নদীর জল এবং রাজনীতি। এদের একমাত্র কাজ-ই হলো, সামনের দিকে ছুটে চলা। নদী মূহুর্তে,মূহুর্তে নতুন জল বদলায় । আর চলিষ্ণু স্রোত ধারায় সামনের দিকে ধাবমান। সময়ের বিবর্তনে রাজনীতিও পাল্টায় তার অতীতের ভুলভ্রান্তি । একটা সুন্দর রাষ্ট্র ব্যবস্থার আকঙ্খায় চলে আগামীর পথে । এখানে অতীত নিয়ে পরে থাকার কোন সুযোগ নেই। নতুন সময়, নতুন জল এবং নতুন পথ পরিক্রমা । রাজনীতি-ও নদীর জলের মতোই ! সবসময় নতুন, নতুন সব উপাদান। পুরানো উদহারন বা ব্যক্তিকে সামনে নিয়ে চলার কোন-ই সুযোগ নেই। কখনও সখনও ঘটলেও, তা সাময়িক। অতীতকে আঁকড়ে রাখা মানেই বিকলাঙ্গ রাজনীতি। সবশেষে বলতে হয়, আমাদের অতীত বড়ই নির্মম । অতীতকে ধরে রাখতে গিয়ে রাজনীতি একসময় হয়ে ওঠে, সামন্ত শাসন । রাজনীতিক হয়ে ওঠেন, দেবতা কিংবা পীর বংশের ধারাবাহিক গদিনশিন । আর নয়, অতীত মুখি কোন পীর দরবেশের ধারাবাহিকতা। এবার মানুষ হবে, রাজনীতির প্রধান বিষয়। দানব বা দরবেশ নয়। মেধা, বিবেচনা আর মানবিক ভালোবাসা হবে প্রধান উপাদান। কৌশল থাকবে তবে কূটকৌশল আর নয়। কূটকৌশল দিয়ে আর যাই হোক, রাজনীতি হয় না। আলেয়ার আলো দিয়ে নয়। এবার মানবিক আলোয় আলোকিত হবে, আমাদের রাজনীতি ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী এদেশের জনগণ একটা নতুন বাংলাদেশ দেখবে বলে আশা করছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমেই তার অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। বাংলাদেশের মানুষ যা চায় তা তারা বুঝতে পারে নি। বাংলাদেশের মানুষ চায় একটা নিরাপ বাংলাদেশ। বাজারে গেলে যাতে মনে না হয়, দোকান মালিক অতিরিক্ত দামে বাজার করতে হয়েছে। সরকারি কার্যালয়ে যাওয়ার সময় যেন ঘুষের অংকের কথা ভাবতে না হয়। রাতবেরাত চলাচলে খুনি ছিনতাইকারীর শঙ্কিত হতে না হয়। এবং আদালত টাকা বা ক্ষমতার পক্ষে না ন্যায়ের পক্ষে থাকবে এই ভাবনা যেন না পেয়ে বসে। এর কোন সমাধান না করেই তারা চলে গেছেন। সংস্কারের নামে অন্তর্বর্তী সরকার সামনে একটি আকাঙ্ক্ষার মুলা ঝুলিয়ে ছিলেন । কোন পরিবর্তন না করেই এক সময় চলে যায়। তাঁরা যুক্তি দেখান , এতো স্বল্প সময়ে পরিবর্তন কেমনে সম্ভব। তবে তাদের হয়-তো জানা নেই, পঁচাত্তর উত্তর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অতি অল্প সময়ে দেশে অনেক পরিবর্তন এনেছিলেন । যার কারণে তিনি আজো মানুষের হৃদয়ে আছেন । আর অন্তর্বর্তী সমালোচনার সম্মুখীন । যে পারে, সে পারে। যে পারে না, সে নানা যুক্তি উপস্থাপন করেন ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ ভঙ্গুর অর্থনীতি। যা হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারের মাথায় আসেনি । এছাড়া আছে দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব । রাষ্ট্রীয় এবং প্রশাসনিক অঙ্গনে জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ঘাটতি দেশের সার্বিক উন্নয়নে প্রধান বাধা। বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-ও সম্প্রতি আক্ষেপ করে এ কথা বলেছেন । এর বাইরে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের উচ্চ মূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলে। আর্থিক ব্যাবস্থাপনায় ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং তারল্য সংকট অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়। এই দেশের সাধারণ জনগন দীর্ঘ সময় ধরে এই মনের আখাঙ্খা পোষণ করে আসছে । জনগনের চাওয়া হচ্ছে, কোন এক সরকার তাঁদের এই আখাঙ্খা পুরন করবে। এই চাওয়া পুরন করতে সাধারণ মানুষ নব্বুইয়ে রাজপথে নেমেছিল । তিন যুগ আবার জুলাইয়ে গণআন্দোলন গড়ে তুলে। আখাঙ্খা পুরন না হলে আগামীতেও এমন হতে পারে ।
