পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে নদীতীর ভাঙনের মুখে পড়েছিল নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী গাওকান্দিয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বন্দ উষান বাজারসহ আশপাশের প্রায় আটটি গ্রাম। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শেষ হওয়ায় আপাতত স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয়দের মধ্যে। তবে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন ঠেকাতে টেকসই বেরিবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে আসার পর গাওকান্দিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নদী ও খালের তীরে ভাঙন শুরু হয়। এতে ভাদুয়া, চরপাড়া, বড়ইগড়া, আতলা, বহরবিটা, উদয়পুর ও শ্রীপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়ে। সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা তৈরি হয় দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী বন্দ উষান বাজারকে ঘিরে।
ভাঙন অব্যাহত থাকলে বাজার, বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি জানতে পেরে নেত্রকোণা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল জরুরি উদ্যোগ নেন। তাঁর উদ্যোগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে জরুরি বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়। পরে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার কার্যক্রম শুরু হয়।
সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার জিও ব্যাগ ফেলার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এতে নদীর তীব্র স্রোতের চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় ঝুঁকিপূর্ণ অংশে আপাতত বড় ধরনের ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, নদীভাঙন যেভাবে শুরু হয়েছিল, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পুরো গ্রাম হুমকির মুখে পড়ত। কায়সার কামালের উদ্যোগে বাঁধের ব্যবস্থা না হলে তাদের গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হতে পারত।
তিনি বলেন, প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়ায় তারা অনেক উপকৃত হয়েছেন। বাজারটি ভেঙে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি পুরো এলাকার মানুষ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তেন। বাজারের পাশে থাকা মসজিদটিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় ছিল। তবে স্থায়ীভাবে বাজার ও গ্রাম রক্ষায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস বলেন, নদীর বাঁধ না থাকলে বাড়িঘরসহ এ এলাকার মানুষকে অন্যত্র চলে যেতে হতো। কায়সার কামালের উদ্যোগে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়ায় তারা উপকৃত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বেরিবাঁধটি স্থায়ীভাবে নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করা জরুরি। নদীভাঙনের হাত থেকে বাড়িঘর, বাজার ও এলাকার মানুষকে রক্ষা করতে এ বাঁধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর কায়সার কামাল যদি বেরিবাঁধের ব্যবস্থা না করতেন, তাহলে এলাকার মানুষকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হতো। নদীভাঙনের মুখে থাকা বেশ কিছু বাড়িঘর এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, বন্ধু হোসেনের বাড়ি ও আমির উদ্দিন হাজীর বাড়ি থেকে আবু চান্দের বাড়ি পর্যন্ত অংশে দ্রুত বেরিবাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। ওই অংশে বাঁধ নির্মাণ না হলে অসংখ্য মানুষ নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও করাতকল মালিক মোহাম্মদ আলী বলেন, গাওকান্দিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সীমান্তবর্তী এ এলাকায় নেতাই নদীর অবস্থান। পাহাড়ি ঢলের পানি প্রায় মাসে দুই থেকে চারবার আসে। নদীটি খরস্রোতা ও ভাঙনপ্রবণ হওয়ায় প্রতিবছরই ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, নদীভাঙনে বন্দ উষান বাজার প্রায় বিলীনের পথে চলে গিয়েছিল। ইতোমধ্যে বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ জায়গা নদীগর্ভে চলে গেছে। মাত্র ১০ শতাংশের মতো জায়গা টিকে আছে। ফলে ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী চরম আতঙ্কে ছিলেন।
মোহাম্মদ আলী বলেন, কায়সার কামাল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর উদ্যোগ নেওয়ায় এখানে জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে বাজারটি আপাতত টিকে আছে। বাজারে একটি মসজিদ, একটি করাতকল বা স-মিল এবং কয়েকটি দোকানপাট রয়েছে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা না হলে এগুলোও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
তবে তিনি বলেন, জিও ব্যাগের এ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বন্দ উষান এলাকার নেতাই নদীর প্রায় দুই থেকে আড়াই-তিন কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ অংশে স্থায়ী বেরিবাঁধ ও নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে বাজার, মসজিদ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর রক্ষা করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল সালাম বলেন, বন্দ উষান বাজারে ব্লক ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা করায় এলাকাবাসী উপকৃত হয়েছেন। এ উদ্যোগের জন্য তিনি কায়সার কামালের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দুবরা ইউনিয়নে একটি বেরিবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ওই বাঁধের কারণে গাওকান্দিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নেতাই নদীর পাড়ের বাড়িঘর পাহাড়ি ঢল ও বন্যার সময় ঝুঁকিতে পড়ে। পাহাড়ি ঢলের পানি এলে অনেক সময় বাড়িঘরে পানি উঠে যায়।
আব্দুল সালাম আরও বলেন, যেকোনো সময় বড় ধরনের পাহাড়ি ঢল বা নদীভাঙন দেখা দিতে পারে। তাই নদীপাড়ের মানুষ ও বাড়িঘর রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী বেরিবাঁধ নির্মাণ করা জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর পাহাড়ি ঢল ও বর্ষার সময় এ অঞ্চলে নদীভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়। এবারও ভাঙন শুরু হলে বন্দ উষান বাজারসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ আতঙ্কে ছিলেন। সময়মতো জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় আপাতত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
তবে এলাকাবাসীর মতে, জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। নেতাই নদীর ভাঙনপ্রবণ অংশ চিহ্নিত করে স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ ও টেকসই বেরিবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
তাদের দাবি, বন্দ উষান বাজারসহ নেতাই নদীর ঝুঁকিপূর্ণ অংশে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা গেলে আশপাশের প্রায় আটটি গ্রামের হাজারো মানুষ নদীভাঙন, পাহাড়ি ঢল ও পানিবন্দি হওয়ার ঝুঁকি থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পাবেন।