একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদান করে না, গড়ে তোলে একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর সুবল-আফতাব উচ্চ বিদ্যালয় তেমনই একটি বিদ্যাপীঠ, যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে অসংখ্য কৃতী নাগরিক গড়ে তুলেছে। শিক্ষা, ঐতিহ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দাউদকান্দি তথা কুমিল্লার অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে। গলিয়ারচর গ্রামের শিক্ষানুরাগী মৌলভী ওয়াজউদ্দীন আহমেদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি মক্তব থেকেই শিক্ষার প্রথম প্রদীপ প্রজ্বলিত হয়। ১৯১৯ সালে এটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং ১৯৪২ সালে তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রয়াত ডা. শামসুল হুদার অগ্রণী ভূমিকার পাশাপাশি স্বর্গীয় বাবু সুবল চন্দ্র সাহা ও মরহুম আফতাব উদ্দিন আহমেদের জমি ও আর্থিক সহযোগিতা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় গৌরীপুর সুবল-আফতাব উচ্চ বিদ্যালয়।
প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসের আরেকটি গৌরবময় অধ্যায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ, দান এবং আন্তরিক সহযোগিতায় গড়ে ওঠা বিদ্যালয়টি আজও সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও সামাজিক ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত।
দীর্ঘ এই পথচলায় বিদ্যালয়টি শুধু শিক্ষাদানেই নয়, দেশ গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, পাঁচবারের সংসদ সদস্য ও দুইবারের মন্ত্রী এম. কে. আনোয়ার; পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. শফিকুল ইসলাম; ভাষাসৈনিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণু বিজ্ঞানী ড. জসীম উদ্দিন আহমেদ; বিচারপতি তোফাজ্জল হোসেন এবং সাবেক দুদক কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার। এ ছাড়া এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য ইউএনও, সহকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা, বিচারক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতৃত্বেও রয়েছেন এ প্রতিষ্ঠানের বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তাঁদের সাফল্য বিদ্যালয়ের পাশাপাশি দাউদকান্দি ও কুমিল্লা অঞ্চলেরও গর্ব।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায়ও আধুনিকতার ছোঁয়া এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৪ সালে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং একই বছরের ২৪ নভেম্বর চালু হয় বিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট। প্রাক্তন শিক্ষার্থী এস. এম. নাহিদুর রহমানের নির্মিত এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই পরীক্ষার রুটিন, ফলাফল, ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন শিক্ষা-সেবা পাচ্ছে। পাশাপাশি অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১ হাজার ৭৩৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এর মধ্যে ৯৫০ জন ছেলে এবং ৭৮৫ জন মেয়ে। ৩৬ জন শিক্ষক ও ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে দুটি বিজ্ঞানাগার, একটি আইসিটি ল্যাব, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এবং পাঁচটি একাডেমিক ভবন। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্য রয়েছে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের মাঠের পাশাপাশি একটি বৃহৎ খেলার মাঠ।
প্রধান শিক্ষক মো. সেলিম প্রতিনিধি সাইফুল ইসলামকে জানান, শিক্ষার গুণগত মান, শৃঙ্খলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে বিদ্যালয়টি ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করে আসছে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৩৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করে এবং প্রতিষ্ঠানটি দাউদকান্দি উপজেলায় প্রথম স্থান লাভ করে। একই বছরে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ১৪ জন ট্যালেন্টপুলসহ মোট ২৬ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি অর্জন করে উপজেলায় শীর্ষস্থান অর্জন করে। এ ছাড়া এসএসসি বৃত্তি লাভ করে পাঁচজন শিক্ষার্থী। ধারাবাহিক ভালো ফলাফল, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের বহুমুখী সাফল্যের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি নিজস্ব ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে এগিয়ে চলেছে।
শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে গৌরীপুর সুবল-আফতাব উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি ঐতিহ্য, একটি ইতিহাস এবং একটি প্রেরণার প্রতীক। মক্তব থেকে আধুনিক বিদ্যাপীঠে রূপান্তরের এই গৌরবগাথা আজও নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। অতীতের গৌরব, বর্তমানের সাফল্য এবং আগামীর প্রত্যয়কে ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলেছে আরও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে।