ঢাকা | বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেধার লালন ও স্নেহের শাসন: 'ফার্মের মুরগি' মন্তব্য এবং কিছু ভুল বোঝাবুঝি

author
খাতুনে জান্নাত

প্রকাশিত : ১৪ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:০১
ad003
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী শিক্ষার্থীর ফোনালাপের একটি অডিও ক্লিপ কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। একটি বিশেষ শব্দগুচ্ছ ‘ফার্মের মুরগি’কে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। কিন্তু জল ঘোলা করার এই মিছিলে আমরা কি একবারও তলিয়ে দেখেছি—কথোপকথনটির আসল সুর কী ছিল? নাকি বরাবরের মতোই খণ্ডিত সত্যের ওপর ভিত্তি করে আমরা একজন আপাদমস্তক সংস্কারক ও দায়িত্বশীল অভিভাবকের আন্তরিকতাকে অযথা কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছি?

খণ্ডিত সত্য বনাম প্রকৃত সত্য

ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির ক্যাপশনে অত্যন্ত চটকদারভাবে প্রচার করা হয়েছে যে, শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন করেছেন। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি যেকোনো শিক্ষার্থীর মনে আঘাত হানতে পারে। কিন্তু পুরো অডিওটি মনোযোগ দিয়ে শুনলে এর পেছনের এক পরম স্নেহের ও বাস্তবসম্মত রূপ উন্মোচিত হয়।সেখানে স্পষ্ট শোনা যায়, মন্ত্রী মহোদয় যখন শিক্ষার্থীদের প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা দেওয়া এবং এর ফলে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও ঘরোয়া ভঙ্গিতে বলেন—

*"এরা তো ফার্মের মুরগি... আমার মেয়েও তো আছে না, সে-ও তো ফার্মের মুরগির মতো। 
সামান্য বৃষ্টিতে ভিজলেই তো জ্বর চলে আসে..."*

এখানে পরিষ্কার যে, এই শব্দচয়ন কোনো তাচ্ছিল্য, উপহাস বা কটাক্ষ থেকে আসেনি। বরং এটি এ দেশের প্রতিটি মধ্যবিত্ত বা শহুরে মা-বাবার অতি পরিচিত একটি অভিব্যক্তি। শহুরে জীবনে আলো-বাতাস ও মাঠেঘাটে কঠোর কায়িক শ্রমে অভ্যস্ত না হওয়া সন্তানদের প্রতি মা-বাবারা আদর করে, কখনো বা মৃদু আক্ষেপ করে এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন।

একজন সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক যখন দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিজের খাস ড্রয়িংরুমের সন্তানের সমকক্ষ ভাবেন, তখনই কেবল এমন অনানুষ্ঠানিক ও আপন ভাষার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তিনি শিক্ষার্থীদের পর ভাবেননি, ভেবেছেন নিজের সন্তানের মতো সুকোমল। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে সামান্য বৃষ্টিতে ভিজলে শিক্ষার্থীরা যাতে অসুস্থ হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ না হারায়, সেই গভীর উদ্বেগ থেকেই তিনি এই তুলনাটি টেনেছেন। একই সাথে তিনি কিন্তু সাথে সাথেই আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে যথোপযুক্ত পদক্ষেপও নিয়েছিলেন।

২০০১-০৬: শিক্ষা খাতের সেই ঐতিহাসিক সংস্কারক

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের এই আন্তরিকতা কিন্তু নতুন কিছু নয়। যারা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস জানেন, তারা ভালো করেই অবগত আছেন যে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবদান ছিল বৈপ্লবিক।

সেই সময়ে দেশের শিক্ষা খাতে অন্যতম বড় অভিশাপ ছিল 'পরীক্ষায় নকল'। মন্ত্রী মিলন নিজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে নকল প্রতিরোধ করেছিলেন এবং নকলমুক্ত পরীক্ষা গ্রহণের এক নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর কঠোর পদক্ষেপের ফলেই সে সময় মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়েছিল এবং প্রশ্ন ফাঁসের অপসংস্কৃতিতে শক্ত লাগাম টানা সম্ভব হয়েছিল। এছাড়া নারী শিক্ষার প্রসার, প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল-কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের মানোন্নয়নে তাঁর সেই সময়কার গৃহীত নীতিগুলো আজও স্মরণীয়।

 গত ৫ মাসের বিপ্লব: ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের পর, গত ৫ মাসে আ ন ম এহসানুল হক মিলন শিক্ষা খাতে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিশৃঙ্খল শিক্ষা কারিকুলাম, প্রশ্নবিদ্ধ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত করতে তিনি দ্রুত বেশ কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন:

১. অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ:শিক্ষা খাতের সরকারি কর্মকর্তাদের রান্নাবান্না শেখা বা কচুরিপানা কাটার মতো অহেতুক প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকার প্রমোদভ্রমণ কঠোরভাবে বন্ধ করেছেন। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অর্থের এমন অপচয় আর বরদাশত করা হবে না।

২. জটমুক্ত শিক্ষাবর্ষ ও আধুনিক কারিকুলাম: বিগত শিক্ষাবর্ষের সেশন জট কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। একই সাথে যুগোপযোগী ও আনন্দময় শিক্ষার (learning with happiness) দিকে জোর দিয়ে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পারিবারিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষাকে সিলেবাসে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

৩. বৃত্তি ব্যবস্থায় সমতা: মেধার বৈষম্য দূর করতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের জন্যও ২০% বৃত্তি কোটা বরাদ্দ করার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

৪. শিক্ষা খাতের যৌক্তিক সংস্কার: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে বিগত সরকারের কারসাজি রোধে এবং দলবাজিমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়তে তিনি আপসহীন ভূমিকা পালন করছেন।

সমালোচনা হোক, তবে সত্য জেনে

আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অন্যতম বড় ব্যাধি হলো ‘কনটেক্সট’ বা প্রেক্ষাপট ছাড়া উক্তি বিচার করা। সস্তা লাইক-কমেন্ট ও ভিউয়ের আশায় একটি ইতিবাচক বা সাধারণ পারিবারিক আবেগের আলাপকে রাজনৈতিক বা নেতিবাচক রঙ দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা ভাবার সময় এসেছে।

শব্দ চয়নটি হয়তো আনুষ্ঠানিক (formal) ছিল না, কিন্তু এর ভেতরের উদ্দেশ্যটি ছিল শতভাগ কল্যাণকামী ও স্নেহপূর্ণ। শাসন বা স্নেহের ছলে মা-বাবা সন্তানকে অনেক কথাই বলেন, যা বাইরের কেউ বললে অপরাধ হতো। কিন্তু শিক্ষক এবং অভিভাবকের স্থানটি চিরকালই ভিন্ন।

যিনি নিজের পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শিক্ষা খাতের শুদ্ধাচার ও মেধা লালনের পেছনে ব্যয় করেছেন, সেই এহসানুল হক মিলনের মতো একজন একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিকের আন্তরিকতাকে সস্তা ট্রলের শিকার বানানো চরম অন্যায়। শিক্ষার্থীদের প্রতি এই পরম মমতা এবং নিজের সন্তানের কাতারে এনে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার এই প্রয়াসকে সাধুবাদ জানানোই শ্রেয়। নেতিবাচকতার চশমা খুলে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়—এটি কটাক্ষ ছিল না, ছিল এক পরম অভিভাবকের স্নেহের শাসন ও গভীর আকুলতা।

লেখক:

খাতুনে জান্নাত 
শিক্ষক ও গবেষক
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও IFSCS 
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT