ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অস্তিত্ব সংকটে চিরচেনা স্থপতি বাবুই পাখি

author
চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১৩ জুলাই, ২০২৬ সকাল ৫:৫৪
ad003
‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই।
আমি থাকি মহা সুখে অট্টালিকার পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে।’

কবি রজনীকান্ত সেনের সেই কালজয়ী কবিতার নায়ক বাবুই পাখি আজ বিলুপ্তির পথে।গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরির কারিগর এই পাখিটি এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। গ্রামবাংলার মানুষের কাছে একসময় যে পাখি ছিল সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা ও প্রকৃতির অপূর্ব নিদর্শন, সেই বাবুই আজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে রয়েছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে একসময় তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলে থাকা বাবুইয়ের অসংখ্য বাসা এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বাবুই পাখিকে প্রকৃতির স্থপতি বলা হয়। ছোট্ট এই পাখিটি নিজের দক্ষতা ও শ্রম দিয়ে তৈরি করে অসাধারণ নকশার বাসা। খড়ের ফালি, ধানের পাতা, তালের কচিপাতা, কাশবনের লতাপাতা ও বিভিন্ন ধরনের ঘাস ব্যবহার করে বাবুই তৈরি করে তার নিরাপদ আবাস। উঁচু তালগাছ, নারিকেল ও সুপারি গাছের ডালে ঝুলে থাকা এসব বাসা শুধু পাখির আশ্রয় নয়, ছিল গ্রামবাংলার সৌন্দর্যের অন্যতম প্রতীক। বাবুইয়ের বাসার নির্মাণশৈলী মানুষের কাছেও বিস্ময়ের বিষয়। এত ছোট একটি পাখি কীভাবে এত নিখুঁতভাবে বাসা তৈরি করে, তা দেখলে অবাক হতে হয়। 

বাসার ভেতরের কাঠামো যেমন মজবুত, তেমনি বাইরের নকশাও দৃষ্টিনন্দন । প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতেও অনেক সময় এসব বাসা টিকে থাকে। শক্ত বুননের কারণে সহজে ছিঁড়ে ফেলা যায় না। প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে বাবুই পাখি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের আগ্রহ ও ভালোবাসার জায়গা দখল করে আছে। বাবুই পাখির জীবনযাপন ও প্রজনন প্রক্রিয়াও বেশ আকর্ষণীয়। সাধারণত পুরুষ বাবুই সঙ্গিনী আকৃষ্ট করার জন্য বাসা তৈরির কাজ শুরু করে। সে প্রথমে বাসার একটি অংশ তৈরি করে। এরপর স্ত্রী বাবুইকে নিজের দক্ষতা দেখানোর জন্য সেই বাসা দেখায়। স্ত্রী বাবুই বাসা পছন্দ করলে পুরুষ পাখি নির্মাণকাজ শেষ করে। আর পছন্দ না হলে অসম্পূর্ণ বাসা রেখেই নতুন বাসা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সঙ্গিনী আকৃষ্ট করার সময় পুরুষ বাবুইয়ের আচরণও বেশ বৈচিত্র্যময়। খাল-বিল বা ডোবায় গোসল করে গাছের ডালে উঠে সে নাচের মতো ভঙ্গি করে। ডানা ঝাপটিয়ে ও নানা শব্দ করে সে স্ত্রী বাবুইয়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। স্ত্রী পাখির সম্মতি পাওয়ার পরই বাসা তৈরির পরবর্তী কাজ এগিয়ে যায়। একটি অর্ধেক বাসা তৈরি করতে পুরুষ বাবুইয়ের সময় লাগে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় দিন। স্ত্রী পাখির সবুজ সংকেত পাওয়ার পর আরও কয়েক দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ বাসা তৈরি হয়। একটি প্রজনন মৌসুমে পুরুষ বাবুই একাধিক বাসা তৈরি করতে পারে।

ধান কাটার মৌসুমে সাধারণত এদের প্রজনন বেশি দেখা যায়। ডিম দেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা জন্ম নেয় এবং আরও প্রায় তিন সপ্তাহ পর ছানারা উড়তে শেখে। কিন্তু প্রকৃতির এই অসাধারণ স্থপতি এখন নানা কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একসময় চুনারুঘাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর তাল, বট ও খেজুরগাছ ছিল। এসব গাছে দল বেঁধে বাবুই পাখি বাসা তৈরি করত। বিকেলের বাতাসে গাছের ডালে ঝুলে থাকা অসংখ্য বাসা ছিল গ্রামের পরিচিত দৃশ্য। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের কাছে বাবুইয়ের বাসা ছিল এক ধরনের আনন্দ ও বিস্ময়ের বিষয়। চুনারুঘাট পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. জামাল হোসেন বলেন, আগে গ্রামে গ্রামে প্রচুর তাল, বট ও খেজুরগাছ দেখা যেত। এসব গাছে শত শত বাবুই পাখির বাসা থাকত। কিন্তু বর্তমানে গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পাখিগুলো তাদের আবাসস্থল হারিয়ে ফেলছে। তিনি বলেন, শুধু গাছপালা কমে যাওয়াই নয়, কিছু মানুষের অসচেতনতা ও অবাধ শিকারের কারণেও বাবুই পাখির সংখ্যা কমছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে প্রকৃতির এই নিপুণ স্থপতিকে হয়তো আর দেখা যাবে না। পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরা মনে করছেন, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, বন উজাড়, তালগাছ নিধন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতির কারণে বাবুই পাখির নিরাপদ আবাস সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গ্রামীণ এলাকায় বড় বড় গাছ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পাখিদের বিচরণের ক্ষেত্রও কমে গেছে। ফলে তারা আগের মতো বাসা তৈরি ও বংশবিস্তার করতে পারছে না। তাদের মতে, বাবুই পাখি শুধু একটি সাধারণ পাখি নয়, এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অংশ। এই পাখির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতি, কবিতা, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সৌন্দর্য। তাই বাবুই পাখিকে রক্ষা করতে হলে এর আবাসস্থল সংরক্ষণ করতে হবে। বেশি বেশি তাল, খেজুর, নারিকেল ও দেশীয় গাছ লাগাতে হবে। একই সঙ্গে পাখি শিকার বন্ধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন । প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাবুই পাখিও সেই ভারসাম্যের একটি অংশ। একসময় যে পাখির বাসা গ্রামবাংলার আকাশে বাতাসে সৌন্দর্যের বার্তা ছড়াত, তাকে ফিরিয়ে আনতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাবুই পাখি হয়তো শুধু কবিতার পাতায় কিংবা গল্পের স্মৃতিতেই থেকে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT