জুলাই বিপ্লবের রক্তঝরা অধ্যায় পার করে বাংলাদেশ যখন ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক সূর্যোদয়ের মুখোমুখি, যখন গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্তে কোটি মানুষ ফ্যাসিবাদের পরাজয় ও শহীদদের ত্যাগকে স্মরণ করছে, ঠিক তখনই প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান এবং আমাদের জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পরোয়ানাভুক্ত, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে বসে রাজনৈতিক তৎপরতা ও সংবাদমাধ্যমে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় নজিরবিহীন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ঢাকা। একদিকে সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার কূটনৈতিক বুলি, অন্যদিকে বাংলাদেশের গণহত্যাকারী পলাতক আসামিকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে তোষণ করা—আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সৌজন্যতার চরম লঙ্ঘন। নয়াদিল্লির এই দ্বিচারিতা দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে তাদের আধিপত্যবাদী মানসিকতাকেই আবার প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। তবে তার চেয়েও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এ জাতীয় কৌশলগত ও সংবেদনশীল বিষয়ে বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমের স্থূল,দায়িত্বহীন ও অপেশাদার ভূমিকা।
বুধবার দিল্লিতে 'সাউথ এশিয়ান ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব' (FCC) আয়োজিত একটি সম্মেলনে শেখ হাসিনা অনলাইনে যুক্ত হয়ে সরাসরি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র, জুলাই বিপ্লব ও এ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়ান। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এর আগেই ঢাকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বার্তা দিয়ে বলা হয়েছিল—ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে যেন এমন কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম বা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয় যা বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। ৩ আগস্ট ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালোভাবে উত্থাপন করেছিলেন।
কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল যে,ঢাকার এই আগাম সংবেদনশীলতা ও সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক উদ্বেগকে আমলে নেয়নি দিল্লি। এর প্রেক্ষিতে বুধবার রাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে দিল্লির ভূমিকার ওপর তীব্র ক্ষোভ ও গভীর হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেছে:
"পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন। জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকীর দিনে ভারতীয় মাটিতে এই আয়োজন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গুরুতর অপমান।"
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে অস্বীকার করার চতুর অপচেষ্টাকে 'ইতিহাসের গতিপথ উল্টে দেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—জুলাই বিপ্লবের রক্ত দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ বা তাদের মাফিয়া চক্রের আর কোনো স্থান নেই এবং বাংলাদেশ আর কোনো রাষ্ট্রের তাঁবেদারে পরিণত হবে না।
বাংলাদেশের এই ধারাবাহিক উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভের আগ মুহূর্তে ভারত সরকার তাদের স্বভাবসুলভ দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল ৩ আগস্ট ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ একটি বেসরকারি সংবাদ সংস্থার উদ্যোগ এবং এতে ভারত সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
কিন্তু আমি মনে করি,আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি এক হাস্যকর ও স্থূল কূটনৈতিক গোঁজামিল ছাড়া আর কিছুই নয়। দিল্লিতে ভারতীয় সরকারের নজরে না রেখে কোনো আন্তর্জাতিক প্রেসে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে একজন শীর্ষ পলাতক আসামিকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে দেওয়া কখনোই "সরকারের সংশ্লিষ্টতাহীন" বিষয় হতে পারে না। উপরন্তু, আয়োজক সংস্থার প্রধান সরাসরি স্বীকার করেছেন—এ বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো আপত্তি নেই। বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক আপত্তিসত্ত্বেও এই সায় প্রদান প্রমাণ করে যে, দিল্লির সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স ও নীতিপ্রণেতারা জেনেশুনেই ঢাকার আবেগে আঘাত হেনেছে।
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে,বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কূটনৈতিক কাঠামোর অন্যতম বড় ভিত্তি ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty)। চুক্তি অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত বা গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত যেকোনো আসামিকে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করার স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কিন্তু গণহত্যার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার বহুবার আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানালেও ভারত তাতে কোনো সাড়া দেয়নি। একটি আইনি চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আন্তর্জাতিক পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাকে প্রকাশ্য রাজনীতি বা সংবাদমাধ্যমে কথা বলার মঞ্চ করে দেওয়া কোনো পেশাদার বা বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। ভারত মুখে "সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার" কথা বলে, কিন্তু কাজে তারা বারবার প্রমাণ করেছে যে, হাসিনা ও নির্দিষ্ট অনুগত গোষ্ঠীর প্রতি তাদের তোষণ নীতি এখনো বহাল।
কার্যতপক্ষে দেড় দশক ধরে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে একচেটিয়া সমর্থন দিয়ে ভারত বাংলাদেশের বাজার ও ভূ-রাজনীতিতে যে একচ্ছত্র সুবিধা ভোগ করেছে, সেই সুবিধাবাদী মানসিকতা থেকে ভারত আজও বের হতে পারছে না। তবে চব্বিশ-পরবর্তী বাস্তবতায় ভারতের এই এক চোখা নীতি কার্যত তাদের নিজেদের জন্যই চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিগত দুই বছরে বাংলাদেশ থেকে পর্যটক, চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ভারতে গমন তলানিতে ঠেকেছে। কলকাতার নিউমার্কেট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটসহ ভারতের বিভিন্ন বিখ্যাত বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো আজ বাংলাদেশি ক্রেতাদের অভাবে হাহাকার করছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা মোদি সরকারের এই অদূরদর্শী নীতির ওপর প্রকাশ্যেই ক্ষোভ ঝাড়ছেন।
নয়াদিল্লির এটা উপলব্ধি করা উচিত যে, আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের অনুগত বা নতজানু রাষ্ট্র নয়। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া যে জাতীয় মর্যাদা ও ভারসাম্যের পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলেছিলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারও সেই আত্মমর্যাদাশীল ধারা বজায় রেখে বিশ্ব দরবারে এগিয়ে যাচ্ছে। ভারত যত দ্রুত এই পরিবর্তিত সত্য মেনে নেবে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য তা তত বেশি কল্যাণকর হবে।
আরো দুঃখজনক ব্যাপার হলো যে,নয়াদিল্লির এই দ্বিমুখী ভূমিকা যতটা ক্ষতিকর, তার চেয়েও বেদনাদায়ক হলো আমাদের দেশীয় কিছু গণমাধ্যমের স্থূল ও দায়িত্বহীন প্রতিক্রিয়া।
রণধীর জয়সোয়ালের কূটনৈতিক ধোঁয়াশাপূর্ণ বক্তব্যের পর, বাংলাদেশের মূলধারার প্রায় সকল গণমাধ্যম কোনো প্রকার বিশ্লেষণ বা ব্যবচ্ছেদ ছাড়াই হুবহু শিরোনাম করেছে—"হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারত।"
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতীয় মুখপাত্রের ওই দায়িত্বজ্ঞানহীন বয়ান কীভাবে অবস্থান 'স্পষ্ট' করল? যেখানে বাংলাদেশ সরকার বারবার গভীর উদ্বেগ ও আপত্তি জানাচ্ছিল, সেখানে ভারতের স্থুল কৌশলগত এড়িয়ে যাওয়ার নীতিকে আমাদের গণমাধ্যম কেন 'ক্লারিফিকেশন' বা 'অবস্থান স্পষ্টীকরণ' হিসেবে বিনাবিচারে উপস্থাপন করল?
এখানে আমি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, সংবাদমাধ্যমের কাজ কেবল সরকারি বা বৈদেশিক প্রেস ব্রিফিং গিলে নিয়ে হুবহু ছেপে দেওয়া নয়। সংবাদের ভেতরের বস্তুতাত্ত্বিক সত্য, পেছনের রাজনীতি এবং তা জাতীয় স্বার্থকে কীভাবে প্রভাবিত করছে—তা বিশ্লেষণ করাই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা। আমাদের গণমাধ্যম এখানে মারাত্মক দেউলিয়াত্ব ও পেশাগত অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।
আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যাতে পলাতক শেখ হাসিনার কোনো অডিও বা উসকানিমূলক রাজনৈতিক বার্তা গণমাধ্যমে প্রচার না করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আদালতের আদেশ মানা গণমাধ্যম ও নাগরিকের আইনি দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের কিছু সংবাদমাধ্যমের এমন অপেশাদার ও অসচেতন আচরণ প্রমাণ করে যে, জাতীয় স্বার্থ ও অন্তর্নিহিত বস্তুনিষ্ঠতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তারা কতটা পিছ পিছিয়ে রয়েছে।
পরিশেষে বলতে চাই, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও হাজারো শহীদের রক্তের শিক্ষা হলো—এ দেশকে আর কখনো কোনো বৈদেশিক শক্তির কাছে তাঁবেদার হতে দেওয়া যাবে না। ভারতের মোদি সরকারকে অনুধাবন করতে হবে যে, মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামিকে লালন-পালন করে কিংবা তাকে উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মন জয় করা যাবে না। আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও হাসিনাকে দ্রুত হস্তান্তরের মাধ্যমেই কেবল সুস্থ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
একইভাবে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমকেও তাদের ঐতিহাসিক ও জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখার দায়িত্ব বুঝতে হবে। বৈদেশিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেস নোটের অন্ধ তোতাপাখি না হয়ে, সংবাদের পেছনের গভীর সত্য উন্মোচন ও জাতীয় জন-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। চাটুকারিতা ও অপেশাদারিত্বের যুগ শেষ—এখন প্রয়োজন আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতি এবং সাহসিকতাপূর্ণ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণাত্মক সাংবাদিকতা। তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা কখনোই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো না। সুতরাং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতির জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞাবান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এখনই আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]