ঢাকা | শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শরিকদের ক্ষোভ নিরসনের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

author
উমর ফারুক

প্রকাশিত : ১ আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:১৩
ad003
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠণ করে বিএনপি। প্রধান মন্ত্রী হিসেবে দেশের ড্রাইভিং সিটে বসেন তারেক রহমান। এরপর প্রতিটি সেকেন্ড মিনিট হয়ে ওঠে কর্মনির্ভর।দেশের মানুষকে দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবরুপ দিতে ছুটে চলেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। সরকারের কাজে বেশি মনযোগী হওয়ার দল ও দলের মিত্রদের তেমন সময় দিতে পারেননি বিএনপি প্রধান তারেক রহমান। ক্ষমতায় আসার পাচ মাস পর অবশেষে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সোমবার রাতে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসে বিএনপি। তবে সৌহার্দ্যপূর্ণ ডিনারের আড়ালেও প্রকাশ পেয়েছে দীর্ঘ দিনের জমে থাকা অসন্তোষ। শরিক দলগুলোর নেতারা সরাসরি প্রধান মন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে অভিযোগ তুলেছেনÑ ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে লড়াই করলেও সরকার গঠনের পর জোট সঙ্গীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদারিত্ব তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে এখন থেকে দুই-এক মাস পরপর শরিকদের সঙ্গে তিনি বসবেন। এতে মিত্রদের মনে আর কোন ক্ষোভ থাকবে না। সব ধরনের সংকটের নিরসন হবে।

সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত বৈঠক ও ডিনারে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর দেড় শতাধিক শীর্ষ নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ইলেকশন ও সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, আলোচনায় শুধু সৌজন্য বিনিময় নয়; জোট রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা, সরকারের পাচ মাসের কর্মকাণ্ড, প্রশাসনে শরিকদের অংশীদারিত্ব, স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলÑ সবই উঠে আসে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, শতাধিক নেতা উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য রাখার সুযোগ পান মাত্র তিন থেকে চার জন। গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রধান মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সরকার গঠনের পর পাচ মাস কেটে গেলেও বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে শরিকদের সঙ্গে কার্যকর কোনো বৈঠক হয়নি। এতে জোটের নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে সবার অবদান ছিল সমান। কিন্তু সরকার গঠনের পর সেই অবদানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন স্তরে শরিকদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।’

অংশীদারিত্বের দাবি শরিকদের
গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র নেতা আবু হানিফ জানান, শরিক নেতারা প্রধান মন্ত্রীর সামনে অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জোটের শরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে। তার ভাষায়, তৃণমূলে বিএনপির একক আধিপত্যের কারণে অনেক জায়গায় শরিক দলগুলোর সঙ্গে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে প্রধান মন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করা হয়েছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের প্রশংসা করলেও জোটগত সমন্বয় আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ইসলামি দলগুলোর ক্ষোভও প্রকাশ্যে
ডিনারে উপস্থিত কয়েক জন ইসলামি দলের নেতা অভিযোগ করেন, নতুন সরকারে বামপন্থি ও তরুণ নেতাদের গুরুত্ব দেয়া হলেও ইসলামি মূল্যবোধ-ভিত্তিক দলগুলোকে প্রত্যাশিত মূল্যায়ন করা হয়নি। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘ইসলামি মূল্যবোধের শক্তি হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনি।’ তার ভাষায়, তারা আশা করেছিলেন রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন সরকার একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক
ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শরিকদের সঙ্গে বসে বিএনপি নেতৃত্ব। যদিও ইলেকশনের আগে যুগপৎ আন্দোলনের সময় ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তিন বছর ধরে চলা যুগপৎ আন্দোলনে প্রায় অর্ধশত রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। ত্রয়োদশ পার্লামেন্ট ইলেকশনে এসব শরিকের মধ্যে ডজনখানেক আসনে সমঝোতা করে বিএনপি। 
বর্তমানে সরকারের অংশ হিসেবে রয়েছে গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ এবং জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)-এর প্রতিনিধিরা। পার্লামেন্ট  ইলেকশনে শরিকদের মধ্যে নিজ নিজ প্রতীকে জয়ী হন গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ। জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুর মন্ত্রী সভায় স্থান পেয়েছেন। এনডিএম ছেড়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ইলেকশন করে জয়ী হওয়া ববি হাজ্জাজ প্রতি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সোমবার ডিনারে অংশ নেয়নি। দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব জানান, তারা প্রধান মন্ত্রীর আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। তবে চিঠি দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিএনপির অন্যতম পুরনো শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি ডিনারে অংশ নেননি। দলের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক এবং মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী আমন্ত্রণ পেলেও শেষ পর্যন্ত কেউ উপস্থিত হননি। মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ‘দলীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেই তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। যদিও এ সিদ্ধান্তের বিস্তারিত কারণ প্রকাশ করেননি। তবে দলীয় সূত্রের দাবি, পার্লামেন্ট ইলেকশনের পর থেকেই বিএনপির সঙ্গে জমিয়তের সম্পর্ক আগের মতো নেই। জোটগত সমঝোতায় চারটি আসনে ইলেকশন করেও বিজয়ী হতে না পারা এবং সরকার গঠনের পর প্রত্যাশিত গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘ দিন ধরেই রয়েছে।’ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জমিয়তের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকও প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘ইলেকশনের পর বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে কার্যকর কোনো যোগাযোগ রাখা হয়নি। এমনকি একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকও হয়নি। দলটির নেতাদের মতে, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পরও যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিমান থেকেই প্রধান মন্ত্রীর ডিনারে আমন্ত্রণ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

জুলাই সনদ ও ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আত্মদানকারী শহিদদের প্রতি সরকার গভীর শ্রদ্ধা জানায়। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী আন্দোলনকারীদের অবদানও জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।’ রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি এবং সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে গৃহীত ‘জুলাই সনদ’Ñ দুটিই অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

সরকারের পাচ মাসের কর্মকাণ্ড
মির্জা ফখরুল জানান, সরকার জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। প্রথম মন্ত্রী সভার বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, পুরোহিত ও পাদ্রীদের ভাতা, খেলোয়াড়দের ভাতা এবং খাল খনন কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার কার্যক্রমও ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে।

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নয়
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান আইনে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো শরিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

মির্জা ফখরুল জানান, জাতীয় ঐক্য অটুট রাখা, রাষ্ট্র সংস্কার এগিয়ে নেয়া এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে সমন্বয় জোরদারে প্রধান মন্ত্রী নিয়মিতভাবে শরিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্দোলনে যারা কারাবরণ করেছেন, গুম-খুনের শিকার হয়েছেন কিংবা নির্যাতন সহ্য করেছেন, তাদের ত্যাগ দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT