দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ধর্মীয় সম্প্রীতি আজ এক গভীর পরীক্ষার মুখোমুখি। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কা—প্রায় প্রতিটি দেশেই ধর্ম ও রাজনীতি এখন এক জটিল বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কোথাও সংখ্যাগরিষ্ঠের উগ্রতা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে, কোথাও আবার রাজনৈতিক স্বার্থে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন বলেই মনে হচ্ছে।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো ধরনের নির্যাতনের সুযোগ দেওয়া হবে না। এমনকি সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে তিনি মন্ত্রিত্বও ছেড়ে দেবেন। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর মুখে এমন দৃঢ় উচ্চারণ নিঃসন্দেহে সাহসী এবং তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অনেক সময় নেতারা কূটনৈতিক ভারসাম্যের কথা বলে নীরব থাকেন, কিন্তু কায়কোবাদ সরাসরি পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ওপর হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, আসাম কিংবা দিল্লির কিছু অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, বৈষম্য ও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচিত হচ্ছে। যদিও ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেয়, তথাপি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনেক প্রতিবেদনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবে একটি বহুত্ববাদী ভূখণ্ড। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন কিংবা নেতাজির চেতনায় গড়ে ওঠা এই অঞ্চল একসময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। নির্বাচনের সময় মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের খবর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশ কী অবস্থান নেবে? ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদের বক্তব্যে সেই উত্তর খুবই স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, “ভারতে ঘটছে বলে বাংলাদেশে এমন ঘটতে দেওয়া যাবে না।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশ প্রতিশোধের রাজনীতিতে যাবে না; বরং নিজ দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
এটি নিঃসন্দেহে একটি পরিণত ও দায়িত্বশীল অবস্থান। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, উপমহাদেশে প্রায়ই এক দেশের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রভাব আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের কোনো এলাকায় মুসলিম নির্যাতনের খবর এলে বাংলাদেশের কিছু এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। আবার বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ভারতে তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে দুই দেশের সাধারণ মানুষই ভোগান্তির শিকার হন।
বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিতে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সংবিধানের মূল চেতনায় ধর্মীয় সহাবস্থানের বিষয়টি গভীরভাবে নিহিত। যদিও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উগ্রবাদী শক্তির উত্থানে সেই আদর্শ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, তারপরও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সামাজিক সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সহনশীলতা এখনো শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এই জায়গায় ধর্মমন্ত্রীর বক্তব্য রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতাকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি শুধু মুসলিম নির্যাতনের নিন্দা করেননি; একইসঙ্গে বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মাবলম্বীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রকৃত মানবতা কেবল নিজের সম্প্রদায়ের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার হলে পূর্ণতা পায় না; বরং অন্যের নিরাপত্তাকেও নিজের দায়িত্ব মনে করলে তবেই তা মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে।
তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—বর্তমান বিশ্বে তথ্যযুদ্ধ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ানোর অন্যতম বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, পুরোনো ভিডিও কিংবা ভিন্ন দেশের ঘটনা বাংলাদেশের বলে প্রচার করে সংঘাত সৃষ্টির অপচেষ্টা নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি ফ্যাক্টওয়াচ যে অনুসন্ধান প্রকাশ করেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সেখানে দেখা গেছে, ভারতে মুসলিম নির্যাতনের একটি ভিডিওকে বাংলাদেশের ঘটনা দাবি করে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হয়েছে।
এ ধরনের অপপ্রচার অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ সাধারণ মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে যাচাই ছাড়া তথ্য বিশ্বাস করে ফেলেন। এরপর সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়, ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি সহিংসতাও ঘটতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এখন “ডিজিটাল সাম্প্রদায়িকতা” এক ভয়াবহ বাস্তবতা। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মে সংগঠিতভাবে গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রবণতা বাড়ছে।
ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধান বলছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং বিভিন্ন ফেসবুক পেইজ থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের প্রবণতা বেড়েছে। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
কারণ ভুয়া তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে কখনো শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠতে পারে না। যখন মানুষ সত্য হারিয়ে ফেলে, তখন ঘৃণাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। ফলে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম—উভয়ের দায়িত্ব সত্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধরে রাখা। সরকার যদি সত্যিই সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে মাঠপর্যায়ে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা কিংবা মসজিদ—সব উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সমান গুরুত্ব দিয়ে। কোনো গুজব ছড়ালে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপরাধীদের ছাড় দেওয়া যাবে না।
একইসঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ জোরদার করতে হবে। কারণ সাম্প্রদায়িকতা মূলত মননের সংকট। শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান শেখে, তবে ভবিষ্যৎ সমাজ আরো স্থিতিশীল হবে।
ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদের বক্তব্যের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—তিনি ভারতের গণতন্ত্রের প্রশংসা করেও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরিচায়ক। কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করেও মানবাধিকারের প্রশ্নে অবস্থান জানানো যায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটিই পরিণত কূটনীতির ভাষা।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমুখী। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি বণ্টন, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই সম্পর্ক টেকসই রাখতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তবে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলে।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। কারণ ধর্ম যখন ক্ষমতার সিঁড়ি হয়ে ওঠে, তখন মানবতা হারিয়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বিভক্তি ও রক্তপাতের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো মানুষ ভুলে যায়নি। সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
ধর্মমন্ত্রী তার বক্তব্যে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের ভাতা চালুর প্রসঙ্গ তুলে তিনি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগের কথা বলেছেন। এই বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনা অনেক সময় সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে উসকে দেয়। মানুষ যখন ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তখন উগ্র গোষ্ঠীগুলো ধর্মের নামে তাদের সহজেই প্রভাবিত করতে পারে।
তাই উন্নয়ন ও সম্প্রীতি—দুটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে শান্তি আসে না; আবার শুধু ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কথা বলেও দারিদ্র্য দূর করা যায় না। রাষ্ট্রকে একইসঙ্গে ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
আজকের বিশ্বে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান কিংবা বৌদ্ধ—সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত মানুষ। যদি কোনো মুসলিম পশ্চিমবঙ্গে নির্যাতনের শিকার হন, সেটি যেমন মানবতার জন্য লজ্জা; তেমনি বাংলাদেশে কোনো হিন্দু নির্যাতিত হলেও সেটি সমানভাবে নিন্দনীয়। সুতরা ভারতকে এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে এবং অবিলম্বে ধর্মীয় সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। কারণ ধর্মীয় উগ্রবাদ শান্তি, উন্নয়ন ও মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]