একজন সরকারি গাড়িচালকের চাকরি। নির্ধারিত বেতন-ভাতা, সীমিত আয় এবং সেই আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই চাকরির আড়ালে যদি রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট, জেলা শহরে মূল্যবান জমি, নিজ গ্রামে নির্মাণাধীন বিলাসবহুল বহুতল ভবন, নিয়োগ-বাণিজ্য, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং ধারাবাহিক অসদাচরণের অভিযোগ সামনে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এসব সম্পদের উৎস কোথায়? কীভাবে একজন গাড়িচালককে ঘিরে এমন একটি প্রভাব বলয় গড়ে উঠল, যা নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা চলেছে সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে?
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের গাড়িচালক মো: সাখাওয়াত হোসেনকে ঘিরে সম্প্রতি নতুন করে সামনে এসেছে এমনই একাধিক অভিযোগ। বিভাগীয় নথি, সাময়িক বরখাস্তের সরকারি আদেশ, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে নিয়োগ-বাণিজ্য, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং অসদাচরণের অভিযোগ। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং একাধিক বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলছে।
এই প্রতিবেদনের জন্য ফায়ার সার্ভিসের বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, সাখাওয়াত হোসেনকে কেবল একজন গাড়িচালক হিসেবেই দেখা হতো না। বিভিন্ন সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়িচালকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই পরিচিতিকেই কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন। একপর্যায়ে নিয়োগ, বদলি ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে তার মাধ্যমে কাজ করানো সম্ভব, এমন ধারণা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, চাকরি প্রত্যাশীদের কাছে সাখাওয়াত হোসেন এমন ধারণা দিতেন যে, ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সেই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসের বিনিময়ে অর্থ লেনদেন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের কয়েকটি বিভাগীয় তদন্তের আওতায় এলেও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
বিভাগীয় নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই সাখাওয়াত হোসেনকে ঘিরে নানা অভিযোগ ওঠে। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার, শিক্ষাগত সনদ নিয়ে প্রশ্ন, শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব ঘটনার পরও অধিকাংশ সময় তিনি চাকরিতে বহাল ছিলেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নও এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
ফায়ার সার্ভিসের বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোনো অভিযোগগুলো পুনরায় পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম, প্রশাসনিক অসদাচরণ, সম্পদের উৎস এবং পূর্বের বিভাগীয় মামলার নথি একসঙ্গে পর্যালোচনা শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা হয় এবং সাখাওয়াত হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল যায়যায়দিনকে বলেন, অধিদপ্তরের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ কার্যক্রম চলাকালে অনুমতি ছাড়া দায়িত্বস্থল ত্যাগ করে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে প্রথমে সাখাওয়াত হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে নারী-সংক্রান্ত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে প্রাথমিক তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। আগের সাময়িক বরখাস্তের আদেশও বহাল রয়েছে।
মহাপরিচালক আরও বলেন, বর্তমানে দুটি বিষয়েই তদন্ত চলছে। নিয়োগ-বাণিজ্য ও অন্যান্য অসদাচরণের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কমিটির মতামত পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণে বদ্ধপরিকর।
বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি অনুসন্ধানে সামনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ড্রাইভার সাখাওয়াত হোসেনের নামে বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা স্থাবর সম্পদের তথ্য। সরকারি চাকরির একজন গাড়িচালকের আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুর-সংলগ্ন বছিলা, শেওড়াপাড়া এবং বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় তার নামে বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা একাধিক ফ্ল্যাট, জমি ও নির্মাণাধীন ভবনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এখন এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সরকারি চাকরির ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