এই দেশে যতবার সমাজ বা রাষ্ট্র বদলের আন্দোলন হয়েছে ,বিজয় শেষে সাধু বেশে কিছু সামনে চলে আসে । উন্নয়ন সহযোগী নামে তারা আসে । এরা আসলে করপোরেট বানিজ্য গোষ্ঠীর প্রতিনিধি । তৃতীয় বিশ্বে রাজনীতি হচ্ছে, করপোরেট বানিজ্য গোষ্ঠীর হাতের খেলা। বা বাটপারের হাত সাফায়ের যাদু শক্তি। লক্ষকোটি জনসমর্থক নিয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকে। আবার চেনা নেই, জানা নেই কারজাই রূপে মসনদে বসে যায়। অনেকটা বাংলার ইতিহাসে, গোপালের রাজ্য লাভ ! করপোরেট বানিজ্য গোষ্ঠী কখনও ট্যাংকের চাকায় মানুষের স্বপ্ন পিষ্ট করে। আবার কামানের নলে বিপ্লবী চে'র লাল পতাকা ব্যবহার করে। কিংবা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নামে অরেঞ্জ বিপ্লব বা লালসবুজ পতাকা মাথায় দিয়ে রাজপথে নেমে যায়। রাজপথে'র লড়াকু সৈনিক জানে না কে বা কার স্বার্থে আত্মত্যাগে নেমেছে রাজপথে ! সুদুর ল্যাটিন আমেরিকা থেকে আফ্রিকা হয়ে এই এশিয়া মহাদেশে। জাতিগত কিংবা ধর্মের নামে বিদ্বেষের সলতে-তে দেয় আগুন। আর রাষ্ট্রের ভেতরে মত আর পথের গোলকধাঁধা'য় জনগণকে ফেলে দেয়। এই ক্ষোভ আর দ্রোহের আগুনে রাষ্ট্র পুড়ে খাক হয়ে যায়।
আমাদের মতো দেশ যখন দ্রোহের আগুনে পুড়তে থাকে, সেই সময় করপোরেট বানিজ্যিক গোষ্ঠী অতলান্তের ওপারে বসে কড়া জলে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। তোলে সফলতার ঢেকুর। এর কখনও মানবিক শাসন আবার কখনও আবার গণতন্ত্রের কথা বলে পাশে এসে দাঁড়ায়। কখনও, কখনও অবাধ কথা বলা'র অধিকারের নামে স্বর্গের দেবদূত হয়ে বানী শোনায়। সহোযোগিতার নামে, খাদ্য কিংবা টাকার ব্যাগ নিয়ে আসে।
খাদ্যের বিনিময়ে রাজনীতির পটপরিবর্তন। আর টাকা'র লোভ দেখিয়ে মানচিত্রের পত্তন নেয়। এই হলো গনতন্ত্র এবং মানবিক শাসন ব্যবস্থা ! তৃতীয় বিশ্ব দেশগুলোর অধিকাংশ মানুষ ক্ষুধা আর না পাওয়ার বেদনায় শয়তান আর সাধু আলাদা করতে ভুল করে ফেলে । তাৎক্ষণিক পাওয়ার আশায় শয়তানের হাতে বায়াত নেয়। করপোরেট বানিজ্যিক গোষ্ঠী হচ্ছে শয়তানের প্রতিভূ । করপোরেট গোষ্ঠী, কারো হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার নামে জ্বলন্ত দিয়াশলাই-এর কাঠি হাতে তুলে দেয়। ক্ষমতা'র আগুনে জ্বলে ওঠে। এবং জ্বলতে বেশকিছু দিন থাকে। জ্বলতে, জ্বলতে একদিন কোন একসময় ছাই হয়ে যায় ! আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ততক্ষণে দিয়াশলাই'য়ের জ্বলন্ত কাঠিটা আরেকজনের হাতে তুলে দেয় তারা ।
বাংলাদেশে পচাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক জট আমাদের দল এবং রাজনীতিরা খুলতে পারেনি। এই জট খুলতে সেনাবাহিনীকে ভূমিকা রাখতে হয়েছে। ৫ আগষ্টে-ও সেনাবাহিনী একই ভূমিকা পালন করে। সেনাবাহিনী হাসিনা সরকারের পক্ষ ত্যাগ করায় সকল হিসেবনিকেশ পাল্টে যায়। সেনাবাহিনী সরকারের পক্ষ নিলে, কি হতো না-ই বা বলি। তবে অবশ্যই সাধারণ মানুষের জয় হতো। পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলে। কিন্তু রক্তক্ষরণের পরিমাণ হয়-তো আরও অনেক বেশী হতো। শেষ কথা হচ্ছে, ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে জাতিকে সেনাবাহিনী রক্ষা করেছে। এই বৃহৎ ভূমিকা পালনের জন্য, সেনাবাহিনী ধন্যবাদ যোগ্য। বিশেষ করে সেনাপ্রধানের ইতিবাচক ভূমিকা'র জন্য তাঁকেও ধন্যবাদ।
সেনাবাহিনীর ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় ঘটনা, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে তুলে নেয়নি। আগের ঘটনা হচ্ছে, বৈধ সরকারকে উৎখাতে জেঃ নাসিমদের অভ্যুত্থান নস্যাত করে দেয় তিন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এরা হলেন, সেই সময়কার মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান, মেজর জেনারেল মতিন এবং মেজর জেনারেল সুবিদআলী। এরা ইচ্ছে করলে ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিতে পারতেন। রাষ্ট্র, জাতি এবং সংবিধানের স্বার্থে তা তারা করেননি। এই জন্য বাংলাদেশ তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।
২০০২৪ সালের ৫ আগষ্ট উদ্ভুত পরিস্থিতি'র প্রেক্ষিতে সাধারণ জনগণ ভেবেছিল সেনাবাহিনী হয়-তো ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। কিন্তু তা তারা করেননি। তারা জনগণের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়েছেন। একটা অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্য দিয়ে নিজেদের পছন্দের সরকার নির্বাচিত করবে, এটাই ছিল তাঁদের কাম্য। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর দেশের মানুষ তাদের প্রতি অভিনন্দন প্রকাশ করে। এ-তো বড় পরিবর্তনের পরও দেশের রাজনৈতিক দলের তেমন গুনগত পরিবর্তন হয়নি। দু-একটি দল সাধারণ মানুষকে বাদ দিয়ে ক্ষমতার সোপান হিসেবে সেনা সদস্যদের ব্যবহারে উন্মুখ হ'য়ে ওঠে ! কিন্তু একসময় সবটাই স্পষ্ট হয়ে যায় ক্ষমতা কাঙ্খিদের কাছে। সেনা সদস্যদের ব্যবহার করা সম্ভব নয়। এটা তারা উপলব্ধি করার পরপরই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে দেয়।
সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা হচ্ছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সকলের কাছে আমাদের অনুরোধ, সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করবেন না। সেনাবাহিনী হচ্ছে, আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতিক। এবং দেশের সকল ক্রান্তিলগ্নে তারাই মানুষের পাশে এসে দাড়ায়।
পরিশেষে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আকাঙ্খা হচ্ছে, একটা সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সাথে অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে পরিচিতি লাভ। এই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সকল পেশা এবং সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মতপার্থক্য বা মতভেদ থাকতেই পারে, তা প্রকাশ পাবে পরমতসহিষ্ণুতা'র মধ্য দিয়ে। এবং এই মতপার্থক্য যাতে কখনোই দেশ বিরোধী না হয়।