প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আলোচিত রাষ্ট্রপতি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন পলাতক সরকারের সময়। আর বিদায় নেন নির্বাচিত সরকারের আমলে। মাঝখানে আবার ১৮ মাস ছিল অন্তর্র্বর্তী সরকার। এই তিন আমলে তিন সরকারের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনকে বসবাস করতে হয়েছে। বা নিজেকে মানিয়ে চলেছেন। অনেকটা গিরগিটির মতো বারবার রঙ পাল্টিয়েছেন। কখনো ইচ্ছায়। কখনো আবার অনিচ্ছায়। সামনে আবারো রঙ পাল্টাবেন না এর কি নিশ্চয়তা আছে? হয়তো দেশের সীমানা পার হলেই বলবেন, ভিন্ন কথা। সাম্প্রতিক সময়ের সব বাস্তবতা অস্বীকার করে বলে বসতে পারেন, অতীতই ছিল একমাত্র সত্য। হয়তো আমার ধারণা সত্য নাও হতে পারে। তারপরও এই লোককে বিশ্বাস করা বোধহয় ঠিক কাজ হবে না।
সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন স্বপদে থাকা বা না থাকা নিয়ে বিএনপি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখিয়েছে। শুরুতেই বিএনপি যদি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ চাইত তাহলে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হতো কি না সন্দেহ ছিল। অন্তর্র্বর্তী সরকার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্ররা চাইছিলেন না নির্বাচন। তাদের আকাঙ্খা ছিল, অনির্বাচিত সরকারের দীর্ঘ শাসন। তাই বিএনপি ওই সময় সাহাবুদ্দিনকে তার পদ থেকে সরাতে বেকে বসে। বিএনপি তাকে প্রেসিডেন্ট পদে রেখে নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে যেতে চেয়েছে। কেননা দীর্ঘদিন সরকারের বাইরে থাকায় বিএনপির জন্য নির্বাচন ছিল জরুরি। তারা জানত নির্বাচন হলেই তাদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। আর যদি অন্তর্র্বর্তী সরকার এবং তার মিত্ররা সাহাবুদ্দিনকে সরাতে পারে তাহলে নির্বাচনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে। এ কারণে বিএনপি সাহাবুদ্দিনকে প্রেসিডেন্ট রাখার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে নেয়। বিপরীতে অন্তর্র্বর্তী সরকারের সুপ্ত বাসনা ছিল, দীর্ঘ সময় সরকারে থাকার। অন্তর্র্বর্তী সরকারের সদস্যদের অনেকেই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ইচ্ছে ব্যক্ত করেছে, জনগণ চাইলে তারা পাচ বছরের অধিক সরকারে থাকতে চায়। এটা বিএনপি বুঝতে পেরেছিল। তাই বিএনপি প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনের বিদায় কোনো ভাবেই চাইছিল না।
নির্বাচন পরবর্তীতে বিএনপি সরকার গঠন করার পর, নির্বাচনে পরাজিত গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত সরকারকে ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। আরেক দিকে পলাতক সরকারের দল দেশে নৈরাজ্যকর বক্তব্য রাখছে। এই সব কারণে বিএনপি তার অবস্থান পোক্ত করার জন্য পলাতক সরকারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সরিয়ে দেয়া হয়। প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও বিএনপি যথা সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে বিএনপি এই ক্ষেত্রে একটা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। বুর্জুয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতি এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
২০২৪-এর জুলাইয়ে মধ্যভাগে বিগত হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে গোটা দেশ কেপে উঠে। এক সময় বাংলাদেশর বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিও ছাত্রদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে রাজপথে নেমে যায়। নামে জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ বাদে ছোট, বড় সব দল নামে রাজপথে। নামে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা সবাই। জুলাইয়ের শেষভাগ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনকারী এবং সরকারী বাহিনী মুখোমুখি। অবশেষে ৫ আগস্ট, বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরাজিত হয়ে সাবেক প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবং তিনি ও তার মন্ত্রীদের অধিকাংশ দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। ৫ আগস্টের পর দেশে সরকার বলে আর কিছুই ছিল না। শুধু ছিলেন প্রেসিডেন্ট।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। ওই দিন বঙ্গভবনে সেনা প্রধান ও অন্যান্য সামরিক প্রধানরা উপস্থিত হয়ে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বা জরুরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। এর প্রেক্ষিতে সেনা প্রধান ওয়াকারুজ্জামান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সেনানিবাসে বৈঠক করেন। আলোচনা শেষে দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় রাজনৈতিক দল ও সামরিক বাহিনী প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি প্রধান মন্ত্রীর পদত্যাগের কথা জানান। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে তিনি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপৃম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নেন। সুপৃম কোর্টের মতামতের ভিত্তিতে তিনি নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠন ও তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। এই পদক্ষেপের কারণেই দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
