ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জনশক্তি রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত খুলছে বাংলাদেশ

author
আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত : ১০ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ৩:২১
প্রতীকী ছবি প্রতীকী ছবি
ad003
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক—বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিশীলতার পেছনে যে দুটি খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তার একটি তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) এবং অন্যটি প্রবাসী রেমিট্যান্স। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখো বাংলাদেশির কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বারবার দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং অসংখ্য পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে রেমিট্যান্সের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেও একটি বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। দেশের অধিকাংশ প্রবাসী কর্মী এখনো অদক্ষ বা আধাদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কাজ করেন। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তাদের শ্রমের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম, আয়ও সীমিত।

অন্যদিকে ভারত, ফিলিপাইন কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ প্রকৌশলী, নার্স, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, কেয়ারগিভার এবং অন্যান্য পেশাজীবী বিদেশে পাঠিয়ে মাথাপিছু অনেক বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই জাতীয় সংসদে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর ঘোষণা নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আগামী পাঁচ বছরে বিদেশে এক কোটি দক্ষ কর্মী পাঠানোর যে পরিকল্পনার কথা তিনি তুলে ধরেছেন, তা কেবল একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

তবে এমন একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেবল সংখ্যার হিসাব করলেই হবে না। দেশের প্রশিক্ষণব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা, ভাষাগত সক্ষমতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং অভিবাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা—সবকিছু সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ বর্তমান বিশ্বে শুধু শ্রমিক পাঠানোই যথেষ্ট নয়; দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাই প্রকৃত প্রতিযোগিতা।

সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগকে শুধু রাজধানী বা বড় শহরে সীমাবদ্ধ না রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংসদে মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানে বেকার যুবক-যুবতী, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থান উপযোগী করে গড়ে তোলার কার্যক্রম চলছে। এটি শুধু বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি নয়; একই সঙ্গে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি কার্যকর পদক্ষেপ।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো নারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বাংলাদেশি নারীদের একটি বড় অংশ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। বর্তমানে কেয়ারগিভিং, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, সেবা ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য দক্ষ পেশায় নারীদের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকার যদি আইটি, কেয়ারগিভিং, ড্রাইভিংসহ আধুনিক ট্রেডে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে শুধু বৈদেশিক কর্মসংস্থানই নয়, দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও নতুন গতি পাবে।

বিশ্ব অর্থনীতি এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিক্স এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি শ্রমবাজারের ধরন বদলে দিচ্ছে। অতীতে যেখানে কায়িক শ্রমের চাহিদা ছিল বেশি, এখন সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের পথে এগোচ্ছে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে নির্মাণশ্রমিকের পাশাপাশি প্রযুক্তিকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, পর্যটনসেবাকর্মী এবং দক্ষ পরিচালনাকর্মীদের গুরুত্ব আরও বাড়বে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি অন্যতম। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে সফটওয়্যার ডেভেলপার, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ডেটা অ্যানালিস্ট এবং আইটি সাপোর্ট কর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। একইভাবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের অনেক দেশে দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কেয়ারগিভার ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীর প্রয়োজন ক্রমাগত বাড়ছে। 

আন্তর্জাতিক পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে দক্ষ চালক এবং লজিস্টিকস অপারেটরের বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো যদি এই বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশিক্ষণ দিতে পারে, তাহলে দেশের শ্রমবাজারে একটি গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে দক্ষতার পাশাপাশি ভাষাগত সক্ষমতা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সাফল্যের অন্যতম পূর্বশর্ত। বহু বাংলাদেশি কর্মী কেবল ভাষাজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত পদে উন্নীত হতে পারেন না। একই কর্মস্থলে ফিলিপাইনের একজন কর্মী ইংরেজিতে দক্ষ হওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে কাজের সুযোগ পান, অথচ বাংলাদেশি কর্মী ভাষা না জানার কারণে নিচের স্তরেই থেকে যান। ফলে আয়ের ব্যবধানও তৈরি হয়।

সরকার কর্মীদের ভাষাগত সমস্যা দূরীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে ভাষা শিক্ষা যেন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, জাপানি, কোরিয়ান এবং জার্মান ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভাষা সনদ অর্জনের পরিবেশ তৈরি করা গেলে বিদেশে বাংলাদেশের কর্মীদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সংসদে মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে লাগেজ সহায়তা, ইমিগ্রেশন সহযোগিতা, ফ্রি ওয়াই-ফাই, স্বল্পমূল্যে খাবার এবং অন্যান্য সেবা দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরে প্রবাসীদের নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগ ছিল। এসব সেবা কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে বিদেশগামী কর্মীদের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

একই সঙ্গে বিদেশে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশি কর্মীদের মরদেহ রাষ্ট্রের খরচে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দাফন-কাফনের ব্যয় বহনের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। বিভিন্ন দেশে কারাগারে আটক বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনতে দূতাবাসের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব উদ্যোগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করতে প্রতিটি দূতাবাসে শ্রমিক সহায়তা সেল, আইনি সহায়তা এবং জরুরি সেবাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

নারী কর্মীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত না হলে দক্ষতা উন্নয়নের সুফল পূর্ণমাত্রায় পাওয়া সম্ভব হবে না।

তবে সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, দেশের সব কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অতীতে বহু মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এই চিত্র বদলাতে না পারলে নতুন পরিকল্পনার সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। 

তৃতীয়ত, শ্রমবাজারের বহুমুখীকরণ জরুরি। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং ওশেনিয়ার নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ আজ তার জনমিতিক সম্ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ। এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই জনসংখ্যার কাঠামো পরিবর্তিত হবে। তাই বর্তমান সময়কে কাজে লাগিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলতে চাই,এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নিঃসন্দেহে সাহসী। তবে লক্ষ্য অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই কর্মীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে তারা বিশ্বের যেকোনো শ্রমবাজারে দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়াতে পারেন। পরিকল্পনাটি যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কর্মসূচি হবে না; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের ভিত্তি হয়ে উঠবে। তখন জনশক্তি রপ্তানি কেবল শ্রমিক প্রেরণের পরিসংখ্যান নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা এবং মানবসম্পদভিত্তিক একটি নতুন বাংলাদেশের বৈশ্বিক পরিচয়ে পরিণত হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। 
ই-মেইল: [email protected] 

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT