ঢাকা | মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপরিকল্পিত নগরায়নে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ

author
উমর ফারুক

প্রকাশিত : ৭ আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪২
ad003
মেগাসিটি ঢাকাসহ সারা দেশে ক্রমবর্ধমান নগরমুখীতা এবং দ্রুত নগরায়নের সাথে তাল মিলিয়ে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠছে না। ফলে নাগরিক সুবিধার অসম বণ্টন এবং চরম বৈষম্যমূলক নীতি প্রণয়নসহ অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জীবনযাত্রা এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত থাকছে। সব শ্রেণী-পেশা ও বয়সের মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে, মানুষের জন্য বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগরই ঢাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা। 

একইভাবে গ্রামাঞ্চলেও যে যেখানে পারছে, আবাদি জমি ভরাট করে বসতি গড়ে তুলছে। শহরের মতো গ্রামাঞ্চলেও অপরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছে যেখানে নাগরিক সুবিধার ছিটেফোঁটা সুযোগও নেই।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যে নগরায়ণ ছিল উন্নয়নের সমার্থক, একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে তা বাংলাদেশের জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান ও স্যাটেলাইট তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের নগর পরিকল্পনা এখন আর কেবল কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি গভীর পরিবেশগত বিপত্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট বহুমুখী সংকট এখন দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশ দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশের জিডিপি-র প্রায় ৫.২ শতাংশ প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে আমাদের উন্নয়নের একটি বড় অংশই পরিবেশগত ক্ষতির মাশুল দিতে গিয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা মেগাসিটির জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটিতে পৌঁছে গেছে, যা শহরের বাস্তুসংস্থানিক ধারণক্ষমতার (ঊপড়ষড়মরপধষ ঈধৎৎুরহম ঈধঢ়ধপরঃু) কয়েক গুণ বেশি। এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ সামলাতে গিয়ে শহরের ল্যান্ড ইউজ এফিসিয়েন্সি বা ভূমি ব্যবহারের কার্যকারিতা গত এক দশকে আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ (উঅচ) ২০২২-৩৫-এর ম্যাপ এবং ২০২৪ সালের ফলো-আপ সার্ভে অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৭৪ শতাংশ জলাভূমি ও নিচু জমি ইতোমধ্যে কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছে। এর ফলে শহরের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ভূ-গর্ভস্থ পানিস্তর ক্রমশই নিচে নেমে যাচ্ছে। এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য ঢাকাকে অবিলম্বে ডিসেন্ট্রালাইজ বা বিকেন্দ্রীকরণ করা অপরিহার্য। প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুগুলো ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে অন্যান্য ছোট শহরগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় সচেতন ‘কমিউনিটি বিল্ড আপ’ বা এলাকাভিত্তিক সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন, যারা স্থানীয় পরিবেশ রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে পরিবেশ দূষণে ভূমিকা রাখছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে কমে আসছে সবুজ এলাকা ও উন্মুক্ত স্থান। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০১৯ সালের গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার মোট আয়তনের ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশই কংক্রিট আচ্ছাদিত। বাকি এলাকার মধ্যে ৯ দশমিক ২ শতাংশ সবুজ আচ্ছাদিত, ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান এবং ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ জলাভূমি। অপর এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় ১৯৯৯ সালে সবুজ আচ্ছাদন ছিল ৮ দশমিক ৯৭ বর্গকিলোমিটার। ওই বছর রাজধানীর ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ এলাকা ছিল বৃক্ষ আচ্ছাদিত। পরের এক দশকে পরিস্থিতির উন্নতি হয়ে ২০০৯ সালে সবুজ আচ্ছাদন পাওয়া যায় ১২ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। বছরটিতে রাজধানীর আয়তনের ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ জায়গায় গাছের উপস্থিতি নজরে আসে। কিন্তু পরের এক দশকে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। গবেষণা অনুযায়ী, যে কোনো শহর এলাকায় কংক্রিটের শতকরা হারের পরিমাণ হওয়া উচিত ৪০ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া ২৫ শতাংশ সবুজ, ১৫ শতাংশ জলজ ও ১০ শতাংশ খোলা জায়গা থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়।

বিআইপির সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ বলেছেন, ‘রাজধানী ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় জলজভূমি ও সবুজ এলাকার পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে আসার পাশাপাশি বেড়েছে কংক্রিটের আচ্ছাদন, যা ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বর্তমানে এমন অবস্থা হয়েছে যে, আর একটি ইটের ভার বহনেরও ক্ষমতা নেই ঢাকার।’ এমন পরিস্থিতি দেশের প্রায় সব নগর-শহরেই বিরাজমান।

ইট-কংক্রিটের অবকাঠামো বৃদ্ধি, গাছপালা ও জলাধার কমে যাওয়ায় সবুজের সমারোহ বিলীন হয়ে ক্রমেই ধূসর হচ্ছে শহরগুলো। কংক্রিটের শহরগুলোতে বাড়ছে তাপমাত্রা। বর্তমানে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে নাগরিক জীবন ওষ্ঠাগত। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের যেসব এলাকায় সবুজের উপস্থিতি রয়েছে, সেসব এলাকার তাপমাত্রা তুলনামূলক কম। আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা একটি জনবহুল শহর। এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের জায়গা ও কর্মসংস্থান করতে গিয়ে প্রচুর অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। গাছপালা কমেছে। গরম থেকে বাঁচতে মানুষ এসি ব্যবহার করছে। এ শহরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যতম দায়ী গায়ে গায়ে লেগে থাকা ভবন-অবকাঠামো। খোলা জায়গা নেই বললেই চলে। ভবনগুলো এত কাছাকাছি নির্মিত যে বায়ু চলাচল করতে পারে না।

উন্মুক্ত পরিবেশে অট্টালিকা নির্মাণসামগ্রী রেখে পরিবেশ দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মাসের পর মাস ধরে নির্মাণকাজ চলাকালে সিমেন্ট-বালি-ভাঙা ইটের গুঁড়া-মাটির অংশবিশেষ বাতাসে মিশে দূষণ ছড়াচ্ছে। ত্রিপল-পলিথিন দিয়ে নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রেখে, ইট ও পাথরে পানি ছিটিয়ে, সিমেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করে নির্মাণকাজ করার বিধান থাকলেও অনেকের বিরুদ্ধে তা না মানার অভিযোগ রয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পানি সঞ্চয়ে বৃষ্টি প্রধান নিয়ামক হিসাবে বিবেচ্য। অনাবৃষ্টির এ কঠিন সময়ে ভবন নির্মাণে মাত্রাতিরিক্ত পানির উত্তোলন সমস্যাটিকে আরও কঠিন করে তুলছে। পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেলেও ব্যবসায়ী মনোবৃত্তির কমতি নেই। বিশাল আকারের ভবনের ভিত্তির কারণে পৃষ্ঠের পানিও নিচে নামতে পারে না। ভূপৃষ্ঠের পানি জমে জলাবদ্ধতা-বন্যা সৃষ্টি হলেও ভূগর্ভে তা পৌঁছুতে অক্ষম। তাছাড়া বেশকিছু শহরে সমুদ্রের লোনা পানি ব্যবহারে নগরবাসী অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। পর্যুদস্ত হয়ে পড়ছে রোগে-শোকে সামাজিক জীবনপ্রবাহ। পরিবেশ দূষণ-বিদ্যুৎ সংকট-শব্দদূষণে নাকাল অবস্থায় নিপতিত নাগরিকরা। কোথাও কোনো প্রতিবাদে এ মুনাফালোভী ব্যক্তিদের ন্যূনতম কর্ণপাত নেই। জনগণের সব সোচ্চার উচ্চারণকে চরম অবহেলা ও অবজ্ঞার চোখে দেখা হচ্ছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ন যেমন- নগরবাসীর জন্য নিরাপদ বাসস্থানের সংকট তৈরি করছে; তেমনিভাবে সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ক্ষতিসাধন করে স্বাভাবিক জীবনযাপনকে হুমকির সম্মুখীন করছে। তাই নগরবাসীর জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করাসহ সকল ধরনের নগর সুবিধার উপযুক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে জনপ্রতি কৃষি জমির পরিমাণ প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ হেক্টর এবং শহরগুলো প্রায়ই কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে গড়ে উঠে। 

বর্তমানে ঢাকা শহরের ৬২ শতাংশ ভূমিতে গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ ভূমিতে পরিকল্পনা অনুযায়ী এবং বাকি ৩৭ শতাংশে অপরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া আট শতাংশ ভূমিতে বাণিজ্যিক ও নয় শতাংশে প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। চার শতাংশ জায়গায় উন্মুক্ত জলাশয়সহ ১০ শতাংশ ভূমিতে গড়ে উঠেছে সেনানিবাস এবং দুই শতাংশে বিমানবন্দর। পরিকল্পিত কোনো মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় শহরের প্রাণকেন্দ্রে গড়ে উঠেছে বড় বড় প্রশাসনিক ভবন, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিমানবন্দর। শহরের ১২ শতাংশ জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা প্রভাব ফেলছে সামগ্রিক উন্নয়নে।

এক গবেষণায় বলা হয়, ৩৪ শতাংশ মানুষ নগরে বসবাস করে। অথচ গত ২০-২৫ বছরে নগরায়ন পরিকল্পিতভাবে হয়নি। যেখানে সেখানে ঘরবাড়ি উঠে যাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে নগরায়নের থাবা পড়েছে ফসলি জমির ওপর। কমে যাচ্ছে আবাদি বা ফসলি জমি। অনেক শহরে এ অবস্থা আশঙ্কাজনক। দেখা যাচ্ছে জমি কমে যাওয়ায় একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে আগামীর বসতির জন্য চরম হুমকি ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যা আমাদের দেশের জন্য মোটেও কোনো সুখকর খবর নয়।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT