ঢাকা | সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানি: বাজার ব্যবস্থার সংস্কার নাকি নতুন কোনো সিন্ডিকেটের পথ সুগম?

author
প্রকৌশলী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত : ১২ আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৮
ad003
দেশের মোট অভ্যন্তরীণ চাহিদার একটা বড় অংশ পূরণ করতে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। সাম্প্রতিক সময়ে এই আমদানির প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধরনের নীতির বদল ঘটিয়ে বেসরকারি খাতকে তেল আমদানির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি নীতি-নির্ধারণী মহলে জোর আলোচনায় এসেছে। সরকার যখন এটিকে ডলার-সংকট মোকাবিলা এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরছে, তখন খাতের বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং আমজনতার মনে দানা বাঁধছে নানা আশঙ্কা। বিশেষ করে, একটি নির্দিষ্ট বড় শিল্পগোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধা দিতেই পুরো প্রক্রিয়াকে নতুন ছাঁচে ঢালা হচ্ছে—এমন আলোচনা এখন জনপরিসরে তুঙ্গে। প্রশ্ন উঠেছে, বেসরকারি খাতে আমদানির এই সুযোগ দেশের পুরো জ্বালানি নিরাপত্তাকে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না।

আমদানির দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রেক্ষাপট ও বাজারচিত্র

এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একমাত্র সংস্থা হিসেবে জ্বালানি তেল আমদানির একচ্ছত্র সুবিধা ভোগ করে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা, স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বিশেষ করে ব্যাংকগুলোতে ডলারের চরম সংকট বিপিসির সরবরাহ শৃঙ্খলকে প্রায়শই টানটান উত্তেজনায় রাখছে। এমন পরিস্থিতিতে আমদানির ভার বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্তকে আপাতদৃষ্টিতে সময়োপযোগী মনে হতে পারে। সমর্থকদের যুক্তিতে বলা হচ্ছে—বেসরকারি খাত যুক্ত হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ডলারের ওপর বিপিসির একক চাপ কমবে এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা রক্ষা পাবে।

কেন উঠছে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধার অভিযোগ?

নীতিটি কাগজে-কলমে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত মনে হলেও বাস্তব চিত্র কিন্তু ভিন্ন। জ্বালানি তেল আমদানির জন্য যে পরিমাণ বিশাল মূলধন, সুবিশাল ট্যাংকার জাহাজ, বিশেষায়িত রিফাইনারি এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন অবকাঠামোর প্রয়োজন—তা দেশের দু-একটি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া ব্যবসায়িক গ্রুপ ছাড়া আর কারও হাতে নেই।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো নীতি নির্ধারণের আগেই একটি নির্দিষ্ট বড় শিল্পগোষ্ঠীকে (যেমন—বসুন্ধরা গ্রুপ) অবকাঠামোগতভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতেই কৌশলে নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের ভয়, সরকারি একচ্ছত্র আধিপত্য (Monopoly) থেকে বের হয়ে দেশ যদি কয়েকটি নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জিম্মি হয়ে পড়ে (Oligopoly), তবে তা বিপিসির একচ্ছত্র ক্ষমতার চেয়েও মারাত্মক ও বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি কোথায়?

ব্যক্তিখাতের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন, কোনো জাতীয় সামাজিক সেবা দেওয়া নয়। ফলে জ্বালানি খাত সম্পূর্ণ বাজারনির্ভর হয়ে পড়লে বেশ কয়েকটি বড় ঝুঁকি সামনে আসে:

১. দাম ও মজুতের ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতা:* আন্তর্জাতিক বাজারে দর বাড়লে বেসরকারি আমদানিকারকরা দ্রুত দেশের বাজারে দাম বাড়িয়ে দেবে, অথবা লোকসান এড়াতে আমদানি বন্ধ রাখবে। বিপিসি লোকসান গুনেও কৌশলগত মজুত রেখে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে, যা বেসরকারি কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা অসম্ভব।

২. মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপ:* দেশের পরিবহন, কৃষি (সেচ ব্যবস্থা) এবং শিল্পোৎপাদন পুরোপুরি জ্বালানি তেলের দামের ওপর নির্ভরশীল। বাজার ব্যবস্থার সঠিক তদারকি না থাকলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাতারাতি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার শঙ্কা থাকবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে।

৩. ডালাসের বিকল্প ব্যবস্থার নামান্তর:* বেসরকারি খাতকে নিজেদের ডলারে তেল আমদানির কথা বলা হলেও, শেষ পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাত থেকেই এই ডলার সংস্থান করা হবে। এতে করে নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংকগুলো থেকে সহজ শর্তে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়ার বাড়তি সুযোগ পাবে।

ভবিষ্যতের পথ ও সুপারিশ

জ্বালানি খাতকে কোনোভাবেই নির্দিষ্ট কোনো বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে সঁপে দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা যাবে না। যদি বেসরকারি খাতকে আনতেই হয়, তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অধীনে তা করতে হবে:

স্বাধীন ও শক্তিশালী রেগুলেটরি কমিশন:* বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তারা তেলের গুণগত মান, কৌশলগত মজুত এবং যুক্তিসঙ্গত মূল্য নির্ধারণে একক কর্তৃত্ব রাখতে পারে।

বার জন্য সমান সুযোগ (Level Playing Field):* কোনো বিশেষ সুবিধা বা ব্যাকডেটেড পলিসি বানিয়ে কোনো নির্দিষ্ট গ্রুপকে সুবিধা দেওয়া যাবে না। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হতে হবে।

কৌশলগত রিজার্ভ রক্ষা:* বেসরকারি খাত মোট চাহিদার একটি অংশ আমদানি করলেও, বিপিসিকে অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ নিজের হাতে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, যাতে যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটে বা দেশের ভেতরের কৃত্রিম অচলাবস্থায় সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে।

জ্বালানি কেবল সাধারণ কোনো বাণিজ্য পণ্য নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বিক সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ। ডলার সংকট বা বাজার সংস্কারের দোহাই দিয়ে এই খাতকে বেসরকারি সিন্ডিকেটের মুখোমুখি দাঁড় করানো কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষতা ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য না দিলে, এর চড়া মাশুল দিতে হবে দেশের সাধারণ জনগণকেই।

লেখক : প্রকৌশলী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম 

রিনিউয়েবল এনার্জি বিশেষজ্ঞ
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
JJD_Online

JJD_Online

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT