ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের কেন্দুয়াই গ্রামের বাসিন্দা মোশতাক আহমদ। পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিজ থিওলজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে। স্কলারশিপ পেয়ে তিনি সেখানে পড়ার সুযোগ পান। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ থেকে মিশরের উদ্দ্যশ্যে রওয়ানা হন।
লেখাপড়া করার স্বপ্নই যেন দুঃস্বপ্নই ছিলো মোশতাক আহমদের। এই শিক্ষার্থীর পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তবে মোশতাকের মেধা সেই প্রতিক‚লতাকে পিছনে ফেলে সুযোগ করে দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় মিশরের আল আযহারে পড়ার।
মোশতাকের বাবা মানিক মিয়া ছিলেন দিন মজুরির শ্রমিক। দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে তিনি অসুস্থ। এখন আর কোনো কাজ করেন না। মা নাসিমা বেগমের উপরই সংসারের ভার। নানা রকমের চেষ্টা আর জমি অধিগ্রহন হওয়ায় সেটা থেকে পাওয়া টাকায় চলে তাদের সংসার। তবে চার সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে বেশ হিমশিম খেতে হয়। তবে ইতিমধ্যে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন।
মোশতাকের শিক্ষা জীবনের সূচনা হয় আখাউড়ার আনন্দপুর নাসিরুল উলুম ইসলামিয়া মাদরাসায়। মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাদুঘরের জামিয়া সিরাজিয়া দারুল মাদরাসায়। পরে ঢাকার উত্তরার জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে। সেখান থেকেই স্কলারশিপ পেয়ে মিশরের যাওয়ার সুযোগ হয়।
স্কলারশিপের সুবাদে বর্তমানে মিশরের ঐতিহ্যবাহী আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক থিওলজি বিভাগে পড়াশোনা করছে মোশতাক।
গ্র্যাজুয়েশনের প্রথম সেমিস্টারের প্রত্যেকটি বিষয়ে এ প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন হতে এখনো তিনটি সেমিস্টার বাকি। এজন্য আরো প্রায় তিন বছর মিশরে থাকতে হবে মোশতাককে।
মোশতাকের ছোট ভাই ইশতাক মিয়া জানান, তিনি বেশ খুশি। এলাকার মানুষ, আত্মীয়- স্বজনরা প্রায়ই তার ভাইয়ের অবস্থা জানতে চান বলে বেশ ভালো লাগে। ভাইয়ের সাফল্যে তিনি গর্ববোধ করেন।
মোশতাকের চাচা মো. নাজির হোসেন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের এ অবস্থার মধ্যে ভাবী এত কষ্ট করে যে আমার ভাতিজা-ভাতিজিকে এভাবে লালন-পালন করতে পারবেন সেটা ভাবতেও পারিনি। বিশেষ করে মোশতাক যে মিশরে পাঠাতে পেরেছে সেটা তো অনেক গর্বের বিষয়।’
প্রতিবেশি মো. হোসেন বলেন, ‘মোশতাক আমাদের এলাকার গর্ব। এমন একটি পরিবার থেকে কষ্ট করে তার এতদূর যাওয়াটা সবার জন্য গর্বে। আমি দোয়া করি মোশতাক যেন তার কাঙ্খিত ফলাফল বয়ে এনে স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।’
আনন্দপুর নাসিরুল উলুম ইসলামিয়া মাদরাসার শিক্ষক মুফতি সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘মোশতাক আমাদের মাদরাসায় পড়াশুনা করেছে। সে এখন বিশে^র অন্যতম একটি বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে। এটা আমাদের জন্য অনেক গর্বের।
মোশতাকের মা বলেন, ‘ছেলে-মেয়েদের লালন-পালনে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। দুই মেয়েকে এইচএসসি পাশ করিয়েছি। মোশতাক মেধাবী বিধায় ভালো জায়গায় পড়ার সুযোগ পেয়েছে। স্কলারশিপ পেলেও যাওয়ার সময় অনেক খরচ হয়। এখনও কিছু টাকা লাগে। আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশিরা সহযোগিতা করেছে। এখন সে যেন নিজে চলতে পারে ছোট্ট একটি দোকান দিতে টাকা পাঠিয়েছি। পড়ার ফাঁকে সপ্তাহে দু’একদিন দোকান চালিয়ে যে আয় হয় সেটা দিয়ে তার খরচ চালাতে পারবে।’
মোশতাক লিখে পাঠিয়েছে তার স্বপ্নের কথা। সে জানায়, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই একটি স্বপ্ন লালন করেছি। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়ই আমার লক্ষ্য ছিল একদিন আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া। আল্লাহ পাকের অসীম কৃপা, এলাকাবাসীর দোয়া ও ওস্তাদদের সহযোগিতায় আমার স্বপ্ন পূরণের পথে।’
ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মোশতাক বলে, ‘ গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর আমার অন্যতম লক্ষ্য হলো আমাদের দেশে কর্মমুখী প্রতিষ্ঠান গঠন করা। আমি বিশ্বাস করি কর্মহীন ধর্ম শিক্ষা জাতির জন্য ক্ষতিকর। ধর্মহীন কর্ম জাতিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়।