশুসহ ১৮ জন এবং কক্সবাজার সদর ও বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে সাতজন মারা গেছেন। গত বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সাব—ব্লক এ—৩ এর খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় পাহাড়ধসের ঘটনায় ৮ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।চারদিনে কক্সবাজারে মোট ৭৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ। এবং আগামী ৪ দিন এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এই পূর্বাভাস উপকূলীয় মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে জেলার ১০টি উপজেলার অন্তত ৫০টি ইউনিয়ন। পানিবন্দি হয়েছেন অন্তত লক্ষাধিক মানুষ। পরিস্থিতি বিবেচনায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। তবে প্রশাসনের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নাফিস ইনতেসার নাফি অভিযান টিম নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উচু পাহাড়ে উঠে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য বলছেন। তবে অনেকেই ঝুঁকি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চাচ্ছেন না, তাঁদের বুঝিয়ে বা ফোর্স করে পাঠানো হচ্ছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে সাধারণ মানুষকে সাইক্লোন সেন্টার বা নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস থাকায় স্থানীয় প্রশাসন জোয়ারের সময় উপকূলীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলেছে। এছাড়া দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় পানির প্রবল স্রোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতু ধসে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে কক্সবাজারের এই ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস কেবল একটি সাময়িক বিপর্যয় নয়, বরং এটি আমাদের অদূরদর্শী উন্নয়ন ও পরিবেশগত অবহেলার এক কঠোর সতর্কবার্তা। প্রকৃতি তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়েছে বলেই আজ উপকূলীয় এই জনপদ আজ জলমগ্ন। প্রশাসনের দ্রুত সাড়াদান এবং ত্রাণ তৎপরতা সাময়িকভাবে মানুষের দুর্দশা লাঘব করতে পারলেও, এর স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে আছে সঠিক পরিকল্পনায়। তারা বলেন, পাহাড় রক্ষায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ, নদ—নদীর নাব্য পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, পানি নিষ্কাশনের ঐতিহ্যবাহী নদী খাল নালাগুলো বছরের পর বছর দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে। কোথাও অপরিকল্পিত সড়ক, কোথাও রেললাইন, আবার কোথাও অপরিকল্পিত বাঁধ জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত করেছে। ফলে দুর্যোগ এখন আর কেবল প্রাকৃতিক নেই; এটি পরিকল্পনাহীন উন্নয়নেরও নির্মম তারই প্রতিফলন। প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই চিত্র দেখা যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিবর্তে প্রশাসনের কার্যক্রম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে বর্ষা শেষ হলে সমস্যাও যেন ভুলে যাওয়া হয়।
এদিকে, ৫দিনের টানা বর্ষণে জেলার অন্তত ৫০টি গ্রাম এর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো এখন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার নিম্নাঞ্চল এখন অথৈ জলরাশি। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ও মহেশখালী কুতুবদিয়া, টেশনাফ, সেন্টমার্টিন উপকূলে এখন ধ্বংসলীলার চিহ্ন স্পষ্ট। সাগরের বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ায় উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। কোথাও ঘরের মেঝে পর্যন্ত পানি উঠে গেছে, কোথাও কৃষিজমি ও মাছের ঘের পানির নিচে তলিয়ে গেছে। হাজারো অসহায় মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় প্রবল স্রোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতু ভেঙে পড়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানিবন্দি এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং স্যানিটেশন সমস্যাও দ্রুত বাড়ছে। শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় যোগাযোগ ও উদ্ধার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বৃষ্টির পানিতে কক্সবাজার—চট্টগ্রামের রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় ট্রেন যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৮ হাজার ফিশিং ট্রলারগুলো গত এক সপ্তাহ ধরে ঘাটে নোঙর করে রয়েছে। মহেশখালী—কক্সবাজার পারাপারে সি—ট্রাক গত চারদিন ধরে বন্ধ। তাছাড়া সেন্টমার্টিনের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আজ ৫ দিন ধরে, যার ফলে সেখানে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, কক্সবাজারের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয় বরং জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটা, প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট, খাল দখল, অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ হারিয়ে ফেলছে। ফলে স্বল্প সময়ের ভারী বর্ষণও বড় ধরনের জলাবদ্ধতা ও বন্যার রূপ নিচ্ছে। তাছাড়া উপকূলীয় বেড়িবাঁধের অধিকাংশ জায়গায় ফাটল এবং জরাজীর্ণ অবস্থার কারণেই সাগরের পানি সহজে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো যদি জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ না নেয়, তবে আসন্ন দিনগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
কক্সবাজার বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে উখিয়া—টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে এসব ক্যাম্পে প্রায় ১২ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১ লাখ মানুষ ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে বসবাস করছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে জেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবার পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এর মধ্যে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ১৩ হাজার এবং উত্তর বন বিভাগের আওতায় প্রায় সাত হাজার পরিবার রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আ: মান্নান জানান, টানা ভারী বৃষ্টির কারণে সেন্টমার্টিনে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বেড়েছে। বৈরী আবহাওয়া ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং বাসিন্দাদের নিরাপদে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার ও জরুরি সহায়তার জন্য কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।