দেশে কুকুর নিধন নিষিদ্ধ থাকায় সারাদেশের ন্যায় ঝিকরগাছায়ও বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বেড়েছে।
বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণের ভয়ে স্কুলে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী, মসজিদে গমনকারী মুসুল্লি, রাস্তায় চলাচলকারী পথচারী সহ স্থানীয় জনগন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
কুকুর কামড়ানোর কারণে জনমনে জলাতঙ্ক রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দলবদ্ধ বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না হাঁস, মুরগী, গরু, ছাগল সহ অন্যান্য প্রাণীও।
এলাকায় কুকুর নিয়ন্ত্রণ এর অভাবে জননিরাপত্তা এখন বড় মাপের ঝুঁকির মধ্যে আছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কুকুরের আক্রমণের শিকার হলেও উপজেলার একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি ভাবে সরবরাহ না থাকায় ঠিকমতো ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কুকুরের কামড়ের শিকার হওয়া রোগীকে অতিরিক্ত দামে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকার মোড়ে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে, বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এর সামনে, খোলা মাঠে বা বালুর গাদায় বেওয়ারিশ কুকুরগুলো সংঘবদ্ধ ভাবে অবস্থান করে। ৮/১০ টি করে কুকুর একসাথে চলাফেরা করে। সামনে মানুষ বা পশুপাখি দেখলে বা শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাবার সময় বা ভোরে মুসুল্লিরা নামাজ পড়তে যাবার সময় রাস্তায় শুয়ে থাকা কুকুরগুলো একসাথে আক্রমণ চালায়। এসব কুকুরের উৎপাতে পথচারীরাও আতংক নিয়ে চলাচল করে। বাড়িতে পোষা হাঁস, মুরগী, গরু, ছাগলও তাদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। আস্ত ছাগল কামড়ে খেয়ে ফেলার মত ঘটনাও ঘটেছে। কুকুর নিয়ন্ত্রণে সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগ না থাকায় দিনদিন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, কুকুর কামড়ালে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি জলাতঙ্ক হওয়া। এই রোগে মৃত্যু অনিবার্য। কুকুরে কামড়ানো রোগীর জন্য ২/৩ টি ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভ্যাকসিন না থাকলে যশোর জেনারেল হাসপাতালে যেতে হয়। সেখানেও ঠিকমতো ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। ফলে ভুক্তভোগীদের ভোগান্তি এবং অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। মুলত কুকুর নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভ্যাকসিন দিয়ে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে তারা মতামত ব্যক্ত করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আরমান আহাদ বলেন, ঝিকরগাছা বিএম হাইস্কুলের সামনে ৮/১০ টি কুকুর আমাকে আক্রমণ করে। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছি। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা টুটুল মিয়া বলেন, সন্ধ্যার পরে আমি রাস্তা পার হচ্ছিলাম। এমন সময় কয়েকটি কুকুর আমাকে পেছন থেকে আক্রমণ করে। কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও কুকুরের কামড়ে আমার পায়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর দলবদ্ধ কুকুরের তাড়া খেয়ে ভয়ে পালাতে গিয়ে একটি শিশু ট্রাকের তলায় চাপা পড়ে মারা গিয়েছিলো।
ঝিকরগাছা উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মাসুমা আখতার বলেন, প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ কুকুরে কামড়ানো ছাগল, গরু নিয়ে আমাদের হাসপাতালে আসে কিন্তু সরকারি ভাবে ভ্যাকসিনের সরবরাহ না থাকায় আমরা বাইরে থেকে কিনে আনার পরামর্শ দিই। তিনি আরও বলেন, কুকুরের জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও স্থায়ী পদ্ধতি হলো বন্ধ্যাকরণ বা সার্জারী। স্ত্রী কুকুরের জন্য ‘স্পে’ এবং পুরুষ কুকুরের জন্য ‘কাস্ট্রেশন’ করে কুকুরের জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এছাড়াও, হরমোন ইনজেকশন বা পিল ব্যবহার করা যেতে পারে। কুকুরের বয়স ৩/৪ মাস হয়ে গেলেই র্যাবিস ভ্যাকসিন করা যায়। স্পে বা ক্যাস্ট্রেশন ৬ মাসে শুরু করা যায়। যদি এগুলো করা যায় তবে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে জানান এই প্রাণী বিশেষজ্ঞ।
ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আব্দুর রশিদ বলেন, প্রতিদিন ৬/৭ জন কুকুর বা বিড়ালে কামড়ানো রোগী হাসপাতালে আসে। ২০২৬ সালের সাড়ে ৪ মাসেই ৮৫৪ জন রোগীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। সরকারি ভাবে সরবরাহ না থাকলে পৌর কতৃপক্ষের মাধ্যমে আমরা ভ্যকসিন সংগ্রহ করে এই কার্যক্রম চলমান রেখেছি। বাড়িতে পোষা বিড়ালের নখের আঁচড়ের ক্ষত নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ ভ্যাকসিন নিতে হাসপাতালে আসে বলে তিনি জানান। পোষা বিড়ালগুলোকে পশু হাসপাতাল থেকে ভ্যাকসিনেশন করে নিলে বা পোষা বিড়াল দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তিকে ভ্যাকসিন না দিতে হলে কুকুরের কামড়ে আহত রোগীর ভ্যাকসিন সংকট হতোনা বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাফফাত আরা সাইদ বলেন, আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেক কিছু করা সম্ভব হয় না। বেওয়ারিশ কুকুর ভ্যাকসিনেশন করার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। কুকুরের জন্ম নিয়ন্ত্রণ এর পদ্ধতিগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে বলে তিনি জানান।