পরাধীনতা আর স্বৈরাচারের শেকল ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া চব্বিশের দুনিয়া কাঁপানো জুলাই অভ্যুত্থান এ দেশের ইতিহাসের এক অবিনাশী অধ্যায়। এই গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়কদের তাজা রক্তের স্রোত এবং হাজার হাজার মানুষের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন সূর্যের মুখ দেখছে। কিন্তু যে ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে রাজপথে, তার বিষাক্ত ছোবল এবং চক্রান্তের জাল এখনো পুরোপুরি ছিন্ন করা যায়নি। বিশেষ করে, গণহত্যাকারী ও পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে প্রতিনিয়ত এ দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের মানুষের মনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং নিজের অপকর্মের দায় এড়াতে তিনি মাঝে মাঝেই তথাকথিত 'দেশে ফেরার' ভণ্ডামি ও প্রতারণামূলক হুংকার দিচ্ছেন।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে একটি বড় নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে: একজন চিহ্নিত গণহত্যাকারী, আদালতের দৃষ্টিতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামির লাগামহীন, উস্কানিমূলক বক্তব্য ও অডিও বার্তা প্রচার করা কি আমাদের গণমাধ্যমের জন্য খুব জরুরি? কেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী স্বৈরাচারের কণ্ঠস্বরকে বারবার প্রতিধ্বনিত করা হচ্ছে? আমাদের গণমাধ্যম শেষ পর্যন্ত কবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে?
১.জুলাইয়ের রক্তাক্ত প্রেক্ষাপট ও শেখ হাসিনার আরাম-আয়েশের জীবন
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না। এটি ছিল দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক দ্বিতীয় স্বাধীনতা। যে শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রায় ১৪০০ নিরীহ মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে, সেই রক্তের দাগ এখনো এ দেশের রাজপথ থেকে মুছে যায়নি। অথচ এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের মূল কারিগর নিজের জীবন বাঁচাতে কাপুরুষের মতো দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে আজ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে রাজকীয় অতিথি হিসেবে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন।
যে নেত্রী হাজারো মায়ের কোল খালি করে, দেশের তরুণ প্রজন্মকে পঙ্গুত্বের অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে নিজে বিলাসী জীবন যাপন করছেন, তাঁর মুখে আজ আবার গণতন্ত্র আর দেশপ্রেমের কথা মানায় না। এটি আমাদের শহীদদের আত্মার সাথে চরম অবমাননা।
নিজে নিরাপদ দূরত্বে থেকে শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের ভেতরে থাকা তাঁর দলের সাধারণ ও নিরীহ নেতাকর্মীদের উস্কানি দিচ্ছেন। তিনি ভালো করেই জানেন, আন্তর্জাতিক এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর সশরীরে দেশে ফেরার কোনো পথ অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে এবং ভারতের ইশারায় তিনি একের পর এক বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে চলেছেন।
২. পলাতক হাসিনার 'ডেট লাইন' এবং অন্ধ অনুসারীদের চরম ট্র্যাজেডি
দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই শেখ হাসিনা এক এক সময় এক এক ধরণের বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক স্টান্টবাজি করে যাচ্ছেন। কখনো তিনি গোপনে অডিও ক্লিপে বলছেন, "আমি হুট করে ঢুকে পড়ব", কখনো বলছেন "তাড়াতাড়ি চলে আসব"। এরপর তিনি দাবি করলেন, "এ বছরই ফিরে আসব", আর তাঁর সর্বশেষ ভণ্ডামিপূর্ণ ঘোষণা হলো—তিনি নাকি "আগামী ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন"।
রাজনৈতিক সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যে কোনো মানুষই বোঝেন যে এটি ভারত ও হাসিনার যৌথ একটি মনস্তাত্ত্বিক খেলা। উদ্দেশ্য—বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রাখা এবং দেশের ভেতরে এক ধরণের বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখা। কিন্তু এই গভীর ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে আওয়ামী লীগের সেইসব অন্ধ অনুসারীরা, যারা এখনো ফ্যাসিবাদের মোহে অন্ধ হয়ে আছেন।
হাসিনার ফাঁকা আওয়াজে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা দেশের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হয়ে নিজেদের জীবন ও পরিবারকে চরম বিপন্ন করছেন।
সন্তান ও নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে চিরতরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা এই সরল সত্যটি বুঝতে পারছেন না যে, হাসিনা তাদের ভালোবাসেন না; বরং তাদের নতুন করে বলির পাঁঠা বানিয়ে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করছেন।
৩. সরকারের কঠোর বার্তা এবং তথ্য উপদেষ্টার হুঁশিয়ারি
সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামির এই অপতৎপরতা রুখতে সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশের গণমাধ্যমগুলোকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের প্রচলিত আইন ও আদালতের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু গণমাধ্যম স্বউদ্যোগে শেখ হাসিনার এসব উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রচার করছে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং সম্পূর্ণ অনুচিত।
উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় মিডিয়াগুলোকে তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন: "বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সবসময় গণমাধ্যমকে তার বন্ধু মনে করে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনগণের মতামতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রাখে। কিন্তু স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে একজন পলাতক আসামির রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য প্রচার করা হবে। এই ধারা চলতে থাকলে পরবর্তীতে এ বিষয়ে কঠোর আইনগত করণীয় ঠিক করা হবে।"
এছাড়াও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, যতদিন না আদালত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, ততদিন আওয়ামী লীগ 'রিফর্মড' বা অন্য যে নামেই আসুক না কেন, তাদের কোনো ধরণের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান শতভাগ কঠোর।
৪. দ্বিচারিতার জ্বলন্ত উদাহরণ: তারেক রহমান বনাম শেখ হাসিনার খবর প্রকাশ
আমাদের দেশের গণমাধ্যমের এই অংশের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে এক গভীর ও হতাশাজনক দ্বিচারিতা (Double Standard) স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযুক্ত এবং লন্ডনে নির্বাসিত তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে যখন বিগত স্বৈরাচারী আমলে আদালত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তখন এ দেশের গণমাধ্যমগুলো কেমন ভূমিকা নিয়েছিল।
সেই সময় আমাদের তথাকথিত 'মুক্ত' গণমাধ্যমগুলো ভয় বা অতি-আনুগত্যের কারণে তারেক রহমানের একটি শব্দও প্রকাশ করেনি। তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি, বিবৃতি বা সাধারণ কোনো খবরও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। গণমাধ্যম তখন স্বৈরাচারের ভয়ে নিজেদের মেরুদণ্ড বিসর্জন দিয়েছিল।
অথচ আজ যখন হাজারো মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গণমাধ্যমের শতভাগ স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে, তখন কিছু গণমাধ্যম এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করছে। তারা আজ স্বউদ্যোগী হয়ে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গণহত্যাকারী হাসিনার উস্কানিমূলক অডিও বার্তা ও বিভ্রান্তিকর খবর ফলাও করে প্রচার করছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উল্টো ও নেতিবাচক ফল আজ রাষ্ট্রকে ভোগ করতে হচ্ছে।
৫. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও গণমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্ব
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নীতিমালায় (Journalism Ethics) পরিষ্কার বলা আছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কখনো জননিরাপত্তা, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের হাতিয়ার হতে পারে না। কোনো যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির উস্কানিমূলক বক্তব্য সরাসরি প্রচার করা আন্তর্জাতিকভাবেও নিন্দনীয়।
বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের গণমাধ্যমের একটি অংশ এখনো পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার চেয়ে সস্তা ভিউ (Views) এবং সুপ্ত রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে বেশি পছন্দ করে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যারা এই অপকর্ম করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী অবিলম্বে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল, তা নির্ভর করে সেই দেশের গণমাধ্যমের পরিপক্বতার ওপর। ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদানদের রক্ত আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, কোনো অন্যায়ের সাথে, কোনো স্বৈরাচারের সাথে আপস করা যাবে না।
পলাতক ও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার ভণ্ডামি ও রাজনৈতিক স্টান্টবাজির প্রচারক হিসেবে আমাদের দেশের গণমাধ্যম ব্যবহৃত হতে পারে না। গণমাধ্যমকে বুঝতে হবে, চক্রান্তের উস্কানি প্রচার করা কোনো সাংবাদিকতা নয়, বরং এটি দেশের ভেতরের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার অপপ্রয়াসের অংশীদার হওয়া। আশা করি, তথ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর বার্তার পর দেশের মিডিয়াগুলো তাদের দায়িত্বশীলতা ফিরে পাবে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা থেকে বিরত থাকবে।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]