তবে সেই সময় বৈষম্য বিরোধী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ একটা অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠনে অস্থির হয়ে ওঠে। তাদের পেছন থেকে সমর্থন দেয় জামায়াতে ইসলামী এবং এবি পার্টি। এই গোষ্ঠী তাদের সঙ্গে সাথী করে নেয়, নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসকে। জানি না কখন কিভাবে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন কারীদের সঙ্গে ড. ইউনূসের যোগাযোগ হয়। বা কার মাধ্যমে হয় সাধারণ জনগণ কিছুই জানে না। হয়তো কোনো দিন জানবেও না। সেই সময় বৈষম্য বিরোধী সংগঠনের নেতারা, সরকার গঠনে অস্থির হয়ে ওঠে। সেই সময় দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা করেছে বলে মনে হয় না। শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বরাবর ছিল। এমনকি সরকার গঠনের বিষয়টি সম্পর্কেও অবহিত করা হয়। ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন এবং জোটবদ্ধ রাজনীতি দেখে দেশের মানুষের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তবে সেই সময় সরকার গঠন করার ক্ষেত্রে সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন ছিল তাদের কাছে কাক্সিক্ষত জন। তাই তারা সাহাবুদ্দিন সাহেবের পদত্যাগের কথা একটি বারের জন্যও উচ্চারণ করেনি।
সরকার গঠন করার পর বৈষম্য বিরোধী সংগঠন এবং সহযোগীদের কাছে মনে হয়, সাহাবুদ্দিনের আর প্রয়োজন নেই। তাই কিছুদিনের মধ্যেই সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি নিয়ে মাঠে নামে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র সংগঠনে সাহাবুদ্দিনর পদত্যাগে অনড় হয়ে পড়ে। তারা অভিযোগ আনেন, সাবেক সরকারের আমলে নির্বাচিত হওয়ায় তাকে পদত্যাগ করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষোভ ও হুমকি প্রকাশ করে। পদত্যাগ না করলে কঠিন আন্দোলনে যাবে তারা।
সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনকে সরানোর মূল উদ্দেশ্যে ছিল অন্য জায়গায়। তাদের পরিকল্পনা ছিল, প্রেসিডেন্টকে সরাতে পারলে তাদের পছন্দের এক জন লোককে নিয়োগ দেবে। যে কি না সেনা প্রধান থেকে সব স্বাধীনতার পক্ষের সেনা কর্মকর্তাদের নিজেদের লোকদের জায়গা মতো বসাবে। যাতে নির্বিঘ্নে বছরের পর সরকার চালানো যায়। এটা বিএনপি উপলব্ধি করতে পারে। তাই তারা সাহাবুদ্দিনকে রাখার ব্যাপারে অনড় অবস্থান নেয়।
বৈষম্য বিরোধী সংগঠনের নেতারা এবং তাদের মিত্রদের প্রধান শত্রু হয়ে যায়। প্রতিনিয়ত তাকে গালমন্দ করতে থাকে। এমন অবস্থায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। এক সময় ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বলেন, নিজেকে অপদার্থ বা অপমানিত বোধ করছেন বলে মন্তব্য করেন। তবে তিনি সেই সঙ্গে এই ইচ্ছাও প্রকাশ করেন, তিনি ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকতে আগ্রহী। এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নবগঠিত সরকারের মন্ত্রী পরিষদকে তিনি শপথবাক্য পাঠ করান।
নির্বাচিত বিএনপি সরকারের ৬ মাস পার হওয়ার পর বিভিন্ন পত্রিকার খবরে প্রেসিডেন্ট আবারো আলোচিত হয়ে ওঠেন। সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়, লন্ডনে চিকিৎসার সময়ে টেলিফোনে সাবেক প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। লন্ডন থেকে সাহাবুদ্দিন সাহেব শেখ হাসিনার কথা বলেছেন কি না, তা তারাই জানেন। যাই হোক অবশেষে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পেয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে সংসদ অধিবেশনে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হবে। বিভিন্ন সময় বিএনপি সরকার আমলে মাঝপথে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হয়েছে। এবার আরেকবার হতে যাচ্ছে। তাই বিএনপিকে মাথায় রাখতে সঠিক লোককে যেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয়। যার দেশ, দেশের মানুষ এবং দলের প্রতি বিশ্বস্ত। রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার কারণে দলের বিপক্ষে চলে না যান। বিএনপিতে এরকমটা ঘটেছে। তাই ভেবেচিন্তে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্বাচন করতে হবে।
বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে সাহসী এবং দলের প্রতি বিশ্বস্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি অন্যতম, যিনি অভ্যুত্থানের নেতা সেনা প্রধানকে বরখাস্ত করেছিলেন। সেই সময়কার সেনা প্রধান জেনারেল নাসিমকে বরখাস্তের মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছিলেন। তবে ঐ সময় সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান, পিএসও মেজর জেনারেল মোহাম্মদ সুবিদ আলী ভূঁইয়া, সিজিএস মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, মেজর জেনারেল এম এ মতিন রাষ্ট্রপতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এরা পাশে থাকায় জেনারেল নাসিম সুবিধা করতে পারেননি। তারপরও বলতে হয় প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস সাহসী ছিলেন। আর ছিল তার দেশ এবং সরকারের প্রতি আনুগত্য। এইসব বিবেচনা করে যোগ্য এক জনকে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করাই হবে প্রাজ্ঞতা।
লেখক-

শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক