গাজীপুরস্থ ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)-এ উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলন পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে।
সোমবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ডুয়েট ব্লকেড কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ৮টা থেকে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ শুরু করে। এতে বন্ধ থাকে প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক ও একাডেমিক কার্যক্রম। পরে দুপুর ১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন ডুয়েট শাখা ছাত্রদল। এদিকে রোববার সংর্ঘষের ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অজ্ঞাত ২০০-২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করছে পুলিশ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, গত রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ভিসি তার কার্যালয়ে অফিস করেছেন। শিক্ষার্থীরা বলেছেন, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নতুন ভিসি নিয়োগ নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে।
অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, নতুন ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রোববারই যোগদান করে তার দাপ্তরিক কাজ শুরু করেছেন।
জানা গেছে , গত ১৪ মে ডুয়েটের উপাচার্য হিসেবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর ওই দিন রাত সাড়ে নয়টা থেকে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। সোমবার (১৮ মে) সকালে আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে অবস্থান নিয়ে ব্লকেড কর্মসূচি শুরু করে শিক্ষার্থীরা। এসময় কর্মকর্তা, কর্মচারীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চাইলে তাদের বাধা দেওয়া হয়। এতে গেইটের বাইরে কর্মকর্তা, কর্মচারীদের ভিড় দেখা গেছে। ব্লকেড কর্মসূচির কারণে বন্ধ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম।
ক্যাম্পাসের ভেতরে শহীদ মিনারের পাশে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সোমবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) এর আন্দোলনরত শিক্ষার্থদের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ বলেন, আমরা বিগত এক সপ্তাহ যাবৎ ক্যাম্পাসে এবং স্বল্প সময়ের জন্য ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের কোনো রূপ ব্যাঘাত যাতে না ঘটে সেদিকেও সতর্কতা অবলম্বন করেছি। একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরীক্ষা চলমান ছিল। একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবি তুলে ধরবো এবং তা আদায়ের চেষ্টা করবো। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ মে সকাল থেকে আমাদের ক্যাম্পাসের মূল ফটকের ভেতরে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিল। যাদের পরীক্ষা ছিলো তারা পরীক্ষাতে অংশগ্রহণ করি। কিন্তু সকালে ডুয়েট ছাত্রদল ও বাহিরের ভাড়াটিয়া এনে তারা ডুয়েটের গেইট ভেঙে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে গেইটে ঢোকার চেষ্টা করে। এসময় ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা তা প্রতিহতের চেষ্টা করলে, তাদের উপর বাইরে থেকে ইট পাটকেল ছুড়ে ও দেশিয় অস্ত্র নিয়ে আতর্কিত হামলা চালায় ছাত্রদল ও তাদের সহযোগী বহিরাগতরা। এ সংঘর্ষে ১৮ জন শিক্ষার্থী আহত হন, যার মধ্যে ১২ জন গুরুত্বর আহত হন।
এছাড়া এ ঘটনার প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। দাবিগুলো হলো, ভিসি আমাদের ভাইদের রক্ত ঝরিয়েছে, আমরা তাকে চাই না” অনতিবিলম্বে তার নিয়োগ বাতিল করতে হবে। ডুয়েটে কর্মরত শিক্ষকদের মধ্য থেকে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষার্থী ও সহপাঠীদের ওপর সংঘটিত হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে জড়িতদের স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে।ভিসির সভা কক্ষে ডুয়েটের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো: খসরু মিয়া এক বিবৃতিতে জানান, এছাড়া ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং গত ১৭ মে সোমবার সংঘটিত অনাকাক্সিক্ষত। বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞানচর্চা, মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার পবিত্র স্থান। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার যেমন সংবিধানসম্মত, তেমনি যে কোনো ধরনের সহিংসতা, হামলা, ভীতি প্রদর্শন এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপকে শিক্ষক সমিতি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। এ ঘটনায় ২ জন শিক্ষক ও ১৮ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। একই সঙ্গে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং দায়ীদের চিহ্নিত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানানো হয়।অপর দিকে ক্যাম্পাসের বাহিরে একটি বিল্ডিংয়ে ৪র্থ তলায় ছাত্রদলের সংবাদ সম্মেলনে ডুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি জামিরুল ইসলাম জামিল ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির বলেন, বর্তমান ভিসি আসার এক ঘন্টা আগে শিবির এবং ছাত্র শক্তির কিছু ছেলে এত পরিমানেই উগ্র তারা শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতেও কুন্ঠাবোধ করে নি। এতে প্রমান হয় তারা মনে কতটা সন্ত্রাস ধারন করে। ডুয়েটসহ অন্যান্য ক্যাম্পাসে শিবির মব ভায়োলেন্স এবং মব সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়েছে আমরা অচিরেই এই মব ভায়োলেন্স, মব সন্ত্রাস কালচারে সমাপ্তি দেখতে পাবো এই ডুয়েট থেকেই এর সূচনা হবে। আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থা নিয়ে গিয়েছিলাম এবং ভিসি স্যারকে সুশৃঙ্খলভাবে অফিসে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। এসময় শিবির অনাঙ্খিত ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা প্রথম আমাদের উপর হামলা করেছে। রাষ্ট্রিয় ভাবে ভিসি মহোদয়কে দায়িত্ব দিয়েছে সে তার দায়িত্ব গ্রহণ করবে এখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কি কারণে বাধা দিবে? তাদের স্বার্থ কি?। হামলা সাথে আমরা কোন ভাবে জড়িত নই। তারা যখন আমাদের উপর হামলা করে আমরা দখল আত্মরক্ষার ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হই। ভিডিও ফুটেজ দেখলে বোঝা যাবে সর্বপ্রথম করা হামলা করেছে, ইট-পাটকেল ছুড়েছে তা বুঝাযাবে। কারা বহিরাগত তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। শিবিরের প্রথম কমিটি দেয়া হয় দু’জনকে নিয়ে পরে আরো ১২জন এডকরে। পরবর্তীতে তারা কমিটি এক্সটেন করে না। বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণকরার কারনে কখনোই শিবির তাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করেন। তবে মতিউর রহমান, এমকে আলম, ফাহমাদ উল্লাহ, আবুবকর সিদ্দিক এরা চিহ্নিত শিবির। তবে রাষ্ট্র যদি মনে করে ডুয়েটের ভেতর থেকে ভিসি দিবে অথবা যাকে দেয়া হয়েছে তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে দিবে আমরা তাকে ওয়েলকাম জানাবো। সকল সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ডুয়েট প্রশাসন, আইনশৃংখলা বাহিনী মোকাবেলা করবে। আমরা চাইনা কোন রকম ভায়োলেন্স তৈরী হোক। আমাদের যারা সহপাঠী, ছোট ভাই, বন্ধু আছে কোন ধরনের ক্লাসে যেতে চাই না। আমরা চাই না কোন রকম বিশৃংখলা তৈরী হোক।
ডুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং সাধারন সম্পাদক শিবিরের রাজনিতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ডুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এ অবস্থায় রোববার শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গেটের বাইরে থাকা পুলিশ সদস্য, গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাত হোসেন ও সাধারণ ছাত্রসহ ১৪-১৫ জন আহত হন। এ ব্যাপারে থানায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অজ্ঞাত ২০০-২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করছে পুলিশ ।