বাম হাতে অস্ত্রোপচারের দাগ এখনো স্পষ্ট। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা বাড়ে, শরীর সায় দেয় না। তবু আহতদের অধিকার, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবিতে একের পর এক বৈঠক, স্মরণসভা ও সাংগঠনিক কর্মসূচিতে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার তরুণ মো. তৌফিক শাহারিয়ার। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই তরুণের কাছে জীবন এখন শুধু ব্যক্তিগত অস্তিত্বের নয় একটি আদর্শ ও দায়বদ্ধতার নাম।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তিনি চার দফা গুরুতর আহত হন বলে জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭ জুলাই প্রথম, ১৯ জুলাই দ্বিতীয়, আগস্টের আন্দোলনের সময় তৃতীয় এবং ২৫ আগস্ট আনসার সদস্যদের হামলায় চতুর্থবার আহত হন। ধারাবাহিক এসব হামলায় তাঁর বাম হাত ভেঙে যায়, বুকে গুরুতর আঘাতের কারণে কিডনিতে জটিলতা তৈরি হয় এবং আন্ডকোষে গুরুতর আঘাতে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। পরে তাঁকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) ও কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।

তৌফিক বলেন, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় তাঁর মায়ের একটি বাক্য আজও তাঁকে শক্তি জোগায়। ছেলেকে জীবিত দেখে তাঁর মা বলেছিলেন, “আমার ছেলে বেঁচে আছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। আলহামদুলিল্লাহ।” তৌফিকের ভাষায়, সেই মুহূর্তেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বেঁচে থাকাটাই নতুন এক দায়িত্ব।
দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তৌফিকের রাজনৈতিক ও আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট পথচলা শুরু ছাত্রজীবনেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্কুলজীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, মোদি-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ, যুগপৎ আন্দোলন এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বর্তমানে তিনি ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও স্মৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক’ এবং জুলাই আন্দোলনে আহতদের সংগঠন ‘জুলাই জাগ্রত ফোরাম’-এর সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংগঠনের সংশ্লিষ্ট নেতারাও আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা ও বর্তমান সাংগঠনিক দায়িত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে তিনি নিয়মিত সোচ্চার। সম্প্রতি ওসমান হাদীর বিচারের দাবিতে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল সহানুভূতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; প্রয়োজন কার্যকর পুনর্বাসন, চিকিৎসা এবং মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।
তৌফিকের গল্প কেবল একজন ব্যক্তির সংগ্রামের নয়; এটি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জসহ সারা দেশের অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি। তাঁর উপজেলারই দুই আন্দোলনকারী পানবাড়িয়া গ্রামের ঢাকায় অধ্যয়নরত ১৮ বছর বয়সী সরোয়ার হোসেন খান এবং নন্দপুরা গ্রামের ২২ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক সুমাইয়া সুমি—আন্দোলনে প্রাণ হারান। বরিশাল জেলায় মোট ২৭ জন শহীদের তালিকায় তাঁদের নামও রয়েছে।
তাঁর মতে, জুলাই আন্দোলন কোনো একক শ্রেণি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ছিল না। ছাত্র, শ্রমিক, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ দুর্নীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে রাজপথে নেমেছিলেন। তাই এই আন্দোলনের ইতিহাসও হতে হবে সবার।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তৌফিক বলেন, “জুলাই সবার। যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আহত হয়েছেন কিংবা জীবন উৎসর্গ করেছেন তারাই জুলাইয়ের প্রকৃত শক্তি। জুলাইকে বিভাজনের নয়, জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ধরে রাখতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাকে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের যে বিতর্ক রয়েছে, জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রেও যেন সেই পুনরাবৃত্তি না ঘটে। তাঁর ভাষায়, “জুলাইয়ের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচারী শক্তি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। আহত ও শহীদ পরিবারের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।” আজও প্রতিদিন শারীরিক যন্ত্রণা নিয়েই চলতে হয় তাঁকে। কিন্তু সেই কষ্ট তাঁর অঙ্গীকারকে দমাতে পারেনি।
তৌফিক শাহারিয়ার বলেন, “আজও প্রতিনিয়ত শরীরের ব্যথা নিয়ে চলাফেরা করি। কিন্তু দেশের মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং জুলাইয়ের চেতনা রক্ষার প্রশ্নে আমি কখনো আপস করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। যতদিন বেঁচে থাকব, এই লড়াই চালিয়ে যেতে চাই।”
মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এই তরুণের গল্প শুধু ব্যক্তিগত বেঁচে থাকার নয়; এটি এক প্রজন্মের আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত দলিল।