রাজধানীর বছিলা এলাকায় একটি আবাসিক প্রকল্পে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় রিয়েল এ্যস্টেটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান বাজারদরে ফ্ল্যাটটির মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। যদিও এ মূল্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকায় প্রায় ১৪৫০ (এক হাজার চারশত পঞ্চাশ) বর্গফুট আয়তনের আরেকটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বর্তমান বাজারদরে এর মূল্য এক কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ফ্ল্যাট দুটির নিবন্ধিত মালিক কে, কীভাবে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে এবং অর্থের উৎস কী।
রাজধানীর বাইরে বরিশালেও অনুসন্ধানে মিলেছে একাধিক সম্পদের তথ্য। বরিশাল শহরের আলেকান্দা এলাকায় একটি মূল্যবান জমির তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি শহরের আরও কয়েকটি এলাকায় তার নামে বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদের তথ্যও যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ওটরা ইউনিয়নের কেশবকাঠি গ্রামে নির্মাণাধীন একটি বহুতল ডুপ্লেক্স ভবন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর নির্মাণাধীন ভবনটির নিচতলার কাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় তলার কাজ প্রায় সম্পন্ন এবং তৃতীয় তলায় চলছে নির্মাণকাজ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এলাকায় এ ধরনের ভবন খুবই বিরল। ভবনের নকশা, নির্মাণ সামগ্রী ও আয়তন বিবেচনায় অনেকেই এটিকে ভীষণ ব্যয়বহুল নির্মাণ বলে মনে করছেন। কয়েকজনের ধারণা, নির্মাণব্যয় কয়েক কোটি টাকা হতে পারে।
অনুসন্ধানে উঠে আসা সব সম্পদের নিবন্ধনপত্র প্রতিবেদকের হাতে না এলেও, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, স্থানীয় সূত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সম্পদ গুলোর অস্তিত্ব প্রাথমিকভাবে যাচাই করা হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তকারীরাও এসব তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের কাজ করছেন।
বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি সম্পদের বিষয়টি অন্য একটি সংস্থাও অনুসন্ধান করছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সংস্থাটির নাম প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের কাছে মূল বিষয় শুধু সম্পদের পরিমাণ নয়। সম্পদ অর্জনের সময়কাল, অর্থের উৎস, মালিকানা, ব্যাংক লেনদেন এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিই যাচাই করা হচ্ছে। কোনো অভিযোগকে আগেভাগে সত্য বা মিথ্যা বলা হচ্ছে না। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
ফায়ার সার্ভিসের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এলেও সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতে পারতো। তাদের ভাষ্য, একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অভিযোগ উঠলে শুধু তার ব্যক্তিগত ভূমিকা নয়, প্রতিষ্ঠানের তদারকি ব্যবস্থাও মূল্যায়নের দাবি রাখে। তবে এ মতামত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমান অনুসন্ধানে শুধু সাম্প্রতিক অভিযোগ নয়, ড্রাইভার সাখাওয়াতের চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগ এবং সেসব বিষয়ে গৃহীত বিভাগীয় ব্যবস্থার নথিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের লক্ষ্য, বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে আলাদাভাবে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করে অভিযোগ গুলোর বাস্তবতা নিরূপণ করা।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অভিযোগকারীদের মধ্যে কয়েকজন সরাসরি ক্যামেরার সামনেও বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে চাকরি, বদলি এবং প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ লেনদেনের চেষ্টা করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে তাদের বক্তব্যও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বিভাগীয় তদন্তে শুধু লিখিত অভিযোগ বা পূর্বের নথিই নয়, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেন, সম্পদের উৎস এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা কোনো অভিযোগকে আগেভাগে সত্য বা মিথ্যা ধরে না নিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই মূল্যায়নের চেষ্টা করছেন।
প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবারই মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
একজন সরকারি গাড়িচালককে ঘিরে নিয়োগ-বাণিজ্য, প্রশাসনিক প্রভাব, বিতর্কিত সম্পদ এবং ধারাবাহিক বিভাগীয় অভিযোগের এই ঘটনাপ্রবাহ এখন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে তদন্ত এখনো চলমান। তদন্ত শেষে যে তথ্য-প্রমাণ সামনে আসবে, তার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে অভিযোগ গুলোর বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।