দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে এমন নাটকীয় ও গতিশীল পরিবর্তনের সূচনা খুব কমই দেখা গেছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে বাঁকটি আমরা সম্প্রতি প্রত্যক্ষ করছি, তা কেবল দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক মেরুকরণ নয়—বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক নতুন ও প্রাগম্যাটিক (বাস্তবমুখী) অধ্যায়ের সূচনা। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, ঢাকা-দিল্লি পারস্পরিক পররাষ্ট্রনীতির পুনর্বিন্যাস এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ আজ এক নজিরবিহীন সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার সম্ভাব্য রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর দিল্লির কড়া নজরদারি, এবং ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির উষ্ণ ও জোরদার সম্পর্কের আকুলতা—সব মিলিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় ধরনের কৌশলী পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে যেসব তথ্য ও সংকেত উঠে এসেছে, তা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দিল্লি এখন ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও সুসংহত করতে যে কোনো উপায়ে তৈরি। ব্যক্তি বা দলভিত্তিক সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের টেকসই সম্পর্ক নির্মাণের এই প্রচেষ্টা কি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, নাকি কেবলই পরিস্থিতির তাগিদে তড়িঘড়ি করা কৌশলগত পরিবর্তন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের গভীর বিশ্লেষণে যাওয়া প্রয়োজন।
গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ঢাকা-দিল্লি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক ধরনের অস্পষ্টতা ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। চলতি বছরের শেষ নাগাদ শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাব্য বার্তা বা বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর দেওয়া বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। তবে সম্প্রতি কংগ্রেসের প্রবীণ এমপি শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে দিল্লির অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারতের মাটি থেকে শেখ হাসিনাকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে না। এই সিদ্ধান্তটি নিছক প্রশাসনিক কোনো নির্দেশনা নয়; এটি দিল্লির এক সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক বার্তা বলেই মনে হচ্ছে।
"মানবিক বিবেচনায় কোনো ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া আর তাকে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিরুদ্ধে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।"
ভারত তাদের দীর্ঘদিনের 'সভ্যতাগত মূল্যবোধ ও মানবিক ঐতিহ্য'-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে যে, চরম বিপদে পড়া বা অস্তিত্বের হুমকিতে থাকা ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া তাদের মানবিক নীতির অংশ। কিন্তু সেই মানবিক আশ্রয়ের সুযোগ নিয়ে স্বাগতিক দেশের ভূখণ্ড থেকে নিজ দেশের রাজনীতির সমীকরণ পরিবর্তন বা উসকানিমূলক কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই।
হঠাৎ করে হাসিনার বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে ভারত মূলত এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছে:
১.প্রতিবেশী দেশের অস্থিতিশীলতা বা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দু হতে চায় না দিল্লি।
২.ভারত কোনো বিশেষ রাজনৈতিক ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন, ভারত থেকে দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত যদি শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুবিধা দিত, তবে ঢাকার নতুন সরকারের সাথে দিল্লির যেকোনো আলোচনা শুরুতেই ভেস্তে যেত। ফলে ভারতের এই কঠোর অবস্থান আসলে ঢাকার সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতার একটি নতুন সেতু নির্মাণের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে কাজ করছে।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ঢাকা থেকে যে প্রত্যর্পণ (Extradition) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে, তা এখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আইন বিভাগের কাছে পর্যালোচনাধীন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া ও দুই দেশের বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজকূটনৈতিক বা রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া কোনো ব্যক্তির প্রত্যর্পণ অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০১৬ সালে সংশোধিত একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। তবে এই চুক্তিতে 'রাজনৈতিক অপরাধ বা অপরাধের প্রকৃতি' সংক্রান্ত একটি বিশেষ ধারা (Political Exception Clause) রয়েছে, যা নিয়ে উভয় পক্ষের দীর্ঘ আইনি লড়াই বা পর্যালোচনার অবকাশ থেকে যায়।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারত এই অনুরোধকে সরাসরি খারিজ করে দেয়নি। 'প্রচলিত আইন ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে'—এই কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে দিল্লি একটি সময় ক্রয়ের কৌশল (Time-buying strategy) অবলম্বন করছে। দিল্লি একদিকে তাদের আইনি ভারসাম্য রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে ঢাকার সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে দরকষাকষির টেবিল উন্মুক্ত রাখতে চায়।
শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের এই 'নিয়ন্ত্রিত ভারসাম্যমূলক কৌশল' মূলত ঢাকার নতুন শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার একটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
শেখ হাসিনার ওপর কড়াকড়ির যে সুর দিল্লিতে বাজছে, ঠিক তার বিপরীত সুর ধ্বনিত হচ্ছে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক পদক্ষেপে। গত বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে এক অত্যন্ত ফলপ্রসূ সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা দুই দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে এক বিশাল পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।
দীনেশ ত্রিবেদী প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছন—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দিল্লি এখন 'অধীর আগ্রহে' অপেক্ষা করছে।
একজন নির্বাচিত ও জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে ভারতের এই ব্যাকুলতা ও অধীর আগ্রহের পেছনে বেশ কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব কাজ করছে:
১.দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নীতিনির্ধারক মহলে একটি অভিযোগ ছিল যে, তারা বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট দলকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি চর্চা করেছে। কিন্তু বিএনপি সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে ঘিরে এই উৎসাহ প্রমাণ করে যে, ভারত এখন আদর্শিক বা ঐতিহাসিক আবেগ সরিয়ে রেখে বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক পন্থায় ফিরতে বাধ্য হয়েছে।
২.ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের (Seven Sisters) নিরাপত্তা, পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অপরিহার্য। ঢাকায় নতুন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর সেই সম্পর্কের রূপরেখা যদি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পুনঃনির্ধারিত হয়, তবে তা উভয় দেশের অর্থনীতির জন্যই লাভজনক। সংস্কৃতি, খেলাধুলা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার যে আশ্বাস হাইকমিশনার দিয়েছেন, তা স্পষ্ট করে যে—দিল্লি এখন অতীতের ক্ষতে মলম লাগিয়ে নতুন চালকের সঙ্গে গাড়ি চালাতে উন্মুখ।
৩.কূটনীতি কেবল রাষ্ট্রপ্রধান বা মন্ত্রীদের বৈঠক কক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো 'পিপল-টু-পিপল কন্টাক্ট' বা জনমানুষের যোগাযোগ। ২০২৪ সালের জুলায়ে বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে ভারতের পর্যটন ভিসা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর স্থগিত থাকার পর ২০২৬ সালের ২৮ জুন ভারত পুনরায় পর্যটন ভিসা চালু করে।
তবে ভিসা দেওয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও কড়াকড়ির ফলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে ভারতের প্রতি যে গভীর অসন্তোষ ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় সংসদীয় কমিটি। সংসদীয় কমিটি তাদের সুপারিশে বলেছে: "বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া অতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে হবে। ভিসা প্রাপ্তিতে বাধা বা বিলম্ব দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক বুনিয়াদকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।"
প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, কেনাকাটা ও ভ্রমণের জন্য ভারতে যান। ভারতীয় পর্যটন ও চিকিৎসা খাতের অন্যতম বড় আয়ের উৎস বাংলাদেশি নাগরিকেরা। ফলে ভিসা ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক না করলে তা কেবল বাংলাদেশের মানুষের ভেতরেই ভারত-বিরোধী মানসিকতা বাড়াবে না, বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংসদীয় কমিটির এই সময়োপযোগী সুপারিশ প্রমাণ করে, দিল্লি এখন তাদের 'জনসম্পর্ক কূটনীতি' (Public Diplomacy) পুনর্গঠনে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে।
এদিকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের চিরন্তন ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর দুটি বড় ইস্যু হলো গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি এবং তিস্তা চুক্তি। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সময়ে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি ২০২৬ সালেই শেষ হতে চলেছে।
ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তাদের 'ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ' শীর্ষক প্রতিবেদনে অত্যন্ত সময়োপযোগী এক সুপারিশ পেশ করেছে। কমিটি বলেছে, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় কালবিলম্ব না করে ঢাকার সঙ্গে অবিলম্বে চুক্তি নবায়নের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করতে হবে। এই আলোচনায় কমিটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে:
১.গত ৩০ বছরে গঙ্গা অববাহিকার পানিবিজ্ঞান (Hydrology) ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর রূপ পরিবর্তিত হয়েছে। তাই হালনাগাদ তথ্য ও জলবায়ু পূর্বাভাসের আলোকেই চুক্তি নবায়ন করা উচিত।
২.ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নদীগুলোর পানি বণ্টনে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য সরকারের ভূমিকা অপরিসীম। অতীতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি স্থবির হয়ে পড়েছিল। সংসদীয় কমিটি এবার শুরু থেকেই পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য সরকারকে আলোচনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার তাগিদ দিয়েছে, যাতে শেষ মুহূর্তে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি না হয়।
অন্য দিকে, দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ইতিবাচক বক্তব্য লক্ষণীয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, "এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান সম্ভব নয়।"
এই আশাবাদ এতদিন থমকে থাকা তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানি বণ্টনে নতুন করে গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা যায়। ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে পানি ইস্যুতে ভারত যদি একটি ন্যায্য ও সম্মানজনক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তবে তা দুই দেশের সম্পর্কে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত কেন আজ ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে এত মরিয়া? এই প্রশ্নের মূল রহস্য নিহিত রয়েছে বিশ্ব ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল এবং সামগ্রিক দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রোধ করতে হলে ভারতের জন্য বাংলাদেশকে পাশে পাওয়া অপরিহার্য। যদি ভারতের নীতিগত ভুলের কারণে বা শেখ হাসিনা ইস্যুতে অতিরিক্ত একগুঁয়েমির কারণে ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব বজায় থাকে, তবে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই তার কৌশলগত হেজিং (Strategic Hedging)-এর অংশ হিসেবে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে।
ভারত অনুধাবন করতে পেরেছে যে, বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তাকে অস্বীকার করে বা শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে বসে রাজনৈতিক চাল চালতে দিয়ে দিল্লি নিজেরই তিথি নষ্ট করবে। দক্ষিণ এশিয়ায় একক আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিবেশীর আস্থা অর্জন ছাড়া ভারতের সামনে আর কোনো দ্বিতীয় বিকল্প নেই।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ভারতের সাম্প্রতিক এই কঠোর অবস্থান—তা সে রাজনৈতিক বক্তব্য নিষিদ্ধ করাই হোক বা প্রত্যর্পণ আবেদনের আইনি পর্যালোচনাই হোক—কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ভারতের জাতীয় স্বার্থ এবং কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতির এক পরিণত রূপান্তর। ভারত বুঝতে পেরেছে যে, বাংলাদেশের জনআকাঙ্ক্ষা এবং নির্বাচিত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই তাদের সামনে এগোতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর যদি সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়, এবং তার মাধ্যমে যদি গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, তিস্তা সংকটের সুরাহা ও ভিসা জটিলতার নিরসন ঘটে—তবে তা হবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক পুনর্জন্ম।
তবে এই নতুন অধ্যায়ের মূল ভিত্তি হতে হবে: সার্বভৌম সমতা (Sovereign Equality), একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনধিকার চর্চা না করা এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো।
বাংলাদেশও চায় ভারতের মতো বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সম্পর্ক বজায় রাখতে। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে 'সমান অংশীদারের'। ভারতের সংসদীয় কমিটির সুপারিশ ও ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের ইতিবাচক বার্তায় সেই সমতার আলোই দেখা যাচ্ছে। সুতরাং শেখ হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির হঠাৎ এই রাজনৈতিক কঠোরতা মূলত ঢাকার সঙ্গে একটি সুদূরপ্রসারী, টেকসই ও ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব গড়ে তোলারই প্রাগম্যাটিক সূচনা। এতে আমার নূন্যতম সন্দেহ নেই।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]