ব্যক্তির বহুমাত্রিক পরিচয় ও ভূমিকা একটি জটিল ও স্তরবিন্যাসযুক্ত বিষয়, যা পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি, পেশা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে গঠিত হয়। একজন মানুষের আত্মপরিচয় শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়। ব্যক্তির বহুমাত্রিক পরিচয়ের মধ্যে সামাজিক ও পারিবারিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি পরিবারের সদস্য যেমন: সন্তান, পিতামাতা, ভাইবোন এগুলো পারিবারিক পরিচয় এবং সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে ভাষা, ধর্ম, প্রথা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ব্যক্তির একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে ওঠে। পেশাগত ও অর্থনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে পেশা বা কাজের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তির একটি পরিচয় তৈরি হয়।রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ব্যক্তি আইনগত ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অধিকারী হয়ে থাকেন। মানুষের পরিচয় ও ভূমিকা পরিবার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। প্রতিটি ব্যক্তি নিজ নিজ অবস্থান থেকে এসব বহুমুখী দায়িত্ব ও পরিচয় পালনের মাধ্যমে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখেন।
শিল্পীর রাজনীতি হলো শিল্পীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ ও কর্মকাণ্ড, অন্যদিকে শিল্পের রাজনীতি হলো শিল্পকর্মের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক বার্তা ও তার প্রভাব। শিল্পীর রাজনীতি সচেতনতা কাঙ্খীত হলেও দলীয় সক্রিয়তা শিল্পীসত্তাকে প্রশ্নবোধক করে। তবে শিল্প নিজেই সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। শিল্পীরা ব্যক্তিগত মতাদর্শ অনুযায়ী কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হতে পারেন বা দলীয় সুবিধা নিতে পারেন। এতে তার সমালোচনা ও ঝুঁকি তৈরী হতে পারে। এটি শিল্পীকে মনে ও মেনে নিতে হবে। কোন শিল্পী সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে জড়ালে শিল্পীদের 'শিল্পী পরিচয়' বা 'আইডি' প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এবং অনেক সময় জনরোষের শিকার হতে পারেন। কেউ কেউ মনে করেন, শিল্পী কোনো নির্দিষ্ট দলের লেজুড়বৃত্তি না করে সাধারণ মানুষের পক্ষে সোচ্চার থাকবেন। এই চাওয়াটা আদর্শিক। বাংলাদেশে বাস্তবে এরকম ভুমিকা খুব কম শিল্পীর মধ্যেই দেখা যায়। শিল্পের রাজনীতি হলো শিল্পকর্ম যেমন ছবি, সিনেমা, নাটক, সাহিত্য ইত্যাদি মাধ্যমে শিল্পী নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। যখন শিল্প সরাসরি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, তখন তার শৈল্পিক মূল্য ও নান্দনিকতা অনেক সময় বিতর্কের জন্ম দেয়। শিল্পীর রাজনীতি হলো তার ব্যক্তিগত মতাদর্শ, আর শিল্পের রাজনীতি হলো সেই মতাদর্শের শিল্পরূপ, যা সমাজ বা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে। এইসব আলোচনা আপনাদের সকলেরই জানা।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী আতাউর রহমান। তিনি একাধারে নাট্যজন, অভিনেতা, মঞ্চ নির্দেশক ও লেখক। ১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্ম নেওয়া এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব স্বাধীনতাযুদ্ধ-পরবর্তী মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর আতাউর রহমান নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তর ‘বুড়সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকটির মাধ্যমে নাট্য নির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এই প্রতিষ্ঠাতা ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘রক্তকরবী’, ‘ক্রয়লাদ ও ক্রেসিদা’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘অপেক্ষমাণ’- এর মতো নাটকগুলোও নির্দেশনা দিয়েছেন। নাগরিকের বাইরে আতাউর রহমান ‘আগল ভাঙার পালা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘নারীগণ’, ‘রুদ্র