কয়রা(খুলনা) প্রতিনিধি
খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের মিষ্টি পানির জন্য পরিচিত সরকারপুকুরে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অবশেষে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১৮ লাখ টাকার প্রকল্পে নির্মিত হয় একটি ভাসমান সেতু, যা এলাকায় আশার আলো হয়ে এসেছিল।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্মাণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় ভেঙে পড়েছে সেতুটি। এতে চলাচলের সময় কয়েকজন পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সরকারপুকুর বা ‘মিষ্টি পুকুর’ এলাকাটি কয়েক গ্রামের পানির অন্যতম উৎস। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’-র পর পুকুরের রাস্তাটি ধ্বংস হয়ে গেলে দীর্ঘ ১১ বছর স্থানীয়রা ভিজে পথ পেরিয়ে বা সাঁতার কেটে পানি সংগ্রহ করতো। কৃষিকাজেও এই পুকুরের পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২১-২২ অর্থবছরে "লোকাল গভর্নমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (LoGIC)" প্রকল্পের আওতায় ১৮,৪৯,৩৭১ টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়, যা শেষ হয় ২০২৩ সালের জুনে। এলাকাবাসী কিছুটা স্বস্তি পেলেও সেই স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
‘নিম্নমানের সামগ্রীতে ভরপুর ছিল সেতু’: এলাকাবাসীর অভিযোগ
মহেশ্বরীপুর গ্রামের মো. আবু মুসা শিকারী বলেন, “সেতুর ওপর টিনের পাত এমন নিম্ন মানের ছিল যে, ছয় মাসেই সব উঠে যায়। হাতলগুলোও ছিল অত্যন্ত দুর্বল।”আরিফ মোল্লা নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,“এ সেতু করে আমাদের সঙ্গে যেন ঠাট্টা করা হয়েছে। আমরা রাস্তা চেয়েছিলাম, তারা ভাসমান সেতু দিলো—তাও আবার ছয় মাসেই ভেঙে গেল।”
‘১৮ লাখ টাকায় আরও টেকসই রাস্তা সম্ভব ছিল’ স্থানীয়দের দাবি, ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এমন ভঙ্গুর সেতু নয়, বরং একটি টেকসই রাস্তা নির্মাণ করা যেত। এলাকাবাসী শুরু থেকেই বালু ফেলে রাস্তা তৈরির দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেই দাবি উপেক্ষা করে ভাসমান সেতুর দিকেই যায়।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, “১৮ লাখ টাকায় সেতু নির্মাণ করে যদি তা ছয় মাসেই নষ্ট হয়, তবে সেটা নিঃসন্দেহে জনস্বার্থের অপচয়। বাজেট জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত এবং কাজের আগে সঠিক পরিকল্পনার দরকার ছিল।”
LoGIC প্রকল্পের ফ্যাসিলিটেটর মো. আহসান উল্লাহ বলেন, “আমরাও শুনেছি সেতুটি নষ্ট হয়ে গেছে। এলাকায় লবণাক্ততার কারণে ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে। প্রকৃতপক্ষে পুরো ১৮ লাখ টাকা সেতুর জন্য নয়, বরং তা কমিউনিটি ও অন্যান্য খাতসহ যৌথ ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ ছিল।”প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল জনসেবার, কিন্তু বাস্তবে তা এখন এলাকায় নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই ব্যর্থ প্রকল্পের বিস্তর তদন্ত করা হোক এবং ভবিষ্যতে টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করা হোক, যাতে করে একদিকে অর্থ অপচয় বন্ধ হয়, অন্যদিকে জনগণ প্রকৃত সুবিধা পায়।