গাফফার খান চৌধুরী
বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে দলের তরফ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি মনিটরিং সেল খোলা হয়েছে। সেলগুলোতে জমা পড়া অভিযোগ সংশ্লিষ্ট জেলা বিএনপির দায়িত্বশীলদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে এসব বিষয়ে দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে দলের হাইকমান্ডকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে সাতক্ষীরায় ১ হাজার ৩২০ বিঘা জমি দখলের চেষ্টার সূত্রধরে এমন তথ্য সামনে এসেছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। শুধু সাতক্ষীরা না, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এমন নানা অভিযোগ জমা পড়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় অভিযোগ কেন্দ্র ও মনিটরিং সেন্টারে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পরিকল্পিতভাবে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতেই এমনটা করা হচ্ছে বলে দাবি করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার খলিশাখালির এলাকার কথিত ভূমিহীন ও বিএনপি নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে ১ হাজার ৩২০ বিঘা জমি দখলের অভিযোগ ওঠেছে। জমির মূল মালিক প্রায় ৩০০ জন। ফ্যাসিস্ট সরকারের লোকজন ২০২১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ‘শেখ মুজিব নগর খলিশাখালি ভূমিহীন আবাসন কেন্দ্র’ এর নামে ওই জমি দখল করেছিল। পরে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। গত বছরের ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকার বিদায় নেয়।

পরে আদালতের নির্দেশে ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় মূল মালিকরা জমি ফিরে পান। গত বছরের ৮ আগস্ট সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়। এর সুযোগ নেয় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। তারা সুযোগ বুঝে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল সকাল ৮টার দিকে জমিতে থাকা মাছের ঘেরে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লুটপাট চালায়।
এ ঘটনায় গত ২৭ মে সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ৭ নম্বর আমলী আদালতে একই উপজেলার হাজী কেয়ামুদ্দীন মেমোরিয়াল মহিলা কলেজের জীব বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীম আরা (৫৫) একটি মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সাতক্ষীরা জেলার পুলিশ সুপারকে চলতি বছরের ২৪ জুনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
ঘটনাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা সাতক্ষীরা জেলার তালা সার্কেলের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার হাসানুর রহমান তদন্ত করছেন। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা যায়যায়দিনকে বলেন, পুলিশ শুধুমাত্র ফৌজদারি আইনে দায়েরকৃত মামলার তদন্ত করছে। যথাসময়ে তদন্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করা হবে। তদন্তে কে কোন দলের তা দেখার সুযোগ নেই। যে বা যারা দোষী, তাদের বিরুদ্ধেই রিপোর্ট দেওয়া হবে। অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
যায়যায়দিনের হাতে আসা নথিপত্র মোতাবেক মামলার বাদি শামীম আরা। দায়েরকৃত মামলায় আনারুল ইসলাম, রবিউল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, রবিউল ইসলাম বুল্যা, রিপন গাজী, রাজু গাজী, শেখ মনিরুল ইসলাম ওরফে মনি ঢালী, গোলাপ ঢালী, আরিফ পাড়, করিম পাড়, বাবুল গাজী, তুকাম গাজী, শাহাদাত হোসেন, লুৎফর রহমান, শফি ঢালী, আব্দুল হালিম ওরফে পকরা হালিম, মনিরুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম গাজী, আব্দুল মজিদ গাজী, আয়ুব গাজী, ইউনূছ আলী গাজী, জব্বার ফকির, মো. নুর আলী, মো. ইছাদ আলী, এসএম মহিউদ্দীন, আবুল মোড়ল, সৌমেন ঘোষ ও মো. আবুল হোসেনসহ মোট ২৮ জনকে আসামী করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামীদের বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজি, বোমাবাজি ও দ্রুত বিচার আইনে মামলা আছে। গত ২১ এপ্রিল সকালে আসামীরা পরষ্পর যোগসাজশে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওই জমিতে থাকা মাছের ঘেরে ঢুকে। তারা অস্ত্র প্রদর্শন করে মহড়া দেন। মাছের ঘেরগুলো পরিচালনা করতে হলে তাদের ২০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে। দাবিকৃত টাকা ৭ দিনের মধ্যে দিতে হবে বলে সন্ত্রাসীরা হুমকি দেয়। আসামীরা ঘেরের পাহারায় থাকা লোকজনের কাছ থেকে মাছ বিক্রির দেড় লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। ঘেরে থাকা সব স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়। এতে অন্তত ৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ভ’মি মালিকদের অভিযোগ, সাতক্ষীরার দেবাহাটার উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ সিরাজুল ইসলাম। তার যোগসাজশেই সন্ত্রাসীরা বর্তমানে মাছের ঘের ও ভ’মি দখল করে রেখেছে। এ ব্যাপারে চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, আমি পারুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ছিলাম। কমিটি ভেঙ্গে আহ্বায়ক কমিটি করলে সেই কমিটির সদস্য সচিব ছিলাম। বর্তমানে আমি সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য।
তার দাবি, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা। যা একেবারেই রাজনৈতিকভাবে আনা হয়েছে। সাতক্ষীরার রাজনীতি একটু অন্য রকম। যেটি অনেকেই বুঝতে পারেন না। তবে আমি কোনভাবেই জমি বা মাছের ঘের দখলের সঙ্গে জড়িত না। এমনকি দখলকারী বা দখলের চেষ্টাকারীদের সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ নেই। তাদেরকে আমি চিনি না। মূলত বিএনপির রাজনীতিবিদদের সর্ম্পকে দূর্নাম ছড়াতে এবং স্থানীয়ভাবে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতেই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে একটি গোষ্ঠী এসব করাচ্ছে।
মামলার বাদি শামীম আরার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, মূলত কথিত ভ’মিহীন ও বিএনপি নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে জমি দখল করেছে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। এর সঙ্গে সত্যিই বিএনপি বা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জড়িত কিনা তা তিনি নিশ্চিত নন। আর যেসব ভ’মিহীনদের নাম ভাঙ্গিয়ে জমি দখল করা হয়েছে, তারা সত্যিকারের ভ’মিহীন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কথিত ভ’মিহীন ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম ভাঙ্গিয়ে জমির দখলের ঘটনাটি ঘটেছে। জমিটি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান ৫ বছরের জন্য লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছিলেন। ৬ মাস পরেই লিজের চুক্তিপত্র ফেরত দেন। এমন সুযোগে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা জমি দখলে নেয়। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হলে সারাদেশে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১ নভেম্বর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী খলিশাখালিতে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চালায়। অভিযানে অস্ত্রগোলাবারুদ উদ্ধার হয়। ওই সময় গণপিটুনিতে কামরুল ইসলাম নামের এক স্থানীয় সন্ত্রাসী নিহত হন। তিনি এলাকার নামকরা ডাকাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় সন্ত্রাসী রবিউল, আনারুল ও রিপনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা এলাকায় রীতিমত ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে মাদক ব্যবসা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্তক আছে। নিয়মিত এলাকাটিতে অভিযান চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমির মালিকরা বিষয়টির বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাতক্ষীরা-৩ আসনের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ডা: শহিদুল আলমকে অবহিত করেন। এ ব্যাপারে বার বার ডা. শহিদুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মঙ্গলবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত স্থানীয় বিএনপির তরফ থেকে বিষয়টির কোন সুরাহা বা মীমাংসা হয়নি। এজন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভ’ক্তভোগীরা।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমতুল্লাহ পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, পুরো ঘটনার সঙ্গে বিএনপির একজন সাবেক চেয়ারম্যান আজিজুর রহমানের জড়িত থাকার কথা শোনা যাচ্ছে। তবে বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার না। এ ব্যাপারে আরো খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এখন সবাই বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে নানা ধরণের দখলবাজিতে নেমেছে। মূলত দেশবাসীর কাছে বিএনপির ভাবমূর্তি পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করতেই একটি গোষ্ঠী এসব কাজ করাচ্ছে।
তিনি বলেন, কোন ধরণের দখলের সঙ্গেই বিএনপি নেতাকর্মী জড়িত না। বিষয়টি নিয়ে দলীয়ভাবে তদন্ত চলছে। যদি কোন বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী জড়িত থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে দলের হাইকমান্ড থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। ইতোপূর্বে মনির নামের এক দলীয় নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কোন ধরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে না। এলাকাটিতে একটি রাজনৈতিক দলের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। ওই রাজনৈতিক দলের লোকজনই পরিকল্পিতভাবে দেশবাসীর কাছে বিএনপির ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে কিনা সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর বিএনপির দক্ষিণের একজন শীর্ষ নেতা ও ঢাকা-৪ আসনের বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বর্তমানে বিএনপির ভাবমূর্তি দেশবাসীর কাছে খুবই উজ্জ্বল। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধীরা পরিকল্পিতভাবে বিএনপির নামে পরিকল্পিতভাবে দূর্নাম রটানোর চেষ্টা করছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি ও দখলের ঘটনা ঘটাচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহল। যাতে করে দেশবাসীর কাছে দলটির ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এ ব্যাপারে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন। সত্যিকার অর্থেই দলের কেউ এ ধরণের অপকর্মে জড়িত থাকলে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের সহকারি মহাপরিদর্শক ইনামুল হক সাগর যায়যায়দিনকে বলেন, অনেকেই সুবিধাজনক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম ভাঙ্গিয়ে দখল ও চাঁদাবাজি করার চেষ্টা করছেন। তদন্তে দেখা গেছে, এ ধরণের অপকর্মে জড়িতদের অধিকাংশই ওইসব দলের নেতা বা কর্মী না। এসব অপকর্মে জড়িতরা পেশাদার অপরাধী। তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত থাকবে। গত ১৬ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় ১ হাজার ৬২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তাদের কাছে পাওয়া গেছে দেশী-বিদেশী অস্ত্রগোলাবারুদ। এসব অস্ত্রগোলাবারুদ গ্রেফতারকৃত চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ নানা ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ব্যবহার করত।