টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় নেত্রকোণার জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।
বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম, জেলার একমাত্র সিএনজি ফিলিং স্টেশন অচল, সিএনজিচালিত যানবাহন সংকটে বিপর্যস্ত পরিবহন ব্যবস্থা এবং হাসপাতাল, জেলা কারাগার, পুলিশ লাইন্সসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও পড়েছে সীমাহীন ভোগান্তিতে।
গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় জেলার প্রায় ৫ হাজার ৬০০ আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার, কাঠ ও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এতে সংসারের ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোণায় প্রায় ৫ হাজার ৬০০ গ্রাহকের পাশাপাশি একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন, ২৪টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং ২৯টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ রয়েছে। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় টানা ১২ থেকে ১৪ দিন ধরে জেলায় গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় রয়েছে। এর আগে আরও কয়েক সপ্তাহ ধরে নিম্নচাপের কারণে গ্রাহকরা ভোগান্তিতে ছিলেন।
গ্যাস না থাকায় শহর ও উপজেলার অধিকাংশ বাসাবাড়িতে স্বাভাবিক রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন ও সেবামূলক কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে।
জেলা সদর হাসপাতাল, পুলিশ লাইন্স, জেলা কারাগারসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিকল্প ব্যবস্থায় রান্না চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে।
জেলার একমাত্র এ.আর. খান পাঠান সিএনজি ফিলিং স্টেশনের স্টেশন ইঞ্জিনিয়ার বোরহান কবির বলেন, "প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ইনলেট প্রেসার একেবারেই শূন্য। ফলে একটি যানবাহনেও গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। স্টেশনের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।"
তিনি বলেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহনের চালকেরা বাধ্য হয়ে দূরের জেলায় গিয়ে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেখানেও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেকেই ব্যয়বহুল এলপিজি ব্যবহার করছেন।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকেরা জানান, এলপিজি ব্যবহার করায় প্রতিদিনের পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত খরচ সামাল দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে। এতে যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হচ্ছে। আয় কমে যাওয়ায় অনেক চালক গাড়ির কিস্তি পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
শহরের কয়েকজন গৃহিণী বলেন, প্রতিদিন রান্না করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কেউ এলপিজি ব্যবহার করছেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের বাসায় গিয়ে রান্না করছেন। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে।
নেত্রকোণা জেলা তিতাস গ্যাসের উপব্যবস্থাপক মো. গোলাম মর্তুজা বলেন, জাতীয় পর্যায়ে এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি জটিলতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এটি স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়। দেশীয় প্রকৌশলীদের পাশাপাশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই নেত্রকোণায়ও গ্যাস সরবরাহ চালু হবে।
তিনি আরও বলেন, "গ্রাহকদের দুর্ভোগ আমরা বুঝতে পারছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।"
এদিকে টানা দুই সপ্তাহ গ্যাসশূন্য অবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে জাতীয় গ্রিডের এমন সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় প্রতিনিয়ত জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।