শিশুর হাতে বই তুলে দিয়ে কেবল পাঠাভ্যাস নয়, বরং মুক্তচিন্তা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ। শিশুদের অন্তর্নিহিত মেধা ও কল্পনাশক্তির উন্মেষ ঘটাতে ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে অনুষ্ঠিত হলো দিনব্যাপী এক ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন স্বপ্নের উৎসব (READ-A-THON)। পাঠাভ্যাস গঠন ও সৃজনশীলতার বিকাশকে কেন্দ্র করে সাজানো এই কর্মযজ্ঞে অংশ নেয় শতাধিক ক্ষুদে শিক্ষার্থী।
জ্ঞানচর্চা, কল্পনাশক্তির বিকাশ, ভাষাগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির সমন্বয়ে সাজানো এই আয়োজন শিশুদের কাছে হয়ে ওঠে আনন্দ, শিক্ষা ও সৃজনশীলতার এক অনন্য মিলনমেলা। দিনভর নানা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, স্টল প্রদর্শনী এবং অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যে মুখর ছিল অনুষ্ঠানস্থল। সংশ্লিষ্টদের মতে, পাঠাভ্যাসই পারে আগামী প্রজন্মকে দক্ষ, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে।
আয়োজকদের দাবি, আয়োজনটি শুধু প্রতিযোগিতা নয় বরং শিক্ষার প্রতি শিশুমনে গভীর অনুরাগ সৃষ্টিই ছিল এর মূল প্রতিপাদ্য। অনুষ্ঠানজুড়ে ফুটে ওঠে বিভিন্ন লার্নিং সেন্টারের শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভার বর্ণিল প্রকাশ। অভিভাবক থেকে শুরু করে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সকলেই উপস্থিত থেকে শিশুদের অনুপ্রাণিত করেন উদ্দীপনামূলক বক্তব্যে। সব মিলিয়ে দিনটি পরিণত হয় শিক্ষা ও সৃজনশীলতার এক স্মরণীয় মিলনমেলায়।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের লাইফ সেন্টার প্রজেক্ট এর উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানের সূচনা হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে। পরে স্বাগত বক্তব্যে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য, গুরুত্ব ও সার্বিক কার্যক্রম তুলে ধরেন লাইফ সেন্টার প্রজেক্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার (PNS & Corporate) প্রেরণা চিসিম।
তিনি বলেন, একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে কেবল একটি বই দেওয়া নয় বরং তার সামনে সম্ভাবনার অসীম দিগন্ত উন্মোচন করা। পাঠাভ্যাস শিশুদের বিশ্লেষণী সক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তা, মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাস গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। (READ-A-THON) এর মাধ্যমে আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যারা জ্ঞানকে ভালোবাসবে, প্রশ্ন করতে শিখবে এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত নানাবিধ শিক্ষামূলক ও আনন্দঘন প্রতিযোগিতা। ক্ষুদে প্রতিযোগীরা পঠন, অনুচ্ছেদ রচনা, ধাঁধা সমাধান, গল্প বলা এবং তাৎক্ষণিক কুইজ প্রতিযোগিতায় নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখে। এসব প্রতিযোগিতা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন অ্যাঞ্জেলিকা পলিন গোমেজ এবং আয়োজনের অন্যান্য দক্ষ ফ্যাসিলিটেটরবৃন্দ।
প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিভিন্ন লার্নিং সেন্টারের শিশুরা উপস্থাপন করে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। রংধনু লার্নিং সেন্টারের শিল্পীরা উদ্বোধনী নৃত্যের মাধ্যমে মঞ্চ মাতিয়ে তোলে, আলোর দিশা লার্নিং সেন্টারের খুদে শিল্পীরা পরিবেশন করে হৃদয়স্পর্শী কবিতা আবৃত্তি। সূর্যমুখী লার্নিং সেন্টার মঞ্চস্থ করে শিক্ষার গুরুত্ব ও সামাজিক শিখন বিষয়ক নাটিকা এবং চিত্তাকর্ষক পাপেট নৃত্য, আর প্রজাপতি লার্নিং সেন্টারের শিশুরা প্রাণবন্ত অ্যাকশন গানের মধ্য দিয়ে দর্শকদের মন জয় করে নেয়।
অনুষ্ঠানে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের খান মানছুরা আক্তার টুইন বলেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের মধ্যে পাঠাভ্যাস, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে বিনিয়োগই টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি। শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে নিরাপদ ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের অঙ্গীকার। তাদের প্রতিটি স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজকে একসঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চাই।
আরো বক্তব্য রাখেন শিক্ষক প্রতিনিধি নাজমা আক্তার বৃষ্টি, অভিভাবক প্রতিনিধি শিল্পী বেগম এবং শিশু প্রতিনিধি মাহফুজা ও ইশা। তাঁরা তাঁদের বক্তব্যে শিশুদের শিক্ষাজীবনে সূচিত ইতিবাচক পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস এবং লার্নিং সেন্টারে অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানস্থলে শিশুদের নিজ হাতে তৈরি বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী ও সৃজনশীল কার্যক্রম নিয়ে আয়োজন করা হয় বিশেষ স্টল প্রদর্শনী। অতিথিরা প্রতিটি স্টল ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করেন এবং শিশুদের সৃজনশীলতা ও শিখনের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভ করেন। এই স্টলগুলো শিশুদের আত্মবিশ্বাস, কল্পনাশক্তি ও শেখার অগ্রগতির একটি প্রাণবন্ত চিত্র তুলে ধরে দর্শকদের সামনে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ শিশুদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। এ পর্বে বক্তব্য রাখেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি অ্যান্ড অপারেশন বিভাগ) মীর আব্দুল আউয়াল আল মেহেদী ,ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সহকারী পরিচালক (প্রাক প্রাথমিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা) মো. জয়নাল আবেদীন, অপারেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল বিভাগের পরিচালক লিমা হান্না দারিং। দিনব্যাপী উৎসব শেষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশুদের মাঝে পুরস্কার ও সনদপত্র বিতরণ করা হয়। আনন্দ উচ্ছ¡াস, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা এবং নতুন স্বপ্ন নিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফেরে শতাধিক শিশু। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও শিশুদের সামগ্রিক বিকাশে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে।