ঢাকা | সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেগম খালেদা জিয়া: আপোষহীন নেতৃত্বের নাম

author
মনোয়ারুল ইসলাম এনাম

প্রকাশিত : ১৩ আগস্ট, ২০২৬ বিকেল ৪:৫৯
ad003
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৫ আগস্ট একটি গর্বের দিন। এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন এমন একজন নেত্রী যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আপোষহীন শব্দটি। বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মহিয়ষী নারী, তিন তিন বারের সফল প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি’র চেয়ারপারসন ও ১৮ কোটি মানুষের আস্থাভাজন ছিলেন। তিনিই মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া। 

১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাত বরণের পর, তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারী সাধারণ সদস্য হিসাবে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর, খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি এরশাদের স্বৈরাচারের অবসান ঘটাতে ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোট গঠনের স্থপতি ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালের কারচুপির নির্বাচনের বিরোধিতা করেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। যদিও আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এরশাদের অবৈধ সরকারকে বৈধতা দেয়ার জন্য জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন শাসনের অধীনে নির্বাচনে যোগ দিয়েছিল। তার দৃঢ় সংকল্পের কারণে, তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক করা হয়েছিল । তিনি বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে শক্তিশালী একটি সংগঠনে পরিণত করেন যার ফলে তারা সারা দেশে ৩২১টি ছাত্র সংসদগুলোর মধ্যে ২৭০টি জয়লাভ করে । এই ছাত্ররা এরশাদের শাসনের পতনের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৮০ দশকে এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কঠোর বিরোধিতা এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণে তিনি ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এই সময় এবং শুধুমাত্র তৈরি পোশাকশিল্প খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯%। প্রায় দুই লাখ নারী এই সময় তৈরি পোশাকশিল্প খাতে যোগ দেন।

১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। যদিও বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুনের নতুন নির্বাচনে হেরে যায়, দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন পায় সেই নির্বাচনে।

১৯৯৯ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বেবিএনপি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সাথে চারদলীয় জোট গঠন করে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। ফোর্বস ম্যাগাজিন নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাকে ২৯ নম্বরে স্থান দেয়।

তিনি ক্ষমতায় থেকেও বুঝতে পেরেছিলেন সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, এর জন্য তিনি নিজের ক্ষমতা কমিয়ে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ আইন করে গেছেন। যা আজও মানুষের ভোটাধিকারের প্রতীক। 

২০০৭ সালে ১/১১ এর সময় তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল-রাজনীতি ছেড়ে পরিবার নিয়ে বিদেশে চলে যেতে হবে কিন্তু তিনি তখন বলেছিলেন আমি আমার স্বামীর কবর, জনগণ ও দেশ ছেড়ে চলে যাব না। এরপর ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুর্নীতির তুচ্ছ এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে স্বৈরাচারী সরকার গ্রেপ্তার করে। 

২০১৮ সালে ৭৫ বছর বয়সে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার বলেছে বিদেশের উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু শর্ত একটাই-রাজনীতি ছাড়তে হবে। সেই শর্তটি প্রত্যাখ্যান করেছেন দীর্ঘ ০৬ বছর ধরে। কারণ তার কাছে নিজের জীবনের চেয়ে দেশের স্বাধীনতা, দেশের জনগণ ও দলের আদর্শ মূখ্য ছিল। 

কঠোর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোনো চাপ, লোভ তার সিদ্ধান্তকে বদলাতে পারেনি। বিএনপির তৃণমুলের প্রতিটি কর্মীর খোঁজ রাখতেন তিনি। তাই সবাই তাকে ‘মা’ ডাকতেন। নারী শিক্ষা, উপ-বৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক তার হাত ধরেই বাস্তবায়িত হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্ব নেতারা তাকে অনেক সম্মান করতেন। 
জুলাই ছাত্র-জনতা যে আপোষহীনহতা দেখিয়েছে তাঁ শিক্ষক ছিলেন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া। আবু সাইদ, মুগ্ধ, অসীম যে ভাবে বুক পেতে দিয়েছিলেন ঠিক একইভাবে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াও ৩০ বছর ধরে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুকপেতে রেখেছিলেন। 

এবারে তার জন্মদিনে আমরা কেক কাটবো না, আমরা তার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করবো, আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেস্তের  সর্বোচ্চ মর্জাদা দান করেন। আমরা শপথ নিবো তার দেখানো আপোষহীন নেতৃত্বের পথে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো। তিনি প্রমাণ করেছেন নেতৃত্ব মানে পদ না নেতৃত্ব মানে ত্যাগ স্বীকার করা। তার নামই মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া।

লেখক পরিচিতি: 

কৃষিবিদ মো: মনোয়ারুল ইসলাম এনাম 
যুগ্ম-মহাসচিব 
জিয়া পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT