পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের জালিয়ার চাং এলাকায় পাহাড় কেটে ফেলার ঘটনায় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে তিনটি অসহায় পরিবার। পাহাড় ধসের আতঙ্ক, ভাঙনের আশঙ্কা আর অজানা বিপদের ভয়ে দিন-রাত কাটছে তাদের। দীর্ঘ ১৫ দিন ধরে প্রতিটি রাতে মাটি সরে যাওয়ার শব্দ যেন তাদের কাছে মৃত্যুর অশনিসংকেত হয়ে ধরা দিচ্ছে।
মৃত্যুঝুঁকিতে বসবাস করা পরিবারগুলো হলো—মৃত আবদুল খালেক, আবদুল মালেক ও মোহাম্মদ সুইয়াবের পরিবার। পাহাড় কেটে ফেলার পর তাদের বসতঘরের চারপাশের মাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় ভূমিধস নেমে ঘরবাড়ি মাটির নিচে চাপা পড়ার আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রবাসী আমান উল্লাহ, আবু তাহের, বাচ্ছু, শাহাদাত ও ইসমাইল নামে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড় নিধনের অভিযোগ থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর।
এলাকাবাসী আরও জানান, স্থানীয় দালাল অলী আহমদের মাধ্যমে ম্যানেজ হয়ে টৈটং বনবিভাগের বিট কর্মকর্তা মোঃ এহেসান অঘোষিতভাবে এসব পাহাড় কাটার অনুমোদন দিয়ে থাকেন। ফলে প্রকাশ্যেই পাহাড় কাটা হলেও তা বন্ধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
পাহাড় কেটে ফেলার ফলে এখন তিনটি পরিবার একপ্রকার ভাঙনের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের দেয়ালে ফাটল, উঠানে মাটি দেবে যাওয়া, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মাটি গড়িয়ে পড়া—এসব দৃশ্য তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে গেছে পরিবারের সদস্যদের। রাত নামলেই বাড়ে আতঙ্ক, বুক কেঁপে ওঠে কখন যে সবকিছু শেষ হয়ে যায় সেই অজানা ভয় তাদের তাড়া করে বেড়ায়।
ভুক্তভোগী মোহাম্মদ সুইয়াব জানান, জালিয়ার চাংয়ের পাহাড়টি বহু বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী স্থান। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘আসমানের খুঁটি’ নামে পরিচিত। আল্লাহর সৃষ্টি এই পাহাড় কেটে ফেলায় তারা এখন চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন। প্রতিবাদ করতে গেলেই পাহাড়খেকোদের পক্ষ থেকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী আবদুল খালেকের স্ত্রী জানান, পাহাড়টি এমনভাবে কেটে ফেলা হয়েছে যে যেকোনো মুহূর্তে তাদের ঘর ধসে পড়তে পারে। বাড়ির পাশে সামান্য নিরাপদ দূরত্ব রেখে পাহাড় কাটার অনুরোধ জানালে উল্টো অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজের শিকার হতে হয়েছে তাদের।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি একাধিকবার অবগত করা হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে ক্ষোভ ও হতাশা আরও গভীর হয়েছে তাদের মধ্যে। নিজেদের জীবন রক্ষায় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।
এর আগেও একই সিন্ডিকেট টৈটং গুধিকাটা এলাকায় প্রকাশ্যে একটি পাহাড় কেটে সাবাড় করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার থেকে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেয় বলে স্থানীয়রা জানান। তবে বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছেন তারা।
জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় দিন গুনছে তিনটি পরিবার। তাদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—কেউ কি তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসবে, নাকি একদিন হঠাৎ করেই পাহাড় ধসে সবকিছু মাটির সঙ্গে মিশে যাবে?