রবি ও জালিয়ানওয়ালাবাগ’ নাটকগুলো নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি ‘প্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’, ‘নাটক করতে হলে’, ‘নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা’, ‘লেখনী’সহ নানা বই প্রকাশ করেছেন। অভিনয় করেছেন বেশ কিছু টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের সাবেক সদস্য আতাউর রহমান বাংলাদেশ নাটকের আপিল কমিটি ও চলচ্চিত্র জুরিবোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ শাখার, পরে বিশ্ব শাখার সভাপতিও ছিলেন এই নাট্যব্যক্তিত্ব। দেশের সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আতাউর রহমান পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার।
এর সবই ঠিক আছে। কিন্ত তিনি জীবনের শেষকালে এসে আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। তার পাওয়া পুরস্কার গুলোও দলীয় বিবেচনায়। দল ব্যক্তি বা শিল্পীর জনপ্রিয়তাকে তার পক্ষে কাজে লাগাতে চাইবে। রাজনীতি, দল ও রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রে সেটাই স্বাভাবিক। এখানে ব্যক্তি বা শিল্পীর ভুমিকা বা সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিস্বার্থে দলীয় পরিচয় চরিতার্থ করা বা দলের আনুগত্য শিল্পীর সার্বজনীনতা কে বিকলাঙ্গ করে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সকল অপকর্মের পক্ষে নাট্যজন আতাউর রহমান কে আমরা জ্বল জ্বল দেখেছি। বিগত সতের বছর ১/১১'র অগণতান্ত্রিকতায় কিম্বা ফ্যাসিস্ট হাসিনার অবাধ দুনীতি, বিরোধী মত দমন, গুম খুন ক্রসফায়ার, ভোটাধিকারহীনতায় নাট্যজন আতাউর রহমান কে আমরা সোচ্চার হতে দেখিনি। বরঞ্চ তাকে নির্লজ্জ দালালি করতে দেখেছি। হাসিনা বন্দনায় বিগলিত হতে দেখেছি। আমাদের মনের গোপন গহীন কোন্দরে আতাউর রহমানসহ অন্যান্য জনপ্রিয় নাট্যকর্মী, অভিনেতা, সাহিত্যিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপাচার্য, মানবাধিকার কর্মীর ঘৃন্য দলদাসসুলভ মনোভাব কষ্টের ঝড় তুলেছিল। আতাউর রহমান বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের একজন অন্যতম পথিকৃৎ, নির্দেশক ও অভিনেতা, যিনি দীর্ঘ কর্মজীবনে সংস্কৃতির পাশাপাশি সক্রিয় রাজনীতির সাথেও যুক্ত ছিলেন।
তিনি সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ২০১৮ সালের রাতের ভোটের পরে আতাউর রহমান ২০১৯ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। তিনি বঙ্গবন্ধু আদর্শ ফোরামের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তার রাজনৈতিক আদর্শিক অবস্থানকে আরো স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাথে যুক্ত থেকে তিনি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে অবদান রাখার চেয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও আওয়ামী রাজনীতিকেই প্রমোট করেছেন। জুলাইয়ের স্পিরিট বিরোধী আতাউর রহমানের অবস্থান ছিল হাসিনার পক্ষে। তিনি বাংলাদেশ সেন্টার অব ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (ITI) এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে দলকানার মতো তুলে ধরেছেন। আর এইসবের বিনিময়ে তার কপালে জুটেছে স্বাধীনতার পদকটিও।
আতাউর রহমানের মৃত্যুতে নাট্যাঙ্গনে শোকের মাতমে আমার আপত্তি নেই। আমারও কষ্ট হচ্ছে। তার প্রয়াণে ফ্যাসিস্ট প্রিয়তার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বিগত চার দশক পূর্বে একজন আতাউর রহমান হয়ে ওঠা নিয়ে গালগল্পই প্রাধান্য পাচ্ছে। আতাউর রহমান তো তার শিল্পীসত্তাকে দলীয় আনুগত্যে বিসর্জন দিয়েছেন বহু আগেই। নিকট অতীতকে ভুলে আমরা তার সৃষ্টিশীলতার যত বন্দনাই করি না কেন তা সার্বজনীন হবে না। দোষ গুনে আতাউর রহমান স্মরিত হোক এটি আমার মতো অভাজনসহ সকলেরই কাম্য। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার যেমন পরিতাজ্য তেমনি ফ্যাসিস্ট দোসরারাও আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হোক। এগুলো দৃষ্টান্ত হলে আগামীতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মান সহজতর হবে।
লেখকঃ জাহেদুল আলম হিটো, নাট্য ও রাজনৈতিক কর্মী