ঢাকা | সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক কোটি দক্ষ বাংলাদেশি: অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দিগন্ত

author
ব্যারিস্টার মির্জা জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত : ১৮ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ৩:১৮
ad003
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থানের অপেক্ষায়, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে দক্ষ কর্মীর তীব্র সংকট। এই দুই বাস্তবতাকে একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় কৌশলের মাধ্যমে সংযুক্ত করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।

বিগত কয়েক দশকে তৈরি পোশাক শিল্প এবং প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনীতি আমাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, মূল্যস্ফীতি, উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব এবং সীমিত বিনিয়োগের কারণে নতুন অর্থনৈতিক চিন্তার প্রয়োজনীয়তা এখন আর বিতর্কের বিষয় নয়।


বিশ্বের উন্নত দেশগুলো দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, পরিবহন ও আতিথেয়তা খাতে লক্ষ লক্ষ দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারে, তাহলে এই বৈশ্বিক শ্রমবাজার আমাদের জন্য এক অসাধারণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে অদক্ষ শ্রম রপ্তানির ওপর নির্ভর করেছি। ফলে প্রবাসীদের আয়ের বড় অংশ সীমিত থেকেছে। এখন সময় এসেছে দক্ষতা, ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সনদ এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উচ্চ আয়ের শ্রমবাজারে প্রবেশ করার। একজন দক্ষ কর্মীর বিদেশে আয় একজন অদক্ষ কর্মীর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

তবে শুধু জনশক্তি পাঠালেই হবে না। নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করতে হবে। দালালনির্ভর ব্যবস্থা বন্ধ করে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্বল্প সুদের অভিবাসন ঋণ, প্রশিক্ষণ সহায়তা, কর্মসংস্থান বীমা এবং বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।


প্রবাসীদের পাঠানো অর্থকে শুধু ভোগে নয়, উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করাও জরুরি। ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে প্রবাসী বিনিয়োগের জন্য বিশেষ নীতি ও নিরাপদ বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

একটি সুদূরপ্রসারী জাতীয় লক্ষ্য হতে পারে আগামী দশ বছরে আন্তর্জাতিক মানের বিপুলসংখ্যক দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী তৈরি করা। এর জন্য শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং বেসরকারি খাতকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং একটি জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশল।


বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। এই সম্পদকে দক্ষতায় রূপান্তর করতে পারলে আমাদের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়বে, দারিদ্র্য কমবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।

আজ প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জাতীয় ঐকমত্য। দক্ষ মানবসম্পদই হতে পারে আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি, আর বৈধ অভিবাসন হতে পারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সবচেয়ে বড় সুযোগ।

লেখক পরিচিতি-
আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ
[email protected]
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT