হবিগঞ্জে বন্যায় শুধু প্রায় ৬ হাজার পরিবারই ঘরছাড়া হয়নি, ধাক্কা লেগেছে জেলার খাদ্য ও প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনেও। মাছের খামার, গোখাদ্য, ফসলি জমি ও প্রাণি সম্পদের শত কোটির বেশি টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করেছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর।
প্রাথমিক ভাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ৫ কোটি ৫২ লাখ, মৎস্য অধিদপ্তর ৯৫ কোটি এবং প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর ১২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিয়েছে। তবে বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জেলার ৯ উপজেলায় আবাদ করা ৪১ হাজার ২০ হেক্টর আউশ ধানের মধ্যে বন্যায় এক হাজার ২৫৯ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৬৫০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ২৩৩ হেক্টর এবং ৬৮৫ হেক্টর আমনের বীজতলার মধ্যে ১৫০ হেক্টর সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ৪২ হাজার ৩৫৫ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে এক হাজার ৬৪২ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে এক হাজার ২০০ কৃষকের প্রায় ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপ কুমার পাল।
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল ও মাধবপুর উপজেলায় অন্তত এক হাজার ১০০টি মাছের খামার ও ব্যক্তিগত পুকুর প্লাবিত হয়ে মাছ ভেসে গেছে। এতে খামারিদের প্রায় ৯৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
গত অর্থবছরে জেলায় উন্মুক্ত জলাশয় থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টন এবং ব্যক্তিগত খামার থেকে প্রায় ২৩ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি অর্থবছরেও একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এক হাজারের বেশি ব্যক্তিগত খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানকার উৎপাদন কমবে বলে জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফুল আলম।
গত অর্থবছরে জেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন দুধ এবং ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়েছিল। স্বাভাবিক সময়ে জেলায় প্রতিদিন প্রায় ৪০০ টন দুধ ও ১০ লাখ ডিম উৎপাদন হয়। তবে বন্যার কারণে দৈনিক দুধ উৎপাদন ২৫ টন এবং ডিম উৎপাদন ৯০ হাজার পিস কমে গেছে।
এদিকে বন্যায় প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন গোখাদ্য (খড়) নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা। পাশাপাশি দুধ ও ডিম উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রাথমিকভাবে আরও প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম বলেন, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন অন্যতম। অন্যান্য বছর জেলায় ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদন স্থানীয় চাহিদার চেয়ে বেশি হওয়ায় জেলার বাইরে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এবার বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেই সময় লাগবে। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন তো দূরের কথা, জেলার নিজস্ব চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খেতে হতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে ঢলের পানি। একরাতেই প্লাবিত হয় প্রায় ৬ হাজার পরিবার। এছাড়াও বানিয়াচং উপজেলার মক্রমপুরে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় তিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। বানের জলে তলিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি ছেড়ে কেউ ছুটছেন আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন বিদ্যালয় কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে। হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল ও বানিয়াচং উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের এই চিত্র।
জেলা প্রশাসনের হিসেবে, জেলার ৯ উপজেলায় মোট ৬ হাজার ৬৪৫টি পরিবারের ৩০ হাজার ১৪০ জন মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন। যদিও বাস্তবে তার বহুগণ হবে। দুর্গতদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ২ হাজার ৬৮২ প্যাকেট শুকনা খাবার, ৩০ মেট্রিক টন চাল ও ২ লাখ টাকা বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় নৌকার ব্যবস্থা রাখারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।