নেত্রকোণার মদন উপজেলার সরকারি খাদ্য গুদামকে ঘিরে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ট্রাকভর্তি প্রায় ২০ মেট্রিকটন সরকারি চাল জব্দের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার গুদামের হিসাবের বাইরে আরও ৪৩ দশমিক ৫৬০ মেট্রিকটন চালের সন্ধান মিলেছে। এ ঘটনায় গুদামটি সিলগালা করেছে খাদ্য বিভাগ।
রোববার দুপুরে তদন্ত শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান খাদ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সেলিমুল আজম। এর আগে শনিবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মদন খাদ্য গুদামে সরেজমিন তদন্ত চালান তিনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে মদন-নেত্রকোনা সড়কের সাম্য ফিলিং স্টেশনের সামনে অভিযান চালিয়ে ৬৬৭ বস্তা সরকারি চালসহ একটি ট্রাক জব্দ করে প্রশাসন। ওই ট্রাকে প্রায় ২০ মেট্রিকটন চাল ছিল বলে নিশ্চিত করা হয়। এ সময় ট্রাকচালক শামীম মিয়া ও হেলপার শাহীন মিয়াকে আটক করা হয়।
পরদিন শুক্রবার সকালে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দুলাল মিয়া বাদী হয়ে মদন থানায় মামলা করেন। মামলায় স্থানীয় ব্যবসায়ী এনামুল হক আনারসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়।
ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। এরপরই শুরু হয় অভ্যন্তরীণ তদন্ত। তদন্তকালে গুদামে সংরক্ষিত ধান-চালের স্টক মিলিয়ে দেখা হলে হিসাবের বাইরে অতিরিক্ত ৪৩.৫৬০ মেট্রিকটন চাল পাওয়া যায়। একই সঙ্গে গুদাম ব্যবস্থাপনায় একাধিক গুরুতর অসংগতিও ধরা পড়ে।
অতিরিক্ত পরিচালক মো. সেলিমুল আজম সাংবাদিকদের বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে গুদামে এসব চাল অবৈধভাবে মজুত রাখা হয়েছিল। সুযোগ বুঝে সেগুলো পাচারের পরিকল্পনা ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “গুদামে পাওয়া অতিরিক্ত ৪৩.৫৬০ মেট্রিকটন চাল জব্দ করা হয়েছে এবং তা সরকারি স্টকের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এছাড়া ট্রাকে জব্দ হওয়া ২০ টন চালের ঘটনায় আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তদন্তে গুদাম কর্মকর্তার পাশাপাশি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার আশঙ্কার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার বিষয়টিও সামনে আনেন তদন্ত কর্মকর্তা।
সেলিমুল আজম বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে অন্তত একবার প্রতিটি খাদ্য গুদাম পরিদর্শনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা গত দুই বছরে একবারও মদন খাদ্য গুদাম পরিদর্শনে যাননি। ফলে এ দায় তিনি এড়াতে পারেন না।”
তবে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোয়েতাছেমুর রহমান নিজের দায় অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের পাঠানো পাক্ষিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তিনি গুদামের চাল-ধানের হিসাব তদারকি করতেন। মদন খাদ্য গুদামে অতিরিক্ত চাল থাকার বিষয়টি তার জানা ছিল না। জানলে তিনি নিজেই ব্যবস্থা নিতেন বলেও দাবি করেন।
এদিকে, তদন্তে বেরিয়ে আসা তথ্য এবং প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানে মদনের খাদ্য গুদামকে কেন্দ্র করে সরকারি চাল সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।