ঢাকা | বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানসিক অভ্যাসই কি মানুষের প্রকৃত চালিকাশক্তি?

author
এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত : ২ আগস্ট, ২০২৬ বিকেল ৪:০০
প্রতীকী ছবি প্রতীকী ছবি
ad003
মানুষেরা দিন-রাত নানা কাজে ব্যস্ত; কেউ ব্যবসায় ব্যস্ত, কেউ চাকরিতে, কেউবা আবার নতুন কোনো উদ্ভাবন কিংবা কোনো বিশেষ দক্ষতার পেছনে। কিছু একটা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় কেউ কেউ প্রাণপণ চালিয়ে যান আজীবন সংগ্রাম, আবার কেউ সামান্যতেই হাল ছেড়ে দেন। আমাদের এই যে বহুমুখী প্রচেষ্টা, নানা স্তর এবং নানা মাত্রার কাজ, এর অন্তরালে কি এমন কোনো মৌলিক শক্তি লুকিয়ে আছে, যা আমাদের সমস্ত মোটিভেশনের মূল উৎস? এমন কোনো লুক্কায়িত উৎস কি আছে, যার সন্ধান পেলে সেই শক্তিকে সঠিক উপায়ে কাজে লাগিয়ে একজন অপরাধীকে ভালো মানুষে, বিরোধীকে বন্ধুতে, লোভীকে পরোপকারীতে এবং বিশৃঙ্খলাকে সুশৃঙ্খলতায় রূপান্তর করা সম্ভব? মানুষের অন্তরের গভীরে এমন কোনো মৌলিক শক্তি কি আসলেই আছে, যা দিয়ে সমাজে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়, প্রতিষ্ঠানকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরা যায় কিংবা একটা চরম দুর্নীতিপ্রবণ রাষ্ট্রকে শান্তির নিকেতন বানিয়ে তোলা সম্ভব?
জীবনের মৌলিক মোটিভেশনের সন্ধান করতে গিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা যুগে যুগে নানা তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলো হাজির করলেন তাঁর বিখ্যাত ‘পাঁচ স্তরের চাহিদার পিরামিড’। তিনি দেখালেন কীভাবে জৈবিক চাহিদা, নিরাপত্তার প্রয়োজন, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা, সম্মান এবং পরিশেষে আত্ম-উন্নয়নের মোটিভেশন ধাপে ধাপে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বি. এফ. স্কিনার ব্যাখ্যা করলেন কীভাবে ‘রিইনফোর্সমেন্ট’ বা পুরস্কার ও শাস্তির মাধ্যমে মোটিভেশন নিয়ন্ত্রিত হয়। অ্যাল্ডারফার সামনে আনলেন অস্তিত্ব, সম্পর্ক এবং উন্নয়নের মৌলিক আকাঙ্ক্ষার কথা। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে মানুষের চাওয়ার ধরন ও তার ক্রমকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু একটি বিষয় ছাড়া কেউই কোনো মৌলিক ব্যাখ্যা দিলেন না যা দিয়ে মানুষের সব ধরনের মোটিভেশনকে ব্যাখ্যা করা যায়। তারা অবশ্য সকলেই একমত ছিলেন যে, মানুষের অন্তরে চাহিদার অনুভবই সব মোটিভেশনের মূল উৎস।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেল, চাহিদার যে ক্রম, সেটাই তো মূল আলোচনা; কেন সব মানুষের চাহিদা একই রকম নয়, এমনকি মানুষ যখন একই পরিস্থিতির মাঝে থাকে তখনও চাহিদার মোটিভেশন শতভাগ মানুষের একই রকম হয় না কেন?

• কেন কিছু মানুষ অর্থের চেয়েও সম্মান বা মর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দেন, আবার কেউ কেউ সম্মানের তোয়াক্কা না করে  সামান্য কিছু লাভের লোভে অন্ধ হয়ে থাকেন?
• কেন কিছু মানুষ সারাজীবন ল্যাবরেটরিতে আত্মমগ্ন হয়ে কোনো এক আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন, আবার কেন কেউ কেউ নির্বাচনে জেতার জন্য জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধা করেন না?
• কেন কিছু মানুষ ভালোবাসার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন, আবার কেউ কেউ একেবারে নিরেট ও হৃদয়হীন হয়ে থাকেন?

সক্রেটিস, প্লেটো আর স্পিনোজার মতো দার্শনিকগণ ভেবেছিলেন, এই সবকিছুর মূলে রয়েছে ‘সঠিক জ্ঞান’। তাদের দাবি ছিল, মানুষকে যদি সঠিক জ্ঞান দেওয়া যায়, তবে সে নিজেকে চিনতে পারবে; আর মানুষ যখন নিজেকে বুঝতে পারে, তখনই সে সঠিক কাজ করে। তাদের মতে, একমাত্র সঠিক জ্ঞানই আচরণের মৌলিক মোটিভেশন। 

কিন্তু এখানে একটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে; আমাদের মাঝে তো এমন অনেক জ্ঞান আছে, যা আমরা সঠিক বলে জানি ও বুঝি; কিন্তু আমরা কি সবাই সেই জ্ঞান দিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করি? আমরা কি সারাদিনে সেই সঠিক জ্ঞানের বিরুদ্ধে গিয়ে একটি কাজও করি না? এর উত্তর খুবই সহজ ও সাদামাঠা; আমরা প্রতিদিন জেনেশুনেই আমাদের জ্ঞানকে পাশ কাটিয়ে নানা রকম উল্টো আচরণ করি, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’।

আবার থমাস আকুইনাস থেকে শুরু করে উইলিয়াম জেমস এবং অধিকাংশ ধর্মতাত্ত্বিকগণ মনে করতেন, ‘বিশ্বাস’-ই হলো সমস্ত মোটিভেশনের মূল উৎস। তারা বলতেন, বিশ্বাস ঠিক থাকলেই মানুষ সঠিক পথে চলে এবং সঠিক কাজটি করে। কিন্তু এবার একটু চারপাশে তাকান। এমন অনেক মানুষ কি আমরা প্রতিদিন দেখি না, যারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে মৃত্যুর পর দুনিয়ার কোনো ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা বা সোনাদানা সাথে যাবে না, তবুও তারা কেন সেই জমি, টাকা আর সোনার স্তূপ গড়ার জন্য জীবনের সব সময় ও শ্রম ঢেলে দিচ্ছেন? বিশ্বাস কি তাদের মনকে শান্ত করতে পেরেছে? মোটেও না। আসলে জ্ঞান, বিশ্বাস কিংবা দর্শন আমাদের জীবনে ভালো-মন্দ আচরণের পথ দেখায় ঠিকই কিন্তু তা সত্যিই আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে না। প্রচলিত নানা তত্ত্বের মাঝে হাজারো উদাহরণ ও ব্যাখ্যা সত্ত্বেও মানুষের অন্তরের গভীরে এমন কোনো একক শক্তির সন্ধান মেলে না, যা দিয়ে জীবনের সব ধরনের মোটিভেশনকে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

তাহলে এর সমাধান কোথায়?
এবার চলুন ‘অভ্যাসের শক্তি’ বা Power of Habit নিয়ে কথা বলি। শারীরিক অভ্যাসের কথা তো আমরা সবাই জানি, কিন্তু এখানে আমরা বিশেষভাবে আলোকপাত করছি ‘মানসিক অভ্যাসের’ ওপর। মানসিক অভ্যাস; যে অভ্যাসে আমরা শুক্রবারকে ছুটির দিন বলি, ১ কে এক বলি, ৭ দিনে সপ্তাহ হিসাব করি কিংবা যে কারণে আমরা সাদাকে সাদা আর হলুদকে হলুদ বলতে অভ্যস্ত হয়েছি। যে মানসিক অভ্যাসে আমরা ন্যায় আর অন্যায়কে আলাদা করি কিংবা সুন্দর আর অসুন্দরের পার্থক্য অনুভব করি।

যদি বলা হয়, ‘মানসিক অভ্যাসই জীবনের মৌলিক মোটিভেশনের মূল উৎস’; যদি বলা হয়, মানুষের চিন্তার ধরন, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আকাঙ্ক্ষার যে এত বৈচিত্র্য, তার মূলে রয়েছে মানসিক অভ্যাস; যদি বলা হয় যে, অভ্যাসই হলো সমস্ত মোটিভেশনের সূতিকাগার—তবে এই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করা কীভাবে সম্ভব?
যেকোনো জীবের আদিমতম সত্য হলো বেঁচে থাকার তাগিদ বা সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট। পৃথিবীর প্রতিটি জীবই এই আদিম প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত। মানুষ যখন নানা পরিবেশ, পরিস্থিতি ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে, তখন মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো সেই অভিজ্ঞতা এবং প্রতিক্রিয়াগুলোকে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে গেঁথে ফেলে। এই পুনরাবৃত্তিমূলক স্নায়বিক প্যাটার্ন বা নিউরাল পাথওয়েই রূপ নেয় ‘অভ্যাসে’। বাহ্যিকভাবে যদিও অভ্যাসগুলো জন্মের পর গড়ে ওঠে বলে অনুভব হয়, তবুও অনেক অভ্যাসের প্রাথমিক নিউরাল সংযোগ বংশানুক্রমিকভাবেও প্রবাহিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ, সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট হলো আদি শক্তি, আর তাকে কার্যকরী রূপ দেওয়ার মাধ্যম হলো অভ্যাস।

গভীর স্তরে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, জীবনের যত জ্ঞান বা বিশ্বাস, কিংবা অনুভব যেমন রাগ, দুঃখ, লোভ, হিংসা, ঈর্ষা, ভালোবাসা, মমতা, আস্থা, সংগ্রাম কিংবা আনুগত্য সবই আসলে সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট থেকে জন্ম নেওয়া মানসিক অভ্যাসের ডালপালা। তবে সকল অভ্যাস একই রকমের শক্তিশালী নয় বলেই যে অভ্যাসটি অন্যদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, সেটাই মোটিভেশনের ক্ষেত্রে আসল পার্থক্য গড়ে দেয়। জ্ঞান বা বিশ্বাস যা কিছুই হোক, প্রকৃত মোটিভেশন লুকিয়ে থাকে সেই অভ্যাসগুলোর ভেতরে যা মানুষ বিগত দিনগুলোতে চর্চা করে এসেছে। মানুষকে তাই স্পষ্টভাবে তুলনা করা যায় এক অভ্যাস-চালিত মেশিনের সাথে।

একজন যিনি ঘুষ নিতে অভ্যস্ত, তিনি হয়তো জানেন যে ঘুষ নেওয়া অন্যায়, কিন্তু নির্লজ্জতার মানসিক অভ্যাসই তাকে বারবার ঘুষের দিকে ধাবিত করে। পক্ষান্তরে, একজন যিনি আজ জানতে পারলেন যে কমিশন খাওয়া অন্যায় এবং তিনি চিরতরে এই পাপ থেকে মুক্ত থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন, এবং সত্যিই মুক্ত থাকলেন, তবে কোন মানসিক অভ্যাসের ফলে এমনটি ঘটল? এটি হলো তার কমিটমেন্টের মানসিক অভ্যাস। কমিটমেন্টের অভ্যাস যখন অন্যসব অভ্যাসের চেয়ে মজবুত, তখন কমিটমেন্টের শক্তির কাছে অন্য অভ্যাসগুলো পরাজিত হয়। সততার অভ্যাস যখন অন্যদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী তখন অন্যসব মোটিভেশন সততার কাছে পরাজিত হয়। যখন মমতার অভ্যাস অন্যসব মানসিক অভ্যাসের চেয়ে শক্তিশালী তখন অন্যরা মমতার কাছে পরাজিত হয়। যখন দায়িত্ববোধের অভ্যাস সবচেয়ে শক্তিশালী তখন বাকিরা দায়িত্ববোধের কাছে হেরে যায়। মোটিভেশনের মূল চাবিকাঠি এখানেই; কোন মানসিক অভ্যাসটি অন্যগুলির তুলনায় কতখানি শক্তিশালী সেটিই পার্থক্যকারী।

তবে হাজারো অভ্যাসের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো, ‘আত্মসম্মানবোধ’-এর মানসিক অভ্যাস। এটি এমন এক শক্তির উৎস যা মানুষের আত্মপরিচয় তুলে ধরে। মানুষ তার আপন পরিচয়কে বড্ড ভালোবাসে, যেমন সে তার জীবনকে ভালোবাসে। তাই আত্মসম্মানবোধের মোটিভেশনই জগতে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে দেখা যায়। আত্মসম্মানবোধের চর্চা প্রায়ই এমন স্তরে পৌঁছাতে দেখা যায় যেখানে মানুষ তার আদিম সারভাইভাল ইন্সটিংক্টকেও তুচ্ছ জ্ঞান করে শুধু সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে পিছপা হয় না।

যে প্রশ্ন দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম; এমন কি শক্তি আছে যা একজন অপরাধীকে ভালো মানুষে পরিণত করতে পারে, বিরোধীকে বন্ধুতে রূপান্তর করতে পারে, দুর্নীতির সাগরে ডুবে যাওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়ে জনগণের সেবকে পরিণত করতে পারে?
এটাই সেই অভ্যাস; আত্মসম্মানবোধের মোটিভেশন, আত্মসম্মানবোধের শক্তি, যে আত্মসম্মানবোধের ডেফিনেশনে যুক্ত থাকে সততা, মমতা, দায়িত্ববোধ আর কমিটমেন্ট।
(মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT