বগুড়ার সারিয়াকান্দির চরে মাদক বিরোধী অভিযানের নামে এক নারীসহ কয়েকজনকে লাঠি দিয়ে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে কাজলা ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। ওই অভিযানে চেয়ারম্যানের সাথে থাকা লোকজন ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
গতকাল সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে উপজেলার কাজলা ইউনিয়নের শাহজালাল বাজার এলাকায় এই রকমের একটি মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন চেয়ারম্যান এ.এস এম রফিকুল ইসলাম। ওই সময়ে চেয়াম্যানের সঙ্গে আরও ছিলেন সারিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক এবং কাজলা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহিদুল ইসলাম। তিনিও এই মারধরে অংশ নেন বলে জানিয়েছেন প্রতক্ষ্যদর্শীরা।
অভিযান চলাকালীন ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চেয়ারম্যন ও তার লোকজন কয়েকজন মাদক দ্রব্য সেবনকারী ও বিক্রেতাকে ধরে প্রথমে তাদেরকে কান ধরতে বলেন। এর পর লাঠি দিয়ে পিঠিয়ে মাদক সেবন এবং বিক্রি না করার জন্য স্বীকারোক্তি আদায় করেন। এরপর তাদেরকে কান ধরে উঠবস করানো হয়। একজনকে মাটিতে নাকে খত দিতে বাধ্য করা হয় এবং তার মাথায় চোলাই মদ ঢেলে দেওয়া হয়। ওই ব্যক্তির নাম পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি।
তবে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, শাহজালাল বাজার এলাকার বাসিন্দা ও ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ শ্রী রিপন রবিদাসকে (৪২) মাদকসেবনের অভিযোগে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় কান ধরে উঠবস করান চেয়াম্যান। পরবর্তীতে রিপনকে তওবা পড়ান এবং লাঠি দিয়ে মারধর করেন চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। ওই সময় রিপনের স্ত্রী সন্ধ্যা রানীর বাড়িতে যান চেয়ারম্যান ও তার লোকজন। সেখানে রিপনের স্ত্রীকে সবার সামনে লাঠিপেটা করেন চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া ভবিষ্যতে মাদক বিক্রি না করার জন্য স্বীকারোক্তি নেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সন্ধ্যা রানীর এক স্বজন বলেছেন, রিপন রবিদাস দাম্পত্য কলহের কারণে অনেক দিন হলো তার স্ত্রীর সঙ্গে থাকেন না। সন্ধ্যার আগে টুকটাক গাঁজা বিক্রি করলেও এখন আর বিক্রি করেন না। তারপরেও তাকে সবার সামনে মারধর করেছেন চেয়ারম্যান।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বিএনপি নেতা মহিদুল ইসলামের সঙ্গে।
তিনি জানান, ঘটনার সময় চেয়ারম্যান একটু উগ্র হয়ে গেছিলেন। জনগণকে সামলাতে গিয়ে আমিও একটু অংশগ্রহণ করছি। এটা ভুল হয়ে গেছে। প্রথম ও শেষ বারের জন্য ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন। আর ওই নারীকে পিঠানোর সময় আমি ওখানে ছিলাম না। আপনারা ভিডিওতে দেখতে পারবেন।
একই কথা বলেছেন কাজলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এ.এস এম রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, মাদকের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ভুল হয়ে গেছে। আপনারা আর এটা নিয়ে আগায়েন না। এখানেই শেষ করে দেন। যাদের লাঠি দিয়ে পেটানো হলো তাদের অপরাধ কি ছিল এমন প্রশ্নে ইউপি চেয়ারম্যান বলেছেন, ওরা মাদক সেবন করতো। ওরা যেসব খায়।
এই বিষয়ে সারিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা( ওসি) আ. ফ. ম আছাদুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, " বিষয়টি আমি ফেসবুকে দেখেছি। একটা ভালো কাজ করতে গিয়ে কেউ আইন হাতে তুলে নিতে পারেন না। আমি বিষয়টি ইউএনও স্যারকে জানিয়েছি।"চেয়ারম্যান রফিকুলের সাথে আমি নিজে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন বিষয়টি ভুল হয়েছে, আর করবেন না। মাদক দ্রব্য বিরোধী প্রচারণা চালাতে গিয়ে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না, বলেন ওসি আছাদুজ্জামান।
একজন ইউপি চেয়ারম্যান এই রকমের মোরাল পুলিশিং করতে পারেন কিনা জানতে চাইলে সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, " বিষয়টি স্থানীয়দের মাধ্যমে আমি জেনেছি। ভিডিওগুলো আমি এই মাত্র দেখলাম। এই বিষয়ে আমি আজই চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠাবো। সেই সাথে তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করে দিব আজকেই। তদন্তের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে," বলেন ইউএনও।