নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে বন্যায় ফসলহানি, ঋণের কিস্তির চাপ, হাওরে মাছ ধরতে না পারা এবং পুলিশের মামলার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে মানসিক চাপে স্ট্রোকে এক জেলের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার। নিহত বিকাশ মিয়া (৪৯) উপজেলার মাঘান কুড়েরপাড় গ্রামের আহম্মেদ সাইরেলের ছেলে।
রোববার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলার মাঘান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিকাশ মিয়ার স্ত্রী সনজিতা আক্তার এ অভিযোগ করেন। এ সময় নিহতের বাবা আহম্মেদ সাইরেলসহ পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় জেলেরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সনজিতা আক্তার বলেন, চলতি মৌসুমে তাঁর স্বামী হাওরে পাঁচ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। আকস্মিক বন্যায় চার একর জমির ধান নষ্ট হয়ে যায়।
কৃষিঋণের বোঝা সামাল দিতে পরে আবার ঋণ করে মাছ ধরার জাল কেনেন। কিন্তু হাওরে মাছ ধরতে না পারায় সেই ঋণও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে জাল জব্দ এবং বিপুলসংখ্যক জেলের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর গ্রেপ্তারের ভয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন বিকাশ।
সংসারের দায়, ঋণের চাপ ও গ্রেপ্তারের আতঙ্কে তিনি চরম মানসিক বিপর্যয়ে ভুগছিলেন। সেই চাপ থেকেই স্ট্রোকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।
তিনি আরও বলেন, “আমার স্বামী আর ফিরে আসবে না। এখন সন্তানদের নিয়ে কীভাবে সংসার চালাব, জানি না। হাওরে মাছ ধরার ওপর স্থানীয়ভাবে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আমার স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চাই।”
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ধান চাষ ও মাছ ধরার প্রস্তুতির জন্য এনজিও এবং মহাজনের কাছ থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন বিকাশ মিয়া। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হতো। বর্ষা মৌসুমে বড় ছেলে, কলেজপড়ুয়া দিদারকে সঙ্গে নিয়ে হাওরে মাছ ধরে ঋণ শোধ ও সংসারের ব্যয় নির্বাহের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু স্থানীয়ভাবে মাছ ধরায় বিধিনিষেধ থাকায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
পরিবারের ভাষ্য, গত ১১ জুলাই হাওরে মাছ ধরতে গেলে বিকাশ মিয়াসহ কয়েকজন জেলের খনা জাল জব্দ করে পুলিশ। পরে এ ঘটনায় ৬৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ১০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করা হয়।
মামলার পর গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ১৪ জুলাই তিনি পাশের সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
সেখানে গত শুক্রবার বিকেলে স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তাঁকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, সরকারি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হলেও বাস্তবে হাওরে মাছ ধরতে না দেওয়ায় কয়েক হাজার জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকেই জীবিকার তাগিদে গোপনে মাছ ধরতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে পড়ছেন।
স্থানীয় জেলে মো. ওসমান গনি বলেন, “মামলার পর গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেক পুরুষ এখন বাড়ির বাইরে রয়েছেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরও মাছ ধরতে না দেওয়ায় আমরা চরম সংকটে পড়েছি।”
আরেক জেলে মো. মিজানুর রহমান বলেন, “আর কিছুদিন পর পানি কমে গেলে মাছ জলমহালে চলে যাবে। তখন ইজারাদার লাভবান হবে, কিন্তু জেলেরা না খেয়ে থাকবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন টুকু এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবরের উদ্যোগে মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলার হাওরে ৭৫ হাজার মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। পোনা বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে স্থানীয়ভাবে জেলেদের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তবে জেলেদের দাবি, সরকারি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২৮ জুন শেষ হয়েছে। ফলে তারা বৈধভাবে মাছ ধরার অধিকার ফিরে পেয়েছেন। এ কারণে স্থানীয়ভাবে আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়ে জেলে ও প্রভাবশালী মহলের মধ্যে কয়েক দফা উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, “বিকাশ মিয়ার মৃত্যুর খবর আমার জানা নেই। মামলার পর মামুন ও জাকির নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর ওই এলাকায় পুলিশ আর কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, “২৮ জুনের পর থেকে মাছ ধরায় কোনো সরকারি নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে হাওরের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।”