মাত্র তিন মাস বয়সী বাছুরটি ২০ দিনের বেশি সময় ধরে জ্বরে কাতর। সারা শরীরে গুটি, ক্ষত আর ফুলে ওঠা চামড়া। চিকিৎসার আশায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে গিয়েও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সহায়তা। শেষ পর্যন্ত ঝাড়ফুঁক, হোমিওপ্যাথি ও নিজের টাকায় কেনা ওষুধেই ভরসা করতে হচ্ছে ছোট খামারি মো. ফিরোজ আলীকে।
নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের নওশারা সুলতানপুর গ্রামের এই খামারির মতো একই সংকটে রয়েছেন শত শত কৃষক। লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গরু আক্রান্ত হচ্ছে। টিকার সংকট ও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাবে বাড়ছে খামারিদের উদ্বেগ।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লালপুরে মোট ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২২টি গরুর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গরু লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। গত মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত ৩৬টি গরুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে দপ্তরটি। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি।
সরেজমিনে গত বুধবার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পদ্মা তীরবর্তী এ ইউনিয়ন থেকেই প্রথম সংক্রমণ শুরু হয়। পরে মহারাজপুর, নাশোষা, নওশারা, সুলতানপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রোগটি।
ছোট খামারি ও দিনমজুর মো. ফিরোজ আলী বলেন, লাম্পি রোগে আক্রান্ত হওয়ায় প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের পাঁচটি গরু অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হয়েছে। পরে তিনটি গরু কিনলেও একটি বাছুর আবার আক্রান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “সরকারি হাসপাতালে গিয়ে কোনো টিকা পাইনি। নিজের টাকা খরচ করে দুটি গরুকে টিকা দিয়েছি। সময়মতো টিকা পেলে এত ক্ষতি হতো না।”
নওশারা সুলতানপুর গ্রামের খামারি মো. নুর নবী ঘোষ বলেন, তাঁর খামারের ছয়টি গরু মারা গেছে। আরও তিনটি আক্রান্ত। তিনি অভিযোগ করেন, “পশু হাসপাতালে গিয়েও তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি।”
একই গ্রামের মো. টুটুল ইসলাম বলেন, তাঁর দুটি গরু আক্রান্ত। কয়েকবার প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে গেলেও কার্যকর কোনো চিকিৎসাসেবা পাননি। একই অভিযোগ করেছেন খামারি শাহানাজ পারভীনও।
পানসিপাড়া গ্রামের দিনমজুর কামরুল ইসলামের একটি গরু ১০ দিন ধরে আক্রান্ত। তিনি বলেন, “ওষুধ না পেয়ে হোমিওপ্যাথি, নিমপাতা, ধূপ ও ন্যাপথলিন দিয়ে চিকিৎসা করছি।”
ফতেপুর গ্রামের জোসনা ও বিলমাড়িয়া এলাকার বিজলীও জানান, তাঁদের গরু আক্রান্ত হলেও সরকারি টিকা না পেয়ে ঘরোয়া উপায়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় পশুপল্লী চিকিৎসক মোসলেম উদ্দিনের দাবি, শুধু বিলমাড়িয়া ইউনিয়নেই গত এক মাসে ৪৫ থেকে ৫০টি গরু মারা গেছে এবং প্রায় সাড়ে তিন হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় জানায়, লালপুরে প্রথম লাম্পি রোগ শনাক্ত হয় ২০২১ সালে। তবে এবার সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেশি।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় মাত্র ৩৫০ ডোজ টিকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বর্তমানে কোনো টিকা মজুত নেই। অথচ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্তত ৫০ হাজার ডোজ টিকার প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল্লাহ বলেন, “জনবল সংকটের কারণে কিছু তথ্যে গরমিল থাকতে পারে। প্রকৃত তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জুলাই মাসের জন্য ২৫ হাজার ডোজ টিকার চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।”
ভেটেরিনারি সার্জন ডা. শুভ কুমার দাস বলেন, আক্রান্ত পশুকে সুস্থ পশু থেকে আলাদা রাখতে হবে। খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
টিকার সংকট, সীমিত চিকিৎসাসেবা এবং দ্রুত সংক্রমণের কারণে লালপুরের খামারিরা এখন বড় ধরনের আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে। দ্রুত পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ ও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।