নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে জমি দখল ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে ২০২০ সালে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয় পুনরায় চালু হয়েছে।
তবে বিচারাধীন জমিতে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ও নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এ অবস্থায় মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যালয়ের সব ধরনের কার্যক্রম ও নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন জমির দাবিদার এক ভুক্তভোগী।
শনিবার মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিদ্যালয়ের পদাধিকারবলে সভাপতি আমেনা খাতুন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে গত ২৯ জুন ভুক্তভোগী মনিরা আক্তার শিল্পী এ অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগে বলা হয়, পৌরশহরের সাতুর এলাকার ৩০ শতাংশ জমি তাঁর বাবা-মা বৈধভাবে ক্রয় করেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মা, চার বোন ও এক ভাই উত্তরাধিকার সূত্রে জমিটির যৌথ মালিক হিসেবে ভোগদখলে রয়েছেন।
তবে বিআরএস জরিপে ভুলবশত জমিটি তাঁদের নামে রেকর্ড না হওয়ায় সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান রতন ও দলিল লেখক নুরে আলম সিদ্দিকীর যোগসাজশে জাল দলিল সৃষ্টি করে জমির মালিকানা দাবি করা হয়। পরে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে জমি খারিজ করে ১৫ শতাংশ মোহনগঞ্জ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের কাছে এবং বাকি ১৫ শতাংশ অন্যদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল নেত্রকোনার যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতে বাটোয়ারা মামলা (নং-১২১/২০১৮) দায়ের করা হয়। মামলায় নুরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল হান্নান রতন, বিদ্যালয়ের সভাপতিসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
অভিযোগকারীর দাবি, মামলা চলমান থাকলেও বিবাদীপক্ষ জোরপূর্বক জমির দখল নেয়। পরবর্তীতে জমির মূল্য ১৮ লাখ টাকা নির্ধারণ করে আদালতে প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়ে স্বত্ব ঘোষণা ও বাটোয়ারা ডিক্রির আবেদনসহ সংশোধিত আরজি দাখিল করা হয়, যা আদালত গ্রহণ করেছেন।
বিচারাধীন জমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হলে মামলার নিষ্পত্তি জটিল হয়ে পড়বে এবং তাঁরা অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাই চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ ও সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মোহনগঞ্জ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয় প্রথমে পৌরশহরের কলেজ রোড এলাকার একটি ভাড়া ভবনে পরিচালিত হতো। ২০১৯ সালে বিদ্যালয়টি সাতুর এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। ওই সময় বিদ্যালয়ের জন্য অধিগৃহীত জমি নিয়ে দখল ও জাল দলিলের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের কাছ থেকে নিয়োগের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে আসে।
বিদ্যালয়ের জন্য কেনা জমি তৎকালীন আওয়ামী লীগের মোহনগঞ্জ উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি আব্দুল হান্নান রতনের নামে নিবন্ধন করা হয়েছিল। পরে তিনি জমিটি বিদ্যালয়ের নামে হস্তান্তর করে দাতা সদস্য হন এবং একপর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২০২০ সালে এসব অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে আব্দুল হান্নান রতন এফিডেভিটের মাধ্যমে দাতা সদস্য পদ প্রত্যাহার করেন এবং সভাপতির দায়িত্বও ছেড়ে দেন। একই সময় নিয়োগ বাণিজ্য ও জমি-সংক্রান্ত বিতর্কের জেরে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি বিদ্যালয়টি পুনরায় চালু হওয়ায় বিরোধ নতুন করে সামনে এসেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রব খান ঠাকুর বলেন, দীর্ঘদিন নানা জটিলতায় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সম্প্রতি তা আবার চালু করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের নামে জমির বৈধ দলিল ও খারিজ রয়েছে। জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকলেও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। আদালতের চূড়ান্ত রায় যেটি হবে, সেটিই মেনে নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, বর্তমানে বিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী এবং ২৪ জন শিক্ষক ও শিক্ষা সহকারী কর্মরত রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত নুরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল হান্নান রতনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের সভাপতি আমেনা খাতুন বলেন, লিখিত অভিযোগটি পাওয়া গেছে। জমি দখলসহ উত্থাপিত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।