ইনডিয়া কি বাংলাদেশকে চাপে রাখতে শেখ হাসিনা কার্ড খেলছে। না শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে পাঠাতে মনস্থির করেছে। কিংবা আঞ্চলিক ভু-রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে শেখ হাসিনা ইসু ব্যবহার করছে। ইনডিয়ার ভাবনা ইনডিয়ার। কিন্তু কি করবে না করবে তা ঠিক করার আগে বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় আনতে হবে। কোনটা বিবেচনায় নেবে সেটা ইনডিয়ার নিজস্ব বিষয়। ইনডিয়া যদি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কথা না ভাবে, তাহলে বাংলাদেশও নিজের মতো করে ভাবতে শুরু করবে। তবে একথা সত্য, বাংলাদেশের মানুষ কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা চায় না। চায় সৌহার্দ্য এবং শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক। তবে তা নির্ভর করবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আচরণ এবং আন্তরিকতার ওপর। কেননা বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। সম্পর্ক স্থাপনে তার ইচ্ছা, অনিচ্ছা দুটোই আছে। এখন ইনডিয়া কি শেখ হাসিনাকে প্রাধান্য দেবে না বাংলাদেশের জনগণকে। এই সিদ্ধান্ত ইনডিয়াকে নিতে হবে।
ইনডিয়াকে মনে রাখতে হবে বিবর্তিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের আর্থিক উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার লক্ষ্যে বড় কোনো শক্তির সঙ্গে গাটছড়া বাধে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বর্তমানে এই অঞ্চলের দেশ চায়না, বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উদীয়মান শক্তি হিসেবে পরিচিত। এবং বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা হয়ে দেখা দিতে পারে। সম্পর্ক স্থাপনে বিষয়টি ইনডিয়াকে নতুন বিবেচনা নিতে হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর থেকেই বাংলাদেশ ও ইনডিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অবনতি দেখা দেয়। দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইলেকশনের পর বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর দুই পক্ষ থেকেই সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু হয়। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে দুই পক্ষই আলোচনায় বসে।
কিন্তু না, কিছুদূর যেতে না যেতেই সবকিছু থমকে যায়। ইনডিয়ায় অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন সম্পর্কে নতুন মোড় নেয়। এর ফলে আগে থেকেই টানাপোড়েনের মধ্যে থাকা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নতুন করে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, ইনডিয়া শেখ হাসিনার মতো ‘দণ্ডিত গণহত্যাকারীকে’ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণার পর দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চলমান প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে এক প্রেসনোটে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়ায় তারা ‘ক্ষুব্ধ’। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে ‘বিষোদগার’ করেছেন। ‘ ইনডিয়ার মাটিতে শেখ হাসিনার এই কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা।’
অপরদিকে ইনডিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, ওই সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের সঙ্গে ইনডিয়া সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে দেয়া কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যকেও ইনডিয়া সমর্থন করে না। এ ছাড়া আরো জানান, ‘শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন থেকে ইনডিয়া সরকার নিজেদের দূরে রেখেছে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় বাংলাদেশের জনগণ আশ্বস্ত হতে পারেনি। কেননা ইনডিয়ার বর্তমান সরকারি দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য রাখছে। ‘তারা বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষকে কখনো উইপোকা, কখনো বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার হুমকি আবার কখনো উল্টো করে ঝুলিয়ে শায়েস্তা করার শাসানি দিচ্ছে।’ বিজেপি নেতারা এ ধরনের মন্তব্য মাঝেমধ্যেই করে আসছেন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের তার রাজ্যের পুলিশ গ্রেফতার করে বিএসএফের হাতে তুলে দেবে, তারপরে তারাই ওই কথিত অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে। এছাড়া তিনি আরো বলেছেন, হাসিনা ওয়াজেদ বৈধ প্রধান মন্ত্রী। হাসিনা ওয়াজেদ প্রধান মন্ত্রী হিসেবেই ঢাকাতে শাহজালাল এয়ারপোর্টে নামবেন। একটা দেশের সরকারি দলের লোকেরা যদি এ ধরনের কথা বলে তাহলে কি করে বুঝব বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায়। বাংলাদেশেও অনেকেই আছে ইনডিয়া বিরোধী কথা বলে। কিন্তু সরকারি দলের কোন নেতা বা মন্ত্রী পর্যায়ের কেউ ইনডিয়ার প্রতি বিষোদগার করে কোনো বক্তব্য রাখেনি।
তবে ইনডিয়া যা করছে তার সবটাই আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নিজের অবস্থান পোক্ত করার লক্ষ্যেই করছে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আমেরিকার কাছে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা বাংলাদেশের কাছাকাছি রয়েছে বিশ্বের দুটি বৃহৎ সামরিক শক্তিধর দেশ। এর একটি হচ্ছে চায়না। আরেকটি হচ্ছে ইনডিয়া। দুটির মধ্যে আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হচ্ছে চায়না। তাই চায়নার অগ্রসর ঠেকাতে বন্ধুত্ব হিসেবে বেছে নিয়েছে ইনডিয়াকে। আমেরিকা মনে করে এই অঞ্চলের রাজনীতি হচ্ছে অনেকটা তিনবাহুর সমষ্টি একটা ত্রিকোণের মতোই। এই ত্রিকোণের দুই বাহু যেদিকে থাকবে তারাই হবে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক। এই কারণেই আমেরিকা সম্প্রতি ইনডিয়ার সঙ্গে একটা সামরিক চুক্তির বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। এই চুক্তি করার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, চায়না। চায়নার অগ্রগতি থমকে দেয়ার জন্য করা হয়েছে, এই চুক্তি।
এ ছাড়া বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে বঙ্গোপসাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সমুদ্র পথটি যেই নিয়ন্ত্রণ করবে, তার হবে আগামীতে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক। কেননা এই সমুদ্র পথটি হলো এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ রেখা। এই পথ দিয়েই প্রায় চল্লিশ শতাংশের ওপর বাণিজ্য চলাচল করে। বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ অনুকূলে পাওয়ার জন্য আমেরিকা-ইনডিয়া যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব রাখার চেষ্টা চালিয়ে আসছে অনেক দিন ধরে। এই লক্ষ্যে একদিকে আমেরিকা-ইনডিয়া যৌথভাবে বাংলাদেশের সহযোগিতা চায়। অন্যদিকে চায়না বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা অবস্থান নিতে চায়।
ইনডিয়া মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণে ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর মালয়শিয়ায় আমেরিকা এবং ইনডিয়ার মধ্যে একটা সামরিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। কুয়ালা লামপুরে অনুষ্ঠিত অঝঊঅঘ প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠকে ইনডিয়ান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ যৌথভাবে ঘোষণা করেন এই ১০ বছরের নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মুক্ত ও উন্মুক্ত বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। চায়নার কৌশলগত প্রভাব প্রতিহত করা। পাকিস্তানের জিহাদি ও প্রক্সি যুদ্ধ নীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। এবং ইনডিয়ার নেতৃত্বে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলা।
আমেরিকা-ইনডিয়া সম্পাদিত সামরিক চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র বন্দরে নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এই নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, তার হাতেই থাকবে ইনডিয়া মহাসাগরের কর্তৃত্ব। তাই ইনডিয়া আমেরিকার সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করছে। বাংলাদেশ যাতে কোনোভাবেই চায়নার দিকে ঝুকে না পড়ে তা থেকে বিরত রাখা। এই বিরত রাখার লক্ষ্যে ইনডিয়া সরকার, শেখ হাসিনা কার্ড খেলছে। শেখ হাসিনাকে নিয়ে এর বাইরে আর কোনো চিন্তা করে না।
শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক।