ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলোচিত ৬ বছরের শিশু নিশাত জাহান হত্যা মামলার চার্জশীট দ্রুত প্রদান ও আসামীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শহরের কাউতলীতে অবস্থিত স্বপ্নতরী কনভেনশন সেন্টারে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নিহত নিশাত জাহানের পরিবারের উদ্যোগে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। নিহত নিশাত জাহান ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার তালশহর পূর্ব ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের প্রবাসী আবু সালেক মিয়ার কন্যা।
চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল বাড়ির পাশের একটি জমি থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় শিশু নিশাতের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় নিশাত খুনের ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে একই গ্রামের মৃত জুরু মিয়ার ছেলে ইছা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
জেলা জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মোবারক হোসেন আকন্দের সভাপতিত্বে ও সহকারি সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জুনায়েদ হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মফিজুর রহমান বাবুল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ বাহারুল ইসলাম মোল্লা, মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোঃ আবুল বাসার চৌধুরী, নিহতের চাচা মোঃ আবুল বাশার (বাছির), নিহতের মাতা আকলিমা বেগম, জেলা জামায়াতে ইসলামী অফিস সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান প্রমুখ।
মতবিনিময় সভায় নিশাত জাহানের চাচা মোঃ আবুল বাশার (বাছির) বলেন, চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল সদর উপজেলার তালশহর পূর্ব ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের প্রবাসী আবু সালেক মিয়ার ৬ বছরের শিশু কন্যা নিশাত জাহান নিখোঁজ হয়। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ১৭ এপ্রিল বাড়ির পাশের একটি জমি থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় শিশু নিশাতের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় নিশাত খুনের ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে একই গ্রামের মৃত জুরু মিয়ার ছেলে ইছা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে পুলিশের কাছে গ্রেপ্তারকৃত ইছা মিয়া নিশাত জাহানকে হত্যার কথা স্বীকার করে। এ ঘটনায় নিহত নিশাতের মা আকলিমা বেগম বাদী হয়ে ১৮ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ গ্রেপ্তারকৃত ইছা মিয়াকে আদালতে সোপর্দ করলে ইছা মিয়া আদালতে নিশাত জাহানকে হত্যার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী প্রদান করে।
জবানবন্দীতে ইছা মিয়া জানায়, ১৪ এপ্রিল নিশাত জাহানকে সে ফুসলিয়ে তার ঘরে নিয়ে যায়। পরে তাকে ধর্ষন চেষ্টা করলে সে চিৎকার করলে তাকে গলায় চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তার লাশ বস্তায় ভরে ঘরে থাকা ড্রামে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে তার লাশে পচন ধরলে রাতের বেলা লাশ ভর্তি বস্তা সে বাড়ির পাশের জমিতে ফেলে আসে। সেখান থেকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে।
তিনি বলেন, মামলাটি বর্তমানে পিবিআই, ব্রাহ্মণবাড়িয়া তদন্ত করছে। ঘটনার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও পিবিআই এখনো আদালতে মামলার চার্জশীট দাখিল করেনি। সময় ক্ষেপন করছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ঢাকায় রামিসা হত্যাকান্ডের চার্জশীট ও বিচারের রায় দ্রæত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়। অথচ তিন মাস পেরিয়ে গেলেও নিশাত জাহান হত্যাকান্ডের চার্জশীট দেয়া হচ্ছেনা। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে নিশাত হত্যাকান্ডের চার্জশীট দাখিল ও খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মামলার আইনগত বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতারাও নারী ও শিশু হত্যার দ্রুত বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু নিশাত হত্যা মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, যেখানে আসামীর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আছে, তাহলে চার্জশিট দাখিলে এত দেরি হচ্ছে কেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। কোনো অদৃশ্য প্রভাব বা ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত হওয়া উচিত।
তিনি আইন প্রয়োগকারী তদন্ত সংস্থার প্রতি দ্রুত চার্জশিট দাখিল করে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান।
মতবিনিময় বক্তারা বলেন, থানা পুলিশ তদন্ত করে মামলার চার্জশিট দাখিল করতে সক্ষম হওয়ার পরও মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে অন্য সংস্থার তদন্তে থাকায় বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। তারা প্রশ্ন তোলেন, আসামির স্বীকারোক্তির পরও তদন্ত শেষ না হওয়ার পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের হাত রয়েছে কি না তাও বের করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় বক্তারা অবিলম্বে আদালতে চার্জশিট দাখিল, দ্রুত বিচার সম্পন্ন এবং আইন অনুযায়ী হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। মতবিনিময় সভায় সাংবাদিক, আইনজীবী, নিশাতের পরিবার ও সুশীল সমজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।