ব্যারিস্টার মঈন ফিরোজী
যুগে যুগে বহু নেতৃত্ব এসেছে যাদের কথার ফুলঝুরিতে মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছে, যাদের দেশের জন্য আত্মত্যাগও অনস্বীকার্য; কিন্তু দেশ ও মানুষের সত্যিকার ভাগ্য পরিবর্তনে যে কজন কার্যকর ও অর্থবহ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিঃস্বন্দেহে সবার ওপরে। আজকের বাংলাদেশ যে ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে তার গোড়াপত্তন ও মজবুতকরণে শহিদ জিয়ার যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলোই মূলত কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এ জন্য আজও দলমত নির্বিশেষে আপামর জনতা ব্যক্তি জিয়াকে গভীরভাবে ভালোবাসে, তাকে ধারণ করে হৃদয়ের গভীরে।
শহিদ জিয়া কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী, এ পিওর ম্যান অফ একশন। ইতিহাসের আবর্তে ঘটনা পরিক্রমায় অনেকেরই সুযোগ আসে জাতীয় জীবনে অবদান রাখার। কিন্তু কিছু ব্যক্তি নিজেই রচনা করেন ইতিহাসের, পথ দেখান দেশ ও জাতিকে। শহিদ জিয়া তেমনি বাংলাদেশের এক মহানায়ক যিনি আবির্ভূত হয়েছেন ত্রাণকর্তা হিসেবে ইতিহাসের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে এবং যিনি নিজেই দায়িত্ব নিয়ে আপন কর্মে প্রতিটি জাতীয় সংকট মোকাবিলা করেছেন। রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তার না ছিল রাজনীতিবিদদের মতো চর্চা, না ছিল কোনো বাধ্যবাধকতা; কিন্তু তিনি বিবেকের তাড়নায় দেশের প্রতিটি জাতীয় সংকটে দৃঢ়চিত্তে নেতৃত্বশূন্যতা পূরণ করে জাতিকে সঠিক পথে পরিচালনা করেছেন।
শহিদ জিয়া জীবনে কখনো সংকট থেকে দূরে থাকেননি এবং নির্ভীকভাবে ঝাপিয়ে পড়েছেন যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায়। কর্মজীবনের সূচনায় তার প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৬৫ সালের ইনডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দিয়ে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পুরস্কার ‘হিলাল-ই-জুরাত’ খেতাবে ভূষিত হন, যা ঘটনাচক্রে লাল সবুজের ফিতা দ্বারা সজ্জিত।
১৯৭১ সালে আমাদের দীর্ঘ দিনের মুক্তি সংগ্রামকে যে দুটি ঘটনা নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তর করেছে, তার দুটোই ঘটেছে শহিদ জিয়ার হাত ধরে। প্রথমত, চট্টগ্রামের সেনা বিদ্রোহ, দ্বিতীয়ত, কালুরঘাটের স্বাধীনতার ঘোষণা।
মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়েছে দেশের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি জায়গাসহ চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেনা বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে যার সর্বাগ্রে শহিদ জিয়া নেতৃত্ব দিয়েছেন। কোনো রাজনৈতিক নেতার পরিকল্পনা বা প্ররোচনায় তিনি এ পদক্ষেপ নেননি। নিতান্তই দেশপ্রেম, সহজাত প্রবৃত্তি এবং দূরদৃষ্টি থেকেই এক জন অনুগত ও সর্বোচ্চ পদকপ্রাপ্ত সেনা অফিসার হয়েও ক্ষণিকের জন্যও তিনি দ্বিধা করেননি বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নিতে। যেখানে সব স্তরের রাজনৈতিক নেতারা সে সময়ে দিগি¦দিক হয়ে ছুটে পালিয়েছে কিংবা আত্মসমর্পণ করেছে, সেখানে অকুতোভয় ৩৫ বছরের যুবক মেজর জিয়া অল্পসংখ্যক সৈনিকদের নিয়ে একটি পুরো সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। তার সেদিনের এ অসীম সাহস জাতি হিসেবে যে আমরা অকুতোভয় তার স্বাক্ষর বহন করে এবং আমাদের যুবাদের এ সাহসীকতাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত প্রেরণা।
এক জন জন্মগত নেতা মেজর জিয়া বিদ্রোহ করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি অবিলম্বে সহজাত নেতৃত্বের তাড়নায় কাধে তুলে নেন দেশবাসীর কাণ্ডারির দায়িত্বে। জাতির এ চরম ক্রান্তিলগ্নে যখন ৭ কোটি জনতা নেতৃত্বশূন্য ও গভীর বিপদে পতিত, তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করেন সে কালজয়ী অমিয় বাণী, ‘আই, মেজর জিয়াউর রহমান ডু হিয়ারবাই ডিক্লেয়ার দি ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ বাংলাদেশ।’
শহিদ জিয়ার কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বক্তব্যকে শুধু একটি ঘোষণা হিসেবে দেখিয়ে এর গুরুত্বকে খাটো করা হয়। ওই সময়ে এক জন সামরিক কর্মকর্তার স্বাধীনতার ঘোষণা চরম হতাশার মাঝে সারা দেশে নতুন আশার সঞ্চার করে সমগ্র জাতিকে একত্রিত করেছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় সামরিক, আধাসামরিক অফিসার এবং জোয়ানদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়াতে উদ্বুদ্ধ করতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। শহিদ জিয়ার কালুরঘাটের ঘোষণা একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তিনি তার কর্মেই প্রমাণ করেছেন তিনি কতটা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। যখন নেতৃত্বের প্রয়োজন এবং যে কাজটি যে সময়ে করা প্রয়োজন তিনি সে সময়ে সঠিকভাবে সে কাজটিই করেছেন।
তিনি স্বাধীনতার ঘোষণার পর জেড ফোর্সকে নেতৃত্ব দিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ জয় করেছেন, অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা, পেয়েছেন বীর-উত্তম খেতাব। কথা নয় কাজে বড়, শহিদ জিয়াউর রহমান তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি যা করেছেন তা সবটাই দেশের জন্য। তাই, যুদ্ধোত্তর দেশে তিনি স্বকর্মস্থলে ফিরে গিয়ে নিজ দায়িত্ব পালনে স্বচেষ্ট থেকেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এত বড় অবদানের পরও ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে তিনি কোনো চেষ্টাও করেননি। কয়জন ব্যক্তির আছে এমন বদান্যতা!
৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশকে বিপথগামী হওয়া থেকে বাচাতে এবং দেশ রক্ষার্থে, শহিদ জিয়া আবার মানুষের পাশে দাড়ান। ক্ষমতা নয় রাষ্ট্র গঠনই ছিল তার লক্ষ্য। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্য থাকলে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠা করে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন ছিল না। তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী বলে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, দ্রুত সময়ে তুলে নেন সামরিক শাসন।
১৯৭৭ সালে ৪১ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেশ গঠনে মনোনিবেশ করেন। শক্ত হাতে হাল ধরেন দেশের, ঝাপিয়ে পড়েন দেশকে এগিয়ে নেয়ার নেতৃত্বে। রাষ্ট্র গঠনের প্রতিটি কর্মসূচিতে তিনি নিজে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন, ছুটে গিয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
শহিদ জিয়ার সবচেয়ে বড় কর্ম হচ্ছে- মেধার মূল্যায়ন। তিনি সব জায়গায় মেধাবী ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিয়েছেন যা পরবর্তীতে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নামক অপবাদ থেকে দেশকে একটি সম্মানের জায়গায় স্বল্প সময়ে পৌছাতে সহায়তা করেছে। ঔপনিবেশিক আমল থেকে দীর্ঘ সংগ্রামের পরিক্রমায় আমরা ভুলতে বসেছিলাম আমাদের স্বকীয়তা, আত্মমর্যাদা। জাতি হিসেবে আত্মসম্মানের জায়গা তৈরিতে শহিদ জিয়া রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি নতুন উচ্চতায় জায়গা করে নিয়েছে শহিদ জিয়ার কূটনৈতিক পারদর্শিতায়।
এক জন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ দেশকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাড় করিয়েছে। গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্প্রবর্তন, শিক্ষার অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক ভিত্তি, গ্রাম ও কৃষি উন্নয়ন, অবকাঠামোগত পরিকল্পনা, পরবর্তী সরকারগুলোকে দেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করেছে। যুদ্ধোত্তর ও দুর্ভিক্ষ পীড়িত দেশ মাথা উচু করে ঘুরে দাড়াতে শিখেছে শহিদ জিয়ার সৎ, দৃঢ়, নির্ভীক, সাবলীল, দূরদৃষ্টি ও দেশপ্রেম নির্ভর রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বে।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভূত হয়েছেন শহিদ জিয়াউর রহমান। যার হাত ধরে বাংলাদেশ একটি উপনিবেশ থেকে একটি মর্যাদাশীল দেশ হয়ে উঠেছে। একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক যিনি দুর্যোগে দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অকুণ্ঠচিত্তে।
৪৫ বছরের ক্ষণজন্মে তিনি তার জীবন ও কর্ম দিয়ে এ জাতিকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, বিগত ৪৪ বছর ধরে আমাদের জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে তার ছোয়া গভীরভাবে আমরা অনুভব করি। আমরা এখনো তার প্রকৃত মূল্য না বুঝলেও, ইতিহাস সব সময় তাকে মূল্যায়ন করবে বিনম্র শ্রদ্ধায়।
ব্যারিস্টার মঈন ফিরোজী : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী