ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা কি আর নিরাপদ শহর? আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি?

author
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান

প্রকাশিত : ৬ আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৫:১০
ad003
একটি শহরের উন্নয়ন শুধু উঁচু অট্টালিকা, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি শহর কতটা উন্নত, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো—সেখানে বসবাসকারী মানুষ কতটা নিরাপদ বোধ করেন। একজন শিশু নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে কি না, একজন নারী কর্মস্থল থেকে রাতে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারেন কি না, একজন বিদেশি পর্যটক নির্ভয়ে শহর ঘুরে দেখতে পারেন কি না কিংবা একজন বিনিয়োগকারী আস্থার সঙ্গে ব্যবসা শুরু করতে পারেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই একটি শহরের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম Numbeo-এর ২০২৬ সালের জরিপে ঢাকার Safety Index মাত্র ৩৭.৮ এবং Crime Index ৬২.২ দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে Mercer-এর জীবনমানভিত্তিক জরিপেও ঢাকার অবস্থান নিম্ন সারিতে রয়েছে। যদিও Numbeo কোনো সরকারি বা জাতিসংঘের পরিসংখ্যানভিত্তিক ডেটাবেস নয়, বরং নাগরিকদের স্বেচ্ছাসেবী মতামতের ভিত্তিতে তৈরি একটি ক্রাউডসোর্সড সূচক, তবুও এই তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—নাগরিকদের বড় একটি অংশ নিজেদের শহরে নিরাপদ অনুভব করছেন না।


এখানেই মূল প্রশ্ন—বাস্তব অপরাধের সংখ্যা যাই হোক না কেন, যদি সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করেন, তবে সেই নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিকেও কি উপেক্ষা করা যায়?

গত কয়েক বছরে দেশের সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত উঠে এসেছে ছিনতাই, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, নারীর নিরাপত্তাহীনতা এবং রাতের শহরে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের অসংখ্য ঘটনা। প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিসিটিভিতে ধারণ করা ছিনতাইয়ের ভিডিও, চলন্ত মোটরসাইকেলে মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার দৃশ্য কিংবা বিভিন্ন অপরাধের খবর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। অবশ্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি ভিডিও বা তথ্য সত্য নয়; অনেক সময় পুরোনো ঘটনাও নতুন বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু বাস্তব ঘটনাগুলোর ধারাবাহিক উপস্থিতি নাগরিকদের মনে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন তৈরি করেছে—"আমি কি সত্যিই নিরাপদ?"

সংযুক্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুন, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধের পরিসংখ্যানে বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এসব তথ্য ইঙ্গিত করে যে বিষয়টি কেবল জনমতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

তবে নিরাপত্তাহীনতাকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একটি শহরের নিরাপত্তা অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, নগর পরিকল্পনা, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্মিলিত ফল। যখন একজন তরুণ দীর্ঘদিন কর্মসংস্থান পান না, যখন কিশোররা পরিবার ও বিদ্যালয়ের কার্যকর তত্ত্বাবধান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যখন মাদক সহজলভ্য হয় এবং অপরাধের বিচার দীর্ঘসূত্রিতায় ভোগে, তখন অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

ঢাকার মতো একটি অতিঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত হয়। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, তীব্র যানজট, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, দখল হওয়া ফুটপাত, সীমিত জনবল নিয়ে কাজ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং দ্রুত নগর সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব শুধু নাগরিক জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি দেশের অর্থনীতি, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। আজকের বিশ্বে একজন পর্যটক কোনো দেশ ভ্রমণের আগে শুধু পর্যটনস্থলের ছবি দেখেন না; তিনি Google Reviews, YouTube, Reddit, TikTok এবং Numbeo-এর মতো নিরাপত্তা সূচকও বিবেচনা করেন। যদি একটি শহরের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় যানজট, দূষণ, ছিনতাই, নারীর নিরাপত্তাহীনতা ও প্রতারণা, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পর্যটকের আগ্রহ কমে যাবে।
বাংলাদেশের রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্য, সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈচিত্র্যময় পর্যটন সম্ভাবনা। কিন্তু যদি একজন বিদেশি পর্যটক বিমানবন্দর থেকে শহরে আসার আগেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তাহলে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
একইভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। তারা শুধু কর-সুবিধা বা বাজারের আকার দেখেন না; আইনের শাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্নীতির মাত্রা, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং জননিরাপত্তাও বিবেচনা করেন। যেখানে একজন বিদেশি নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারেন না, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগ্রহও কমে যেতে পারে। তাই নিরাপত্তা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো নতুন প্রজন্ম। আজ অনেক অভিভাবক সন্তানকে একা কোচিং বা বিদ্যালয়ে পাঠাতে শঙ্কা বোধ করেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অনেকেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। একটি সমাজ তখনই ঝুঁকির মুখে পড়ে, যখন শিশুরা নিরাপদ শৈশব হারায়। যদি একজন শিশু ছোটবেলা থেকেই দেখে যে অপরাধের দ্রুত বিচার হয় না, আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কম এবং সামাজিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে, তবে ভবিষ্যৎ নাগরিক গঠনের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।

সমাধান কী? শুধু পুলিশ সদস্যের সংখ্যা বাড়িয়ে বা অভিযান পরিচালনা করেই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও তথ্যনির্ভর কৌশল। সংযুক্ত নথিতে যে সুপারিশগুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, নগর অবকাঠামোর উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইন ও নৈতিকতা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার। এসব উদ্যোগ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।

বিশ্বের অনেক শহর ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), স্মার্ট সিসিটিভি, ফেসিয়াল রিকগনিশন, ড্রোন নজরদারি, অপরাধের হটস্পট বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল পুলিশিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে আরও দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। প্রযুক্তি অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে না পারলেও দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ এবং তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।

একই সঙ্গে জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ এবং কার্যকর যোগাযোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের প্রকৃত চিত্র, গৃহীত পদক্ষেপ এবং অর্জিত অগ্রগতি নিয়মিত জনগণের সামনে তুলে ধরলে গুজব কমবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়বে।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কেবল কোনো আন্তর্জাতিক সূচকে ঢাকার অবস্থান কত নম্বরে, সেটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই? এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে নাগরিকেরা প্রতিদিন ভয় নিয়ে ঘর থেকে বের হবেন, নাকি এমন একটি দেশ, যেখানে আইন, প্রযুক্তি, সুশাসন এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয়ে নিরাপদ ও মানবিক নগরজীবন গড়ে উঠবে?

ঢাকাকে নিরাপদ করা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্য শর্ত। সমন্বিত পরিকল্পনা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ঢাকাকে একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য ও বিশ্বমানের নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়, বরং বাস্তবতা স্বীকার করে কার্যকর